ভোটার তালিকায় বহু রোহিঙ্গাদের অন্তর্ভুক্ত থাকার অভিযোগ উঠেছে। গত বছর ভোটার তালিকা হালনাগাদ কার্যক্রমে রোহিঙ্গাদের অন্তর্ভুক্ত ঠেকাতে পারে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। কাজে লাগেনি কমিশনের বিশেষ তথ্য ফরম ব্যবহারের কৌশলও। স্থায়ী বাসিন্দাদের প্রমাণস্বরূপ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দাখিল না করেই ভোটার হয়েছেন তারা।
সম্প্রতি রাষ্ট্রের একটি প্রভাবশালী গোয়েন্দা সংস্থা থেকে নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) জানানো হয়েছে, বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলের ভোটার তালিকায় বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। স্থানীয় সুবিধাবাদী মহলের হীনস্বার্থে এবং প্রশাসনের কিছু অসত্ কর্মকর্তা/-কর্মচারী অর্থের বিনিময়ে তাদের ভোটার করেছে। এদের দ্রুত ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেয়ার কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে রাষ্ট্রের জন্য বিষয়টি দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। কিন্তু নির্বাচন কমিশন এই সতর্কবার্তাকে আপাতত আমলে নিচ্ছে না।
কমিশনের পক্ষে বলা হচ্ছে, এ ধরনের ঢালাও অভিযোগের ক্ষেত্রে দ্রুত কোন ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব না। এর আগে গোয়েন্দা সংস্থা থেকে কক্সবাজার ও বান্দরবন জেলার ভোটার তালিকায় ১৩৫ জন রোহিঙ্গা ভোটারের তালিকা দেয়া হয়েছিল। ওই তালিকা ধরে তদন্ত চলছে। তদন্তে রোহিঙ্গা ভোটারের প্রমাণ পেলে ব্যবস্থা নেয়া হবে। তাছাড়া আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য ২৪ অক্টোবরের আগেই ভোটার তালিকা মুদ্রণের কাজ সম্পন্ন করতে হবে। নির্বাচন কমিশনের হাতে পর্যাপ্ত সময়ও নেই।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সচিব ড. মোহাম্মদ সাদিক গত রবিবার ইত্তেফাককে বলেন, দেশের রোহিঙ্গাপ্রবণ এলাকাগুলোতে বিশেষ সতর্কতার সাথে ভোটার করা হয়েছে। তারপরও সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ক্ষেত্রে আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি।
ইসি সচিবালয় সূত্র জানায়, গত ১৬ সেপ্টেম্বর গোয়েন্দা সংস্থাটির মহাপরিচালকের পক্ষে লে.কর্নেল পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) বরাবার একটি চিঠি পাঠিয়েছেন। এতে বলা হয়েছে, বৃহত্তম চট্টগ্রাম অঞ্চলে বিশেষ করে কক্সবাজার এবং বান্দরবন জেলাতে আনুমানিক ৩ লাখ থেকে ৫ লাখ নিবন্ধিত-অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা বসবাস করছে। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বিভিন্ন অবৈধ উপায়ে নিজেদের নাম ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায়।
ভোটার তালিকায় অবৈধভাবে অন্তর্ভুক্ত রোহিঙ্গাদের বাদ দেয়ার কিছু কাজ কক্সবাজার জেলাতে গ্রহণ করা হলেও বর্তমানে বৃহত্তর চট্টগ্রাম-বিশেষ করে বান্দরবন এবং কক্সবাজার জেলাতেও বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা তালিকাভুক্ত রয়েছে।
সিইসি’র দপ্তরে গত ১৮ সেপ্টেম্বর গ্রহণকরা ওই চিঠিতে বলা হয়, স্থানীয় কিছু সুবিধাবাদী গোষ্ঠী নিজের হীনস্বার্থে উদ্দেশ্যমূলকভাবে রোহিঙ্গাদের ভোটার হতে সহযোগিতা করেছে। তাছাড়া প্রশাসনের কিছু অসত্ কর্মকর্তা/ কর্মচারি অর্থের বিনিময়ে রোহিঙ্গাদের ভোটার হতে সুবিধা দিয়েছে।
চিঠিতে আরো বলা হয়, এভাবে রোহিঙ্গারা শুধুমাত্র ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত নয়, একই সাথে জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্টও লাভ করছে। এটি রাষ্ট্রের উপর দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
এদিকে বান্দরবনের জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা আব্দুল লতিফ শেখ বলেন, গোয়েন্দা সংস্থার আগের প্রতিবেদনে বান্দরবন জেলার নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলায় মোট ১৩৪ জনের একটি তালিকা দেয়া হয়েছিল। আমাদের তদন্তে জানা গেছে, ওই তালিকাতে বাংলাদেশি ভোটাররাও রয়েছে। তালিকার বেশ কয়েকজনের মৃত্যু হয়েছে। বাকি সন্দেহভাজনদের রোহিঙ্গা হিসেবে প্রমাণ করা কঠিন। এ অবস্থায় নির্বাচন কমিশন স্থানীয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে বিষয়টি তদন্তের দায়িত্ব দিয়েছেন। ইউএনও’র নেতৃত্বে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা এ তদন্ত চালাচ্ছেন। আগামী ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যেই তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়া যাবে বলে আশা করা যাচ্ছে। এছাড়া জানা যায়, ওই তালিকাটিতে কক্সবাজার জেলায় ১ জনের নাম থাকলেও তাকে রোহিঙ্গা হিসেবে প্রমাণ করা যায়নি।
প্রথমবারের মত ছবিসহ ভোটার তালিকা হালনাগাদ করার সময় ২০০৯ সালের ২ আগস্ট সশস্ত্রবাহিনী বিভাগ নির্বাচন কমিশনকে জানায়, বান্দরবন জেলা সদর, নাইক্ষ্যংছড়ি, আলীকদম ও লামা উপজলায়, কক্সবাজারের সদর, উখিয়া, টেকনাফ, রামু, চকরিয়া ও পেকুয়া উপজেলায় এবং রাঙ্গামাটির কাপ্তাই ও বিলাইছড়ি উপজেলার ভোটার তালিকায় অনেক রোহিঙ্গাকে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ওই ৩ জেলার ১২টি উপজেলার তালিকা থেকে রোহিঙ্গা ও ভুয়া সন্দেহে মোট ৪৮ হাজার ৬৭৩ ভোটারের নাম বাদ দেয়া হয়।
