আধুনিক নিনটেনডো’র স্বপ্নদ্রষ্টা

হিরোশি ইয়ামাউচি’র জীবনাবসান

আপডেট : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২১:৩০
১৮৮৯ সালে জাপানের কিয়োটোতে গড়ে ওঠে ‘নিনটেনডো কোপ্পাই’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান, যাদের কাজ ছিল প্লেয়িং কার্ড বা তাস তৈরি করা। হাতে তৈরি করা এই তাসগুলো বেশ বিখ্যাত হয়ে ওঠে পুরো জাপানেই। শুধু তাই নয়, তারা নিজেরা তাস খেলার টুনার্মেন্টেরও আয়োজন করতে থাকে নিয়মিত। ‘নিনটেনডো কোপ্পাই’য়ের ‘কোপ্পাই’ অংশটুকু বাদ দিলে যে নিনটেনডো থাকে, সেটাই আজকের বিশ্বের অন্যতম প্রধান গেম কনসোল নির্মাতা নিনটেনডো। একটি তাস নির্মাতা কোম্পানি থেকে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ গেম কনসোল কোম্পানিতে নিনটেনডোকে রূপান্তরিত করার প্রক্রিয়াটি যার হাত ধরে সম্পাদিত হয়েছে, তিনিই আজকের আধুনিক নিনটেনডো’র স্বপ্নদ্রষ্টা হিরোশি ইয়ামাউচি। পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে নিনটেনডোকে সফলভাবে নেতৃত্ব দিয়ে যাওয়া হিরোশি পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেছেন গত ১৯ সেপ্টেম্বর, ৮৫ বছর বয়সে। নিনটেনডোই কেবল নয়, তার মৃত্যুতে গোটা বিশ্বই হারালো একজন পথিকৃেক। ১৯২৭ সালের ৭ নভেম্বর জাপানের কিয়োটোতে জন্মগ্রহণ করেন ইয়ামাউচি। আইন কিংবা প্রকৌশল বিষয়ে পড়ালেখার ইচ্ছা ছিল তার। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ডামাডোলে তার পড়ালেখায় ছেদ পড়ে। ওই সময়ে বয়স অল্প বলে যুদ্ধ করতে না হলেও তাকে কাজ দেওয়া হয় একটি মিলিটারি কারখানায়। ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলে তিনি ভর্তি হন ওয়াসেদা বিশ্ববিদ্যালয়ে, আইন বিভাগে। ওই সময়ে তিনি বিয়েও করেন, তবে তা তার বাবার অমতে। ফলে তার বাবা এই বিয়ে মেনে নেননি। তার দাদা ফুসাজিরো ইয়ামামুচি অবশ্য তাদের এই বিয়েতে সার্বিক সহায়তা করেন। ১৮৮৯ সালে নিনটেনডো প্রতিষ্ঠিত হয় মূল হিরোশি ইয়ামাউচির দাদার হাত ধরেই। ফুসাজিরো ছিলেন এর প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট। ১৯৪৭ সালে ফুসাজিরোর স্ট্রোক হলে তিনি নিনটেনডো’র উত্তরাধিকারী নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েন। তার ছেলে অর্থাত্ হিরোশি ইয়ামাউচির বাবাকে তিনি নিনটেনডোতে নিয়োগ দিতে চাননি। এমন অবস্থায় ফুসাজিরো তার নাতি হিরোশিকে নিনটেনডো’র দায়িত্ব নিতে বলেন। হিরোশি তাতে রাজি হলেও একটি শর্ত জুড়ে দেন। আর তা হলো, তিনি নিনটেনডোতে যোগ দিলে তার পরিবারের অন্য কোনো সদস্য সেখানে কর্মরত থাকতে পারবেন না। এই শর্তে রাজি হয়েই হিরোশিকে নিনটেনডো’র দায়িত্ব নিতে বলেন তার দাদা। যথারীতি দায়িত্ব নিয়ে তিনি নিনটেনডোতে কর্মরত তার মাসতুতো ভাইকে বের করে দেন। অল্প সময়ের মধ্যেই তার দাদাও মারা যান। তখনও তিনি একটি প্রতিষ্ঠান চালানোর মতো যোগ্যতা কিংবা অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ হতে পারেননি। ফলে নিনটেনডোতে আগে থেকে কর্মরত অনেকেই তার নেতৃত্ব মেনে নিতে চাননি। দায়িত্ব নেওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই একটি কারখানায় শ্রমিক বিক্ষোভও দেখা দেয়। হিরোশি কঠোর হস্তে এসব বিক্ষোভ দমন করেন এবং তার নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলা অনেক প্রবীণ কর্মীকেই ছাঁটাই করেন। এক কথায় নিনটেনডোতে তিনি তার একনায়কত্ব কায়েম করতে সমর্থ হন, যা নিয়ে তার সমালোচনারও অন্ত ছিল না ভেতর এবং বাইরে। এসব সমালোচনায় কান না দিয়ে হিরোশি বরং মনোযোগ দেন দ্রুত নিজের কর্মদক্ষতা এবং প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়াতে। তাতে সমর্থও হন তিনি। একটা পর্যায়ে তার নেতৃত্বেই জাপানে প্রথম প্লাস্টিকের প্লেয়িং কার্ড বাজারজাত করা হয় এবং তা প্রভূত জনপ্রিয়তা অর্জন করে। পরবর্তী সময়ে তিনি প্রযুক্তির অবশ্যম্ভাবি অগ্রগতিকেও দূরদৃষ্টির সাথে বিবেচনা করতে সমর্থ হন। আর তার ফলেই দ্রুত তার প্রতিষ্ঠানকে ইলেকট্রনিক পণ্যের দিকে ধাবিত করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। গত শতাব্দীর ষাটের দশকে হিরোশি ইয়ামাউচি মনোযোগ দেন বিভিন্ন ধরনের ইলেকট্রনিক খেলনার দিকে। এ সময় তিনি গুণপেই ইয়োকোয়ি নামক একজন প্রকৌশলীকে নিয়োগ দেন এবং তাকেই মূলত খেলনাগুলো তৈরির প্রধান দায়িত্বে রাখেন। ১৯৬৯ সালে ‘লাভ টেস্টার’ নামক একটি খেলনা দিয়ে নিনটেনডো আত্মপ্রকাশ করে ইলেকট্রনিক পণ্যের বাজারে। এর সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে আরও বেশ কয়েকটি খেলনা বাজারে ছাড়ে তারা এবং তাতে সাফল্যও লাভ করে। সময়ের সাথে ইলেকট্রনিক গেম কনসোলের গুরুত্ব খুব দ্রুত অনুভব করেন হিরোশি ইয়ামাউচি। ওই সময়ে অ্যাটারি এবং ম্যাগনাভক্স টিভিতে ব্যবহারের উপযোগী গেম কনসোল বাজারজাত করা শুরু করেছে। এই বাজারে নিজেদের দ্রুত প্রতিষ্ঠিত করতে ইয়ামাউচি শার্প ইলেকট্রনিক্স থেকে বেশকিছু কর্মীকে নিয়োগ দেন নিজের প্রতিষ্ঠানে। ১৯৭৭ সালে তারা বাজারে নিয়ে আসে নিনটেনডো’র প্রথম গেম কনসোল ‘কালার টিভি গেম’। ওই বছরেই তিনি নিয়োগ দেন শিগেরু মিয়ামটোকে, ‘ডাংকি কিং’য়ের মতো জনপ্রিয় গেমের তিনিই ছিলেন প্রধান ডিজাইনার। জাপানে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও নিজেদের শক্তিশালী করার দিকে নজর দেন ইয়ামাউচি। শুরুতে সেখানে খুব বেশি সাফল্য না পেলেও ১৯৮১ সালে ‘ডাংকি কিং’ দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারও বাজিমাত করেন ইয়ামাউচি। এরপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি নিনটেনডোকে। তার নেতৃত্বে শিগেরু একে একে তৈরি করেন সুপার মারিও, লিজেন্ড অব জেনডা, স্টারফক্সের মতো অসম্ভব জনপ্রিয় গেম। নিনটেনডোও ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বব্যাপী। জাপান, যুক্তরাষ্ট্র তো বটেই, এরপর সারাবিশ্বেই গেম কনসোলের এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয় নিনটেনডো। প্রায় ৫৩ বছর সফলভাবে নেতৃত্ব দেওয়ার পর ২০০২ সালে নিনটেনডো’র প্রেসিডেন্ট পদ ছেড়ে দেন ইয়ামাউচি। এরপর প্রতিষ্ঠানটির বোর্ড অব ডিরেক্টর হিসেবে কাজ করেন তিন বছর। ২০০৫ সালে আনুষ্ঠানিকভাবেই নিনটেনডো থেকে অবসর গ্রহণ করেন তিনি, সেইসাথে অবসান ঘটে এক বর্ণাঢ্য কর্মজীবনের। গেল ১৯ তারিখে তার জীবনাবসানকে গেমিং বিশ্বের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি হিসেবেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।