তিন মিনিট নীরবে তারা

আপডেট : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ১৮:৫৭
ভালো মানের নাটক নির্মাণের জন্য মানানসই জুটির বিষয়টা জরুরি। মানানসই জুটি হলে পরস্পরের অভিনয়ের রসায়নটাও জমে ওঠে। সম্প্রতি নোবেল ও বিন্দু জুটি বেঁধে অভিনয় করলেন ঈদের জন্য নির্মিত ‘তিন মিনিট নীরবে’ শিরোনামের একটি টেলিফিল্মে। এই দুই তারকা জুটির কথা নিয়ে আমাদের এবারের আয়োজন। লিখেছেন খালেদ আহমেদ প্রায় দুই যুগ ধরে শোবিজে আছেন মডেল নোবেল। মডেলিংয়ে আজও তিনি অপ্রতিদ্বন্দ্বী। আজকের প্রতিষ্ঠিত অনেক মডেলের কাছেই আইডল নোবেল। শোবিজে নিজেকে জড়ানোর গল্প জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি ঢাকায় আসি ১৯৮৯ সালের দিকে। তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি। এক কাজিনের পরামর্শে র্যাম্প মডেল হিসেবে শোবিজে যাত্রা শুরু করি। এক ফ্যাশন শোতে খ্যাতিমান বিজ্ঞাপননির্মাতা ও অভিনেতা আফজাল হোসেনের সঙ্গে পরিচয়। তার মাধ্যমেই মডেলিংয়ে হাতে খড়ি হয়। আফজাল হোসেন নির্মিত স্প্রাইটের একটি বিজ্ঞাপনে আমি প্রথম কাজ করি। টেকনিক্যাল কারণে ওই বিজ্ঞাপনটি প্রচার হয়নি। এরপর তার নির্দেশনায় কাজ করি আজাদ বলপেনের বিজ্ঞাপনে। এটাই আমার প্রচার হওয়া প্রথম কাজ। ‘লোনলি ডে লোনলি নাইট’ শিরোনামের সেই বিজ্ঞাপনটি এতই জনপ্রিয়তা পায় যে, এক বিজ্ঞাপনেই আমি সুপরিচিতি হয়ে যাই। এই একটি বিজ্ঞাপনই আমার নামের আগে যোগ করে দেয় মডেল শব্দটি। মডেলিংটাকে এনজয় করি বলেই এখন পর্যন্ত লেগে আছি।’ দেশের মডেলিং সেক্টরে প্রায় দুই যুগ ধরে জনপ্রিয়তা ধরে রেখেছেন নোবেল। এখন পর্যন্ত তিনিই দেশের সবচেয়ে দামি এবং নামী মডেল। এই সাফল্যের পেছনের রহস্যের কথা জানতে চাইলে নোবেল বলেন, ‘আমি সব সময় নিয়ম-নিষ্ঠা আর পরিমিতি বোধের মধ্যে থাকার চেষ্টা করেছি। ইচ্ছে করলে চাকরি ছেড়ে দিয়ে একের পর এক বিজ্ঞাপন কাজ করে যেতে পারতাম। এতে আর্থিকভাবেও হয়তো লাভবান হতাম। কিন্তু কখনোই আমি এমনটি ভাবিনি। যেকোনো কাজ করার আগে তা নিয়ে যথেষ্ট চিন্তা-ভাবনা করেছি। প্রতিদিন আমাকে শুটিং করতে হবে, কাজ করতে হবে, এমনটি আমি মাথায় আনিনি। আমি সব সময় চেয়েছি, প্রতিটি কাজে বৈচিত্র্য আনতে এবং যেটা করব সেটা ভালোভাবে বুঝে মনোযোগ দিয়ে করব।’ এ প্রসঙ্গে নিজের কাজের একটি উদাহরণ তুলে ধরে নোবেল বলেন, ‘একটি বিজ্ঞাপনে আমাকে বক্সারের চরিত্রে রূপদান করতে হবে জানলাম। আমি নিজের উদ্যোগেই আমার পরিচিত এক বক্সারের কাছে গিয়ে কয়েক সপ্তাহ ট্রেনিং নিয়ে বক্সিংয়ের কলাকৌশলগুলো রপ্ত করি। তারপর ক্যামেরার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। প্রায় প্রতিটি কাজেই আমি আগে নিজেকে এভাবে প্রস্তুত করি।’ নোবেল যখন মডেলিংয়ে আসেন তখন তিনি টগবগে তরুণ। এর প্রায় দুই যুগ পরে আজ তার মধ্যে হয়তো বয়সের একটা ভারিক্কি এসেছে, কিন্তু মিইয়ে যায়নি তারুণ্য। আশ্চর্যভাবে তিনি ধরে রেখেছেন ফিটনেস। বিজ্ঞাপনের বাইরেও মাঝেমধ্যে কিছু নাটকেও অভিনয় করে থাকেন। নোবেল অভিনীত প্রথম নাটক ‘প্রাচীর পেরিয়ে’। ১৯৯৫ সালে প্রচারিত এ নাটকটি ছিল প্যাকেজ প্রোগ্রামের আওতায় দেশের প্রথম টিভি নাটক। এরপর মাঝেমধ্যেই তিনি নাটক করেছেন, তবে তা বিশেষ বিশেষ দিবসে। এখনও তার নাটকে কাজ করার ইচ্ছে আছে, তবে ঈদ বা বিশেষ দিবসকে ঘিরে। টিভি নাটকের অভিনয় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘মডেল হয়েছি আমি ঘটনাচক্রে। কিন্তু এটাকে জীবনের অবলম্বন করিনি। কাজ পছন্দ হলেই শুধু কাজ করেছি। ইচ্ছে ছিল না অভিনয়ের। কিন্তু শুরুতে এমন কিছু জায়গা থেকে অনুরোধ এল যে, নাটকে অভিনয় করতেই হলো। তারপর একবার যখন করলাম, তখন হাতে সময় থাকলে কাজটা ভালো হলে না করি না। তবে বিশেষ বিশেষ নাটকেই আমি শুধু অভিনয় করি। গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে দিইনি, আর দেবও না।’ বিজ্ঞাপন আর নাটকের বাইরে নোবেল সবচেয়ে বেশি পেয়েছেন চলচ্চিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাব। কিন্তু চলচ্চিত্র তাকে আকর্ষণ করেনি বলেই কাজ করা হয়ে উঠেনি। এরইমধ্যে নোবেল শেষ করেছেন আসছে ঈদের জন্য নির্মিত কৌশিক শংকর দাশ পরিচালিত ও জিনাত হোসেন যুথী রচিত ‘শেষ থেকে শুরু’ নাটকটি। এই নাটকে তার বিপরীতে অভিনয় করেছেন লাক্স আনন্দধারা মিস ফটোজেনিক মিলা হোসেন। অন্যদিকে শোবিজের প্রতি বিন্দুর তেমন একটা আগ্রহ ছিল না। প্রয়াত নায়ক সালমান শাহকে তার খুব ভালো লাগত। তার ছবি-নাটক দেখতে দেখতেই মিডিয়ার প্রতি আকর্ষণ তৈরি হয়। তবে এই আকর্ষণটা তৈরির পেছনে বাবা-মায়ের অবদানও কম নয়। এ প্রসঙ্গে বিন্দু বলেন, ‘আমার বাবা একসময় মঞ্চ নাটকের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন, তিনি নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের হয়ে কাজ করতেন। বাবাই প্রথম লাক্স-চ্যানেল আই সুপারস্টারে আমাকে অংশ নিতে বলেন। এন্ট্রির একদম শেষ সময়ে মা আমাকে রেজিস্ট্রেশন করান। আমি আসলে বাবা-মায়ের অনুপ্রেরণায় আজ এ পর্যায়ে আসতে পেরেছি।’ প্রতিযোগিতায় প্রথম রানার আপ হওয়ার পর তার অভিষেক হয় মিডিয়ায়। হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস অবলম্বনে তৌকীর আহমেদ পরিচালিত ‘দারুচিনির দ্বীপ’ ছবিতে প্রথম অভিনয় করেন বিন্দু। এই চলচ্চিত্রটির পর বিন্দু অভিনীত ২টি ছবি মুক্তি পেয়েছে। ছবি দুটো হলো খিজির হায়াত্ পরিচালিত ‘জাগো’ ও পিএ কাজল পরিচালিত ‘পিরিতির আগুন জ্বলে দ্বিগুণ’। অভিনয় করছেন সোহেল আরমান পরিচালিত ‘এই তো প্রেম’ ছবিতে। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক এ ছবিতে ‘মাধবী’ চরিত্রে অভিনয় করছেন বিন্দু। এতে তার সহশিল্পী হিসেবে আছেন শাকিব খান। এদিকে বিজ্ঞাপনেও সাফল্যের দেখা পেয়েছেন এই অভিনেত্রী। শুরুর দিকে বাংলালিংকের বিজ্ঞাপনের মডেল হয়ে মডেলিংয়েও তৈরি করেন নতুন এক ক্রেজ। তারপর একে একে লাক্স, একটেল, ফিনলে চাসহ অনেকগুলো বিজ্ঞাপন চিত্রের মডেল হন তিনি। ‘দারুচিনির দ্বীপ’ ছবিতে অভিনয়ের পর থেকেই একের পর এক কাজের অফার বিন্দুর পিছু নেয়। কিন্তু তার পক্ষে তখন এতটা সময় দেওয়া সম্ভব হয়নি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবিএ’র ছাত্রী বিন্দু পড়ালেখা শেষ করার জন্য সময় নেন। চলতে থাকেন ধীরে ধীরে। অনেক বড় বড় নির্মাতাকেও এ সময় বিনয়ের সাথে ফিরিয়ে দিয়েছেন তিনি। তবে পরীক্ষার পরপরই পুরো দমে তিনি কাজ শুরু করেন। প্রথম থেকে এখন অবধি একঘণ্টার নাটককেই বেশি প্রাধান্য দিয়েছেন বিন্দু। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি মূলত আমার পড়াশোনাকে প্রাধান্য দিতে গিয়েই শুরুতে ধারাবাহিক নাটকে সময় দিইনি। এখন পড়াশোনার চাপ কমার পর একঘণ্টার নাটকের পাশাপাশি ধারাবাহিক নাটকেও কাজ করছি। তবে এ কথা সত্যি, ধারাবাহিক নাটকের চেয়ে একঘণ্টার নাটকে কাজ করে আমি বেশি তৃপ্ত হই।’ বিন্দু বর্তমানে ঈদের নাটকের অভিনয় নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। এরইমধ্যে তিনি শেষ করেছেন আসছে ঈদের জন্য নির্মিত ওয়ালিদ হাসান রচিত ও পরিচালিত ‘এক রাতে নন্দিনীর সাথে’ নাটকের কাজ। দর্শকনন্দিত মডেল ও অভিনেতা নোবেলের সাথে অভিনয়ের স্বপ্ন ছিল বিন্দুর অনেকদিনের। তার সেই স্বপ্ন পূরণে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন নাট্যপরিচালক রায়হান খান। গত ঈদে নোবেল বিন্দু প্রথম জুটিবদ্ধ হয়ে অভিনয় করেন রায়হান খান পরিচালিত ‘শুকনো পাতার ভালোবাসা’ টেলিফিল্মে। চ্যানেল আইতে প্রচারিত এই টেলিফিল্মটি বেশ দর্শকপ্রিয়তা পায়। আবারও নোবেলের সাথে জুটিবদ্ধ হয়ে রায়হান খানেরই নির্দেশনায় আরেকটি টেলিফিল্মে অভিনয় করছেন। ফারুক হোসেন রচিত এবারের টেলিফিল্মের নাম ‘তিন মিনিট নীরবে’। সম্প্রতি টেলিফিল্মটির শুটিং সম্পন্ন হয়েছে। টেলিফিল্মের গল্প আবর্তিত হয়েছে একটি ত্রিভুজ প্রেম নিয়ে। সোহেল নামক এক যুবকের সানজিদা ও মায়ার প্রতি ভালোবাসার দ্বৈত টানাপোড়েনের সম্পর্ক-এর উপর ভিত্তি করেই ‘তিন মিনিট নীরবে’ টেলিফিল্মের গল্প এগিয়ে যায়।’ টেলিফিল্মে মায়া চরিত্রে অভিনয় করছেন বিন্দু এবং সোহেল চরিত্রে অভিনয় করছেন নোবেল। আবারও বিন্দুর সাথে কাজ করা প্রসঙ্গে নোবেল বলেন, ‘বেশ প্রাণবন্ত, হাসিখুশি একজন মানুষ বিন্দু। অভিনয়েও বেশ ভালো। আগের কাজটি ভালো ছিল। নতুন কাজটিও ভালো হচ্ছে। গল্পটা সত্যিই দারুণ। এখানে জীবনের নানা বাস্তবতা উঠে এসেছে। সবমিলিয়ে এই নাটকে কাজ করে আমি মুগ্ধ।’ বিন্দু বলেন, ‘রায়হান ভাইয়ের নির্দেশনায় এর আগেও আমি ‘থার্টি ফার্স্ট মে’ নাটকসহ আরও বেশ কয়েকটি নাটকে অভিনয় করেছি। তার নির্দেশনা আমার সব সময়ই ভালো লাগে। আর ব্যক্তিগতভাবে আমি নোবলে ভাইয়ের অনেক বড় একজন ভক্ত। তার সাথে কাজ করতে পারাটা আমার জন্য সত্যিই সৌভাগ্যের বিষয়। তিনি ভীষণ কো-অপারেটিভ।’ ‘তিন মিনিট নীরবে’ নামের টেলিফিল্মটি আসছে ঈদে বাংলাভিশনে প্রচার হবে।