দায়িত্ব নেয়ার প্রথমদিন থেকেই পোপ ফ্রান্সিস একজন সংস্কারক। প্রাগ্রসর মনের পরিচায়ক এই পোপের নতুন ধর্মীয় ভাবনা হতবাক করছে অনেককেই। গরীবের পৃষ্ঠপোষক ধর্মগুরু ‘ফ্রান্সিস অফ এসিসি’ নামে নিজের নামকরণ থেকেই তার সহমর্মী ও সমকালীন আধ্যাত্মিকতার পরিচয় পেয়েছে বিশ্ব। প্রথমবারের মতো একটি সাক্ষাত্কারও দিয়েছেন তিনি। সাক্ষাত্কারেই উঠে এসেছে ক্যাথলিক চার্চের ভবিষ্যত্ নিয়ে তার গভীর দৃষ্টিভঙ্গিসহ প্রধান চারটি সংস্কার ভাবনা।
সাক্ষাত্কারটি যৌথভাবে প্রকাশ করেছে ইতালির পত্রিকা ‘লা সিভিলটা ক্যাথোলিকা’ এবং টাইম সাময়িকী।
মানব সেবাই হবে চার্চের লক্ষ্য
খ্রীস্টান ধর্মগুরুর মহত্ হূদয়ের গুণাবলির সবই চার্চের থাকবে এবং এর ভূমিকা চলমান হাসপাতালের মতই হওয়া উচিত বলে মনে করেন পোপ ফ্রান্সিস। এ প্রসঙ্গে তার উক্তি, “আমি পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি যে, চার্চের
এখন সবচে’ বেশি যা করা দরকার তা হল, যেখানে ক্ষত আছে তা সারিয়ে তোলা এবং যারা ধর্মবিশ্বাসী তাদের হূদয়কে চনমনে রাখা। এজন্য দরকার কাছে থাকার, ঘনিষ্ঠ থাকার।”
মানুষকে সবকিছুর ঊর্ধ্বে রাখাই প্রকৃত ধর্মবিশ্বাস
সামপ্রতিক বছরগুলাতে ক্যাথলিক চার্চ গর্ভপাত, জন্মবিরতির পদ্ধতি এবং বিয়ের মতো বিষয়গুলো নিয়ে তার অবস্থানের কারণে আলোচনায় উঠে এসেছে। কিন্তু পোপ ফ্রান্সিসের যুক্তি হচ্ছে, এসব ইস্যুর ঊর্ধ্বে স্থান পাওয়া উচিত মানুষের। গর্ভপাত এবং এ সম্পর্কে ক্যাথলিক শিক্ষা কি, সে জ্ঞান দেয়া শুরু না করে বরং ধর্মগুরুর উচিত এই ধর্মীয় শিক্ষা যাকে দেয়া হচ্ছে তাকে নিয়ে ভাবা এবং এ শিক্ষা ভবিষ্যতে তার কি কাজে আসবে তা নিয়ে চিন্তা করা। যদি একজন নারীর গর্ভপাত করা হয়ে থাকে, তাহলে ওই নারীকে জীবনের প্রতি আশাবাদী হতে ধর্মগুরুকে সহযোগী ভূমিকা পালন করতে হবে। তার মানে হচ্ছে, পাপ নয়, জোর দিতে হবে জীবনের মাধুর্যের ওপর। সমকামী বিয়ের ক্ষেত্রেও একই দৃষ্টিভঙ্গি। এই নয়া ভঙ্গি চার্চ জীবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। পোপের কথায়, পাপের চাইতে ঈশ্বর অনেক বেশি মহান।
“পাপের স্বীকারোক্তি দেয়া মানে নির্যাতন নেমে আসা নয়, বরং এটি এমনই এক অবস্থান যেখানে ঈশ্বরের ক্ষমা আমাদের ভালো কাজ করতে উদ্দীপ্ত করে।”
ছড়িয়ে দিতে হবে যীশুর প্রকৃত বার্তা
খুব সহজ অথচ বলিষ্ঠ ভাষায় তিনি বলেন, “কেবলমাত্র গর্ভপাত, সমকামী বিয়ে এবং জন্মবিরতি পদ্ধতি ব্যবহারের সাথে সম্পর্কিত বিষয়গুলোতে আমরা কট্টর হয়ে বসে থাকতে পারি না।” “ধর্মীয় অনুশাসন আর নৈতিক শিক্ষা এক নয়....সুতরাং মাত্র কয়েকটি ক্ষেত্রে যীশুর বাণী দেয়া যাবে না। কারণ, তা প্রাসঙ্গিক হলেও তাতে যীশুর বাণীর মর্মকথার স্ফূরণ ঘটে না”।
নৈতিক দিক দিয়ে উপরোক্ত ইস্যুগুলোতে চার্চের ধর্মীয় শিক্ষাকে সমর্থন করলেও পোপ বলেন, যীশুর মধ্যদিয়ে পাপমোচনের বৃহ্ত্তর বার্তার আওতায়ই তা নিয়ে আলোচনা করা প্রয়োজন। এর মানে তাদেরকে ঈশ্বরের ভালোবাসা নিয়ে কথা বলতে হবে এবং দৈনন্দিন জীবনযাপন নিয়ে দোষারোপ করা যাবে না। সময় সময় তাদের এ অবস্থানকে চলমান নিয়মের ব্যত্যয় বলে মনে হতে পারে। পোপ তার এ মতেরই প্রকাশ ঘটিয়েছিলেন ব্রাজিলের রিও ডি জেনেরিওতে। যখন তিনি তরুণদেরকে নিজেদের চার্চের সমস্যা সমাধানে উদ্যোগী হওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। নতুন সহমর্মী মনোভাব, বিশেষত দরিদ্রদের জন্য সমব্যথী হওয়ার মধ্যদিয়ে চার্চের ঐতিহ্যবাহী যাজকপ্রথা থেকে বেরিয়ে আসার কথা বলেছিলেন তাদের।
চার্চ জীবনে থাকবে নারী
রিও ডি জেনেরিও শহর থেকে ফিরতি পথে পোপ আভাস দেন, খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের জীবন যাপনে নারী আর তার অংশগ্রহণে ধর্মশিক্ষার দিকটা চার্চের একটা বড় সীমাবদ্ধতা। এ নিয়ে পোপ তার ভাবনা-চিন্তার দিকটি বিস্তারিতভাবে বলেন বৃহস্পতিবার প্রকাশিত সাক্ষাত্কারে। তিনি বলেন, “যেখানেই আমরা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেই না কেন, বুদ্ধিদীপ্ত নারীর মত থাকা তাতে জরুরি।” খ্রিস্টান ধর্ম নিয়ে পোপ ফ্রান্সিস তার নিজের মতবাদে নারীদের এগিয়েই রেখেছেন। তার কথায়, “আমি এমন এক চার্চের স্বপ্ন দেখি যা একই সঙ্গে মা এবং রক্ষক।” -বিডিনিউজ
