বুদ্ধিজীবী :ইতিহাস অনুসন্ধান ও আত্মপাঠ
সম্পাদনা : সৈকত হাবিব
প্রকাশক : ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ
প্রচ্ছদ : আজহার ফরহাদ
মূল্য: ৪৯৫ টাকা
তিনি আমাদের সময়ের সেই বিরল লিখিয়েদের মধ্যে একজন, যাঁরা লেখালেখির পাশাপাশি লেখালেখি-সংক্রান্ত কাজগুলোকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন, এবং সেইসব কাজ করার জন্য নিজেকে প্রস্তুত রাখেন। তাই তিনি যখন কোনো নিবন্ধ বা প্রবন্ধ বা মুক্তগদ্য রচনা করেন, সেটি কেবলমাত্র কবজি এবং মগজের ব্যায়াম না হয়ে আমাদের সামনে উপস্থিত হয় শিল্প-সাহিত্য-সামাজিক উপযোগিতার এক অপরিহার্য ভাষ্য হিসেবে। তিনি জানেন যে, সাহিত্য কেবল লেখকদের ওপর নির্ভর করে না। তাই তিনি কথা বলেন একই দ্বান্দ্বিক ভাষ্যে লেখকদের সঙ্গে, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে, আমাদের সমাজের নানামাত্রিক প্রবণতার সঙ্গে, রাজনীতির উত্থান-পতনের সঙ্গে, সর্বোপরি মানুষের ভেতরে বাস করে যে প্রকৃত মানুষ, সেই মানুষের সঙ্গে। প্রাতিষ্ঠানিক সাহিত্য আলোচনার সাথে পরিচিত আমাদের চোখে তাঁর মুক্তগদ্যগুলোকে অপরিচিত মনে হয়। অপরিচিত, কিন্তু উপভোগযোগ্য স্বাদু, আবার একই সঙ্গে জরুরি বলে স্বীকার করতেও আমরা বাধ্য হই। তাই সৈকত হাবিবের নতুন গদ্যের বই ‘কবি কবিতা ও কথা’ প্রকাশিত হলে আমরা আনন্দিত হই। আমাদের অমনোযোগী আত্মকেন্দ্রিক বৃহত্তর সাহিত্যসমাজের দুর্ভাগ্য যে এই ধরনের আনন্দের স্পর্শ পেতে তাদের অনেকটাই দেরি হয়ে যায়।
এই গ্রন্থে তিনি নিজের গদ্যগুলোকে চারটি উপশিরোনামে বিন্যস্ত করেছেন। মূল্যায়ন ও তর্পণ, বিষয় : কবিতা, সাহিত্য-সমাজ-সংস্কৃতি, জীবন-প্রকৃতি-পরিবেশ। মানবজীবনের কোন অংশকে স্পর্শ করলেন না তিনি! সময়কে এমনভাবে ধরতে পারেন, আমাদের সময়ে তেমন চিন্তার মানুষ খুব কম। বিশেষ করে সৈকত যখন বলেন—‘এখনকার পৃথিবী আমাদের আর দেয় না অবসর—নিজের ভেতরকার ধ্যানী পৃথিবী, আত্মমগ্ন জগত্ কিংবা জীবনানন্দের ভাষায় নিজের ভেতরের সারাত্সার আস্বাদ করার ফুরসত। ব্যক্তি-মানুষ হিসেবে বিশ্বজুড়েই জীবনের চাবিটি আর আমাদের ব্যক্তিগত হাতে নেই, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে। যদিও আগেও তেমন ছিল না, কিন্তু এরপর থেকে পুরোপুরিই বেহাত হয়ে গেল সব আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক-বৈশ্বিক নানামাত্রিক কারণে।’ তবে এটাই একমাত্র কারণ নয়। মগ্ন, সত্ কবির অভাবও এই কবিতা-বিচ্ছিন্নতাকে প্রকট করে তুলেছে। তার পরিবর্তে ‘প্রচারের মহামারী, ভোগ ও ভাগের কাড়াকাড়ি, খ্যাতিবাসনা, এগুলোর বন্য প্রকাশের মধ্য দিয়ে আজকের দিনের বহু ‘‘কবি’’ যেন অনেকাংশেই কবিতাকে ব্যবহূত ব্যবহূত ব্যবহূত হতে দিয়ে শুয়োরের মাংস করে তুলেছেন’।
এই কারণ-খননে সৈকত হাবিব ধাবিত হয়েছেন সেই দুঃখজনক প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে—‘যদিও পৃথিবীকে গভীর শুশ্রূষা দিয়ে চলেছে কবিতা বহুকাল, এমনকি লিখনপদ্ধতি আবিষ্কারের আগে থেকে, তবু আজ কী হলো পৃথিবীর, সে কেবলই কবিতা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে?’
রবীন্দ্রনাথকে বাদ দিয়ে তো বাঙালি মধ্যবিত্তের পক্ষে প্রশ্বাসবায়ু নির্বাহ করা অসম্ভব। তদুপরি গেল বছরটি ছিল সেই মহাপুরুষের সার্ধশত জন্মজয়ন্তী। তাই রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে না-লেখা প্রায় অসম্ভবই। সৈকত হাবিবও লিখেছেন। একটি নয়, দুইটি লেখা পত্রস্থ হয়েছে এই গ্রন্থে। এবং আমরা, পাঠকরা, আনন্দিত হয়ে দেখতে পাই, এখানে সৈকত কোনো চর্বিতচর্বণের আশ্রয় নেননি। নিজের একান্ত অনুভবকেই ব্যবহার করেছেন রবীন্দ্রতর্পণে। আর সেইসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের অসীমপ্রায় বিশালতাকে স্বীকৃতি দিয়েছেন এই বলে—‘রবীন্দ্রনাথ তাঁর বচনের ভেতর দিয়েই এত অনির্বচনীয় হয়ে উঠেছেন যে, আমার বচনে তাঁকে তেমন করে ধরা যেন অধরাকেই ধরতে চাওয়ার দুঃসাহস।’
জীবনানন্দ তো অপরিহার্যভাবেই আছেন তাঁর নানামাত্রিকতা নিয়ে। কিন্তু সৈকত হাবিবের বিশিষ্টতা সবচেয়ে ভালো ফুটে উঠেছে বুদ্ধদেব বসুর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশে। সমপ্রতি চালু হওয়া প্রবণতায় বুদ্ধদেব বসুকে পাশ্চাত্য-গ্রাসিত একজন কবি হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা বা অপচেষ্টা দেখা যাচ্ছে। যরা এই অপকর্মের সাথে জড়িত, তারা একটিবারও ভাবেন না যে বুদ্ধদেবের আগমন না ঘটলে, তাঁর প্রাণনিষ্ঠ অভিভাবকত্ব না পেলে বাংলাকবিতা কিছু রবীন্দ্র-প্রভাবিত অক্ষম কবিকূলের কলমপেশার ক্ষেত্র হিসেবেই রয়ে যেত। সবচেয়ে বড় কথা, পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি জীবনানন্দ দাশকে হারিয়ে যেতে হতো অতলের অন্ধকারে। সৈকত হাবিব বুদ্ধদেব বসুকে সম্মান জানিয়েছেন এক ‘আশ্চর্য চিরনতুন শিক্ষক’ বলে। এবং সেইসাথে এটাও জানিয়ে দেন যে—‘রবীন্দ্রনাথের পর শিল্পের নানা মাধ্যমে এত সহজ ও স্বচ্ছন্দ বিচরণ যেমন খুব কম লেখক করতে পেরেছেন, তেমনি নিরন্তর আত্মপাঠ-আত্মমূল্যায়ন-আত্মচেতনার মধ্য দিয়ে আমৃত্যু নবীন ও প্রবহমান থাকার ক্ষমতাও খুব কম লেখকেরই ছিল। রবীন্দ্র-পরবর্তীদের মধ্যে এক্ষেত্রে বুদ্ধদেব বসুই সবচেয়ে বেশি কৃতিত্ব নেওয়ার বৈধ অধিকার রাখেন।’
একসময়ের ছোটকাগজের নিবিষ্ট কর্মী সৈকত হাবিব এখনো ছোটকাগজ নিয়ে ভাবেন। তার মনে হয়, এই সময়ে ‘ছোটকাগজের ব্যক্তিত্ব পুনরুদ্ধার করা দরকার’। তার কাছে ছোটকাগজ ‘নয় নবীন-তরুণের আস্ফাালন, আবেগসর্বস্ব কলমচালনার ছাইভস্ম, অগ্রজ বা পূর্বজদের অন্ধ-অস্বীকার কিংবা কেবল স্বীকৃতি পাবার জন্য পণ্ডশ্রম।’ বরং তার চাইতে অনেক বেশি কিছু। কিন্তু বর্তমানে ছোটকাগজ যে ব্যক্তিত্বহীনতায় ভুগছে, তার কারণ হিসেবে সৈকত আবিষ্কার করেছেন ছোটকাগজ নির্মাতাদের ব্যক্তিত্বহীনতাকেই। সেই ব্যক্তিত্বহীনতার কারণেই ‘ছোটকাগজ এখন হয়ে উঠেছে আত্মপরতার সিঁড়ি। এর কোনো স্বকীয়তা নেই বললেই চলে। এখানে আছে কেবল বন্ধু, অগ্রজ, ক্ষমতাবান বা সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যায়—এমন সব লেখক-সম্পাদকের লেখা জড়ো করার এবং তা সুশোভন মোড়কে ছাপিয়ে দেওয়ার এবং সম্পাদক হিসাবে শ্লাঘা অনুভব করার ব্যাপার।’
দেশের সবচে সম্মানজনক সাহিত্য পুরস্কার প্রদায়ক হিসেবে বাংলা একাডেমী যে স্বচ্ছতা এবং সুনির্বাচনের পরিচয় রাখতে পারছে না, এই অভিযোগ অনেক পুরোনো। সৈকত হাবিবের মতো সাহিত্যের সর্বব্যাপী বিচারক এই বিষয়টি তো এড়িয়ে যেতে পারেন না। তাঁর তীক্ষ দৃষ্টি এই পর্যবেক্ষণ করতে পেরেছে যে, অনেক ক্ষেত্রেই এমন এমন সব লোককে ধরে-বেঁধে পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে যাঁদের পরিচিতি ও লেখার মান গৌণ লেখকের চাইতেও কম। আবার যাঁদেরকে পুরস্কার দিলে পুরস্কারটি যথার্থ সম্মানিত হতে পারত, এমন অনেকেই পুরস্কার না পেয়েই মৃত্যুবরণ করেছেন। পৃথিবীর সব পুরস্কার নিয়েই প্রশ্ন ওঠে। কিন্তু আমাদের বাংলা একাডেমীর পুরস্কার নিয়ে যত যথার্থ বিতর্কের অবকাশ রয়েছে, তা সম্ভবত সবাইকে ছাড়িয়ে গেছে। প্রকৃত লেখকরা পুরস্কারের লোভে লেখেন না। কিন্তু পুরস্কারের প্রকৃত দাবিদার এবং হকদার তারাই। অপরাজনীতির কলুষতা ক্রমেই এই পুরস্কারটির সম্মানহানি ঘটাচ্ছে। এটি জাতির জন্য কোনো ভালো দৃষ্টান্ত নয়।
পাঠক, সৈকত হাবিবের সঙ্গে আপনি নানা বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করতে পারবেন। কিন্তু যেসব বিষয় নিয়ে সৈকত গদ্যগুলো রচনা করেছেন, রচনাগুলোতে যেসব বিষয়ের অবতারণা করেছেন, সেগুলোর প্রাসঙ্গিকতা আপনাকে স্বীকার করতেই হবে। আপনাকে এ-ও স্বীকার করতে হবে যে, সৈকত হাবিব প্রচলিত আঙ্গিকে কথা বলেননি। আসুন আমরা তার সাথে সহমত পোষণ করি, দ্বিমত পোষণ করি, বিতর্ক করি। কেননা এসবের মাধ্যমেই আমাদের মননশীলতার পতিত জমিতে চিন্তার চাষ করা সম্ভব। আর মুক্তি নিহিত আছে চিন্তাচর্চার মধ্যেই। তবে সেজন্য আপনাকে এই বইটি পাঠ করতে হবে।
