আমরা লেখালেখি আরম্ভ করি এক ধরনের আনন্দ অবগাহনের তাড়নায়। সেই আনন্দটুকু একসময় আমরা আত্মার খোরাক হিসেবে প্রহণ করি। ইন্দ্রিয়লব্ধ এই আনন্দটুকু একসময় পৃথিবীকে নতুন করে দেখার এবং অনুভব করার আবেগে পরিণত হয়। কিন্তু এই আবেগ কি এমন উন্মাদনায় পৌঁছানো উচিত যে আত্মার এই নন্দনতাত্ত্বিক অভিযান নিছক চিত্তবিনোদন অথবা ব্যবসায়িক মনোবৃত্তির তথাকথিত ‘জনপ্রিয়’ শব্দের সাথে দৌড়বাজিতে মেতে ওঠে?
বাইরে রোদ-বৃষ্টি, আলো-ছায়ার প্রাণময় ডাকাডাকি অথবা বন্ধুদের সাথে আড্ডা, গলিতে-মাঠে, বিপণিবিতান আর চারপাশে ছড়িয়ে থাকা এত আনন্দময় জীবনের হাতছানি—সব ছেড়ে ঘরের এক কোণকে যারা নিরিবিলি বেছে নিয়ে কাগজ আর কলমে অন্য এক জগত্ তৈরি করে চলেন; তারা কেন তা করেন? এই যে চারপাশের জগত্ তার পুরো আনন্দ ধারণ করেই একজন লেখক কি লিখে চলেন? নাকি মানবসভ্যতার অফুরান আনন্দ-ধ্বনির মাঝে তিনি প্রেরণা নামের এক নির্বস্তুক বিষণ্নতা দিয়ে তাড়িত হন? এটা স্পষ্ট, সৃষ্টির আনন্দে লীন হয়েই একজন লেখক এ কাজ করেন। কিন্তু বর্তমান জটিল এই সমাজ মনে হয় না একজন লেখককে অনবরত এই সৃষ্টি-আনন্দ প্রক্রিয়ায় অবগাহন করাতে পারে। তাহলে প্রশ্ন জাগে একজন সৃষ্টিশীল মানুষ কিসের নেশায় দিনের পর দিন, রাতের পর রাত, মাস পেরিয়ে বছর ধরে কাগজ-কলমের এই যে অন্তর্লীন জগত্, তার মাঝে ডুব দেন? অন্যের কাছ থেকে এই প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়ার চেয়েও লেখক নিজের কাছ থেকে এমন প্রশ্নের সম্মুখীন বেশি হন এবং তিনি এর কোনো সঠিক উত্তরও খুঁজে পান না। আপাত ধারণায় এবং আমার লেখালেখির ছোট্ট জীবনের অভিজ্ঞতায় আমি যা বুঝি তা হলো, একজন সৃষ্টিশীল মানুষের সত্তা শব্দের প্রতি সংবেদনশীল, মানুষের আবেগের প্রতি দয়ালু অনুভবসম্পন্ন এবং ভাষা আর জীবনের প্রতি আবেগে পরিপুষ্ট তার অন্তর।
মানব সভ্যতার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি ভাষা। শুধুমাত্র ভাষা মানব-ইন্দ্রিয়ের গভীরতম উপলব্ধিকে ধারণ এবং তার ব্যাপ্তিময় স্ফটিকখণ্ডকে ছড়িয়ে দিতে পারে মানবের জীবন-প্রবাহে। ভাষা মানুষের নিজস্ব উপলব্ধির জগত্ থেকে গৃহীত ইন্দ্রিয়লব্ধ বিষয়গুলোর সংযোগ ঘটায় মানুষে মানুষে। মাতৃভাষা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তির ভেতর থেকে স্বপ্ন এবং আকাঙ্ক্ষা দিয়ে ভাবিত ভাবনাকে পরস্ফুিট করে তোলে। ভাষার পরিব্যাপ্তি কমে গেলে সমাজ এবং রাষ্ট্রে ধার করা পরিভাষা ব্যবহারের প্রবণতা তৈরি হয়। স্বভাষী মানুষের মাঝে মাতৃভাষা অনুসারণশীল হলে তাদের সত্তার অনুভব সমৃদ্ধ হয়। আর সেই ভাষাটিই যখন লিখিত আকার ধারণ করে তখন তার কার্যকারিতা হয়ে ওঠে বহুবিধ। কিন্তু ভাষার এই বহুবিধ কার্যকারিতার সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য স্থান কোনটি? নিঃসন্দেহে সাহিত্য। এই সাহিত্য ভিন্ন সময়ের, ভিন্ন মানুষ এমনকি ভিন্ন জাতিসমূহের সত্তার মাঝে তাদের শাশ্বত আত্মিক মূল্যবোধের সংযোগ ঘটায়। জাও হিঞ্জিয়ান (সোল মাউন্টেন উপন্যাসের জন্য সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত চায়নিজ লেখক) বলেছিলেন, ‘একজন লেখকের সৃজনশীলতার যথাযথ সূচনা ঘটে তার ভাষার মহত্ উচ্চারণের মধ্য দিয়ে এবং যেসব মহত্ উচ্চারণ তার ভাষায় এখনো পর্যাপ্তভাবে উচ্চারিত হয়নি, তা অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে!’ এই যে মানুষের আবেগী অনুভূতির উত্কর্ষ নন্দনতত্ত্ব, তা মানুষের পরিবর্তনের ইতিহাসকে পেছনে ফেলে স্বমহিমায় দাঁড়িয়ে থাকবে। একজন লেখক কি এসব ভেবে লেখেন? অবশ্যই না।
সাহিত্য কোনো পণ্য নয় অথচ দেশে দেশে সাহিত্য পণ্যবাজারের একেবারে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে না পারার কারণে, পণ্যবাজারের মানদণ্ডে তথাকথিত ‘জনপ্রিয়তা’ শব্দের আড়ালে নিজেকে যাচাই করে নেবার প্রবণতা সাহিত্যকে হত্যা করার সামিল। কিন্তু সাহিত্যের আসলে মৃত্যু হয় না, মৃত্যু হয় কালের প্রলোভনে পড়া ব্যক্তিক তুষ্টিলাভের প্রত্যাশী লেখকের—যারা সাহিত্যকে পুঁজি করে সমাজের চেয়েও মানুষের অন্তর্লোকে ক্রমাগত ভুল বার্তা প্রেরণ করেন। আমার শৈশবে আমার গ্রামের বাড়িতে বাস করা ওসমান নামের এক গৃহপরিচারকের বলা গল্প শোনার নেশায় বুঁদ হয়ে থাকতাম আমি। সারাবছর আমি অপেক্ষা করতাম স্কুলছুটির দিনগুলোতে গ্রামে গিয়ে ওসমান চাচার গল্প শুনব বলে। বাড়ির বাইরে বৈঠকখানা ঘরের পাশে ছিল তার বাস। রাত গভীর হলে আমি চুপিচুপি চলে যেতাম তার ঘরে। সেও যেন এই সময়ের প্রতীক্ষায় থাকত। হারিকেনের আলো কমিয়ে দিয়ে আর জোছনারাত হলে তা নিভিয়ে শিল্পীর নৈপুণ্য আয়ত্ত করা ওসমান আরম্ভ করত, ‘সেই দৈত্য বাস করত অনেক দূরের এক পাহাড়ে অথবা এক ছিল রাজা আর এক ছিল রানি।’ আমার শিশুমনের ওপর তার প্রভুত্ব বিস্তার করে এক অশিক্ষিত কৃষক অনায়াস দক্ষতায় চালিয়ে দিত তার নিজের জীবনের গল্প। কোনো এক বৃষ্টির রাত, সেই রাতে নির্জন এক দোকানঘরে বসে একা একা তার পড়ার চেষ্টা, তার গ্রাম, গ্রামের পাশের নদীর নিটোল জল, বাবা-মাকে হারানোর পর তার একাকী জীবনের দুর্ভোগ, অতঃপর জীবন আর প্রকৃতির সাথে লড়তে লড়তে আবেগভরে তার নিজের কাছে ফিরে আসা, স্বপ্নের উল্টাপৃষ্ঠায় তার অন্তর্লোকের মাঝে বিলীন হওয়ার, উজার হয়ে গিয়ে মন কেমন করা সব গল্পের কাঠামো আওড়ানো, তার কণ্ঠের ওঠানামায়, বাক্য-বিন্যাসের ছন্দে এসব গল্পই আমার শিশুমনে ছড়িয়ে দিত এক অদ্ভুত অনুভব! ওসমান মারা গিয়েছেন কিন্তু আজ আমি জানি, সাহিত্য এই মেঘ-সাগর-নদী আর আকাশ-বাতাসের মতো মানব-মনের চিরন্তন এক বিষয় যা সাজগোজ করা আয়োজনী-সাহিত্যের বাইরে ওসমানদের হূদয়ে লালিত হয় পরম যত্নে!
সৃজনশীল একজন ঔপন্যাসিক, তার প্রথম উপন্যাস সৃষ্টির তাড়না কোথা থেকে পান। এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে এবং লেখার প্রারম্ভিক অনুপ্রেরণার ধরন তলিয়ে দেখার আগে আমার প্রথম উপন্যাস সৃষ্টির মুহূর্ত ভাবনা এবং তখন কোথা থেকে আমি এই উপন্যাস সৃষ্টির অনুপ্রেরণা পেয়েছিলাম সেখানে দৃষ্টি ফেলতে চাই। ধূসর স্বপ্নের সাসান্দ্রা ছিল আমার প্রথম উপন্যাস, প্রথম গদ্য (কিছু কবিতা, ডায়েরি আর বাবা-মাকে লেখা অসংখ্য চিঠির গদ্য ব্যতীত)। এই উপন্যাস লিখতে গিয়ে এর প্রারম্ভিক ভাষার স্তর, ছন্দের গতির সাথে ভারসাম্য রক্ষা করতে গিয়ে একসময় আমার মনে হয়েছিল সামান্য সাঁতার জানা একজন মানুষ গভীর সমুদ্র হতে তীরের দিকে যাত্রা শুরু করেছে এবং তার তীরে পৌঁছার সম্ভাবনা নিয়ে তার নিজেরই সন্দেহ ছিল। সাঁতার কাটতে গিয়ে ঢেউয়ের ভাঁজে-ভাঁজে লুকিয়ে থাকা অফুরান এক জগত্ ধীরে ধীরে আমার কাছে স্পষ্ট
হয়েছিল। অফুরান এই জগত্টাকে তলিয়ে দেখার এই প্রবণতাই ছিল হয়তো ‘ধূসর স্বপ্নের সাসান্দ্রা’ সৃষ্টির মূল প্রেরণা। তবু নিজেকে যখন আমি নিজে অথবা অন্য কেউ প্রশ্ন করে, আমি কেন লিখি তখন বস্তুত আমার ভেতর থেকে যে উত্তর আসে তা হলো, ‘আমি জানি না!’ আমি কি প্রথম জন্মানো এই নিঃসঙ্গ প্রাণবিহীন পৃথিবীর ফিসফিস শুনতে চাই? আমি কি নিজেকে বলতে চাই আমার গ্রাম অথবা মফস্বল শহরের যে ইতিহাস, মানুষে মানুষে বংশ-পরম্পরায় বয়ে চলা যে বাস্তবতা, সেটা সত্যি নয়, সত্য হলো আমার উপন্যাসে মূর্ত জীবনপ্রবাহের জগত্! আমার গ্রাম, আর শহরের দালান-কোঠা, গাছ-গাছালি, পাখি আর জলে টলমল পুকুরে ছলছল কোনো চোখের দৃষ্টি... এইসব চিত্রকল্প আর বয়ে চলা শনশন বাতাসের সাথে তাদের কথোপকথন—এসবেরই ভেতরে লুকিয়ে আছে চিরন্তন কোনো সত্যি! আমি কি এজন্য লিখি যে আমি আমার ‘আমি’কে আকুল হয়ে খুঁজে ফিরি? নাকি কোনোদিন অর্থের অভাবে না ভোগা আমার এই শরীর ওই যে অনাহারী, কঙ্কালসার শিশু, যার কনকনে শীতের রাত কাটে রাস্তার পাশে তার শরীরের কষ্ট আর জীবনকে জীবনের মতো করে না পাওয়ার বেদনাকে শব্দের পর শব্দের সাঁকো বসিয়ে আলিঙ্গন করতে চায়? আমি কি লিখি এই জন্মে ‘নারী’ নামের পরিপূর্ণ মানুষ না হওয়ার কারণে কোনো নারী চরিত্রের মাঝে অনন্তকাল বাস করার অভিপ্রায়ে? আমি কি একাকী হওয়ার বাসনায় আপ্লুত হতে চাই? আমি কি মানব-মনের নির্জনতর এক ভাষাকে নিবিড় ভালোবাসায় পরিচর্যা করতে চাই? আমি কি আমার ভেতর বাস করা ‘কারো আপন হতে না পারা’র এক প্রাচীন পৃথিবী, এক বালুচরকে আবিষ্কার করতে চাই। পরিশেষে আমার কাছে যে বাক্য দাঁড়িয়ে থাকে তা হলো—‘আমি জানি না!’ কি জানি, হয়তো এই না জানাটা সাহিত্যের জন্য জরুরি। এই না জানাটুকু নিরুত্তাপ সাহিত্য-সৃষ্টির পথে লেখকদের ক্রমশ উত্সাহিত করে।
‘ধূসর স্বপ্নের সাসান্দ্রা’ লিখতে গিয়ে আমি সচেতন ছিলাম যেন আমার উপন্যাসটা শুধু মানবিক সমস্যা নিরূপণের অথবা এই বিশ্বের ক্ষতকে সনাক্তকরণের চেয়ে গভীরতর কোনো সময় সত্তার বৈশিষ্ট্যকে ধারণে সক্ষম হয়। আমার উপন্যাসের রসায়নকে আমি আমার সৃষ্ট চরিত্রসমূহের ভেতরে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলাম। সেই চরিত্রসমূহের মুখের ভাষায়, আর বর্ণনায় আমি ধ্বনি-স্পন্দন সৃষ্টি করতে চেয়েছিলাম। সমাসবদ্ধ শব্দগুলোর প্রতি তাই ছিল আমার বিশেষ দুর্বলতা। আমি চেয়েছিলাম বাকপ্রতিমার (Image) মাধ্যমে আমার উপন্যাসের দৃশ্যকল্প আঁকতে। সত্যের জন্য হূদয়ের গভীরতর সত্যের মাঝে ডুব দিয়ে আমার কল্পনাগুলোকে আমি প্রাণবন্ততা দিতে চেয়েছিলাম। আফ্রিকান জাতিসমূহের ভাষা হারানোর বেদনাকে ভাষা নামের হাতিয়ার দিয়ে সম্মোহিত করতে চেয়েছিলাম। সাড়ে তিনশ পৃষ্ঠার প্রথম উপন্যাস মাত্র আট মাসে, বয়স তিরিশ পেরোনোর আগেই শেষ করে যে আনন্দ পেয়েছিলাম, পরে তা অসন্তুষ্টিতে পরিণত হয়েছিল। আমি যা ধারণ করতে চেয়েছিলাম তার কিছুই যেন হলো না! তবু উপন্যাসটি ‘এইচ এস বি সি-কালি কলম’সহ এম এস ক্রিয়েশন কর্তৃক
শ্রেষ্ঠ গ্রন্থের পুরস্কার অর্জন করায় সেই অসন্তোষে যোগ হয়েছে নতুন প্রত্যয়। হতাশ না হয়ে প্রত্যয়টুকুই ধরে রাখা একজন লেখককে তার পরের লেখাটুকু সম্পন্ন করতে হয়তো সহায়তা করে।
আত্মিক উন্মেষ অথবা আধ্যাত্মিক প্রশান্তিলাভের সাহিত্যধারা রচনার জন্য লেখককে নির্জনতর জগতের সঙ্গী হতে হয় এবং নৈঃসঙ্গ্যকে সাথি করে নেওয়ার জন্য থাকতে হয় নিরন্তর মানসিক শক্তি। কাফকার জীবন থেকে নেওয়া উদাহরণ থেকে আমরা স্পষ্ট বুঝতে পারি, নিরুত্তাপ সাহিত্য রচনার ক্ষেত্রে লেখার আনন্দটুকু লেখকের সবচেয়ে বড় প্রাণশক্তি। সামাজিক স্বীকৃতি, পুরস্কার, প্রশংসা-বাক্যসমূহ অথবা কোনো প্রতিদান-প্রত্যাশার চেয়ে সৃজনশীল একজন লেখকের এই প্রাণশক্তিই সবচেয়ে বড় পুঁজি।
আমরা লেখালেখি আরম্ভ করি এক ধরনের আনন্দ অবগাহনের তাড়নায়। সেই আনন্দটুকু একসময় আমরা আত্মার খোরাক হিসেবে প্রহণ করি। ইন্দ্রিয়লব্ধ এই আনন্দটুকু একসময় পৃথিবীকে নতুন করে দেখার এবং অনুভব করার আবেগে পরিণত হয়। কিন্তু এই আবেগ কি এমন উন্মাদনায় পৌঁছানো উচিত যে আত্মার এই নন্দনতাত্ত্বিক অভিযান নিছক চিত্তবিনোদন অথবা ব্যবসায়িক মনোবৃত্তির তথাকথিত ‘জনপ্রিয়’ শব্দের সাথে দৌড়বাজিতে মেতে ওঠে? লেখকদের কখনোই জনগণের ‘চাওয়া’র জন্য ভাঁড়ামি করা উচিত নয়। কারণ তারা অভিনেতা নন। সাহিত্য মূলত নিজের অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে আত্মসচেতনতার অনুসন্ধান। তাই কোনো প্রকৃত লেখকই নিজের ভেতর লুকানো হূদয়ের গভীর কথাটা লুকাতে পারেন না। এই সত্য শুধু অনুভূতিবিচ্ছিন্ন ঘটনা, কল্পনা অথবা সরলভাবে নির্মিত কোনো মিথ্যামায়ার গল্পগাথা নয়, এটা জীবনের এমন স্থিরচিত্র যা মানবমনের অতলান্তে তীক্ষ অনুভূতিসহ বাস করে। এভাবেই সাহিত্য মানব-হূদয়ের নৈতিক সত্যগুলো যা পাঠকের চেতনায় নাড়া দেয় তা ধারণ করে। সত্যের হিতোপদেশ দেওয়া পবিত্র গ্রন্থসমূহ সাহিত্যের মতো করে মানব-মননে সত্যের স্থায়ী আকৃতি প্রদানে সক্ষম নয়। মহান ধর্মীয় গ্রন্থসমূহেও সেজন্যই মাঝে মাঝে আমরা গল্পাকারে সাহিত্যের বিস্তৃতি খুঁজে পাই। সত্যকে মানব-হূদয়ে প্রথিতকরণের শেষ স্তর হিসেবে আমরা শেষমেষ সাহিত্যকেই খুঁজে পাই।
যে ইতিহাসের পিঠের একপাশে আমরা বাস করি আর ধারণ করি তার অন্যপাশ—সেই ইতিহাস মূলত স্পষ্ট হয় একটা জাতির ভাষার উত্কর্ষতায়। আফ্রিকার ভাষাহারানো অনেক জাতিকে কাছ থেকে দেখে আমার এ ধারণা জন্মেছে যে, ভাষা হারিয়ে গেলে ইতিহাসের পৃষ্ঠে আমাদের বসবাস আর বেঁচে থাকা হয় অন্ধের মতো।
তারপরও ভাষা ও সাহিত্যকে টিকিয়ে রাখার জন্য কোনো দেশ, রাষ্ট্র, অথবা গোত্রের ভেতরে কোনো রাজনৈতিক তত্পরতা লক্ষ করা যায় না। বরং সাহিত্যকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা লক্ষণীয়! তাই রাজনীতি নয়, মানবিক অনুভূতির বুদ্ধিবৃত্তিক, ব্যক্তিক মূল্যবোধের আত্মকথন-প্রবণতা সাহিত্যের অস্তিত্বকে সুদূরপ্রসারী করে তোলে। আর সেই অস্তিত্ব ভাষার পাখনায় ভর করে হয়ে ওঠে বৃহত্তর মানব মনের অনুরণনের উর্বর ভূমি। কিন্তু বাস্তবতা হলো আমাদের মতো দেশগুলোতে বুদ্ধিবৃত্তিক অনুপ্রেরণার চাইতে লোকদেখানোর মতো স্থূলরুচির চর্চা এখনো উঠে যায়নি। একজন বিত্তশালী মানুষ যখন ভালো কোনো বইয়ের মূল্য জিজ্ঞাসা করেন তখন আমরা বুঝে যাই, এটা তার অর্থ-খরচ সক্রান্ত দ্বিধা নয়। তাহলে? কিসের দ্বিধা? এটা কি বই পড়লে নিজের ভেতরকে ‘চিনে ফেলা’ এবং একই সাথে নিজেকে ‘না চেনা’র জটিল মনস্তাত্ত্বিক দ্বিধা? অগোছালো ঢঙে আমাদের আর্থিক উন্নতি হলেও আমাদের আত্মিক এবং নৈতিক উন্নতির স্থানটুকু এখনো পরিপক্ক হয়ে ওঠেনি। বৈশ্বিক ধারণায় বিশেষত শহুরে শ্রেণীর মানুষের মাঝে সর্বোচ্চ শ্রেণীর মানুষের ন্যায় বিলাসী জীবন-যাপনের উচ্চাকাঙ্ক্ষা এখন সর্বগ্রাসী অধৈর্যের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। নেতৃত্বের ব্যর্থতা,পদবির সাথে পদবিধারীর যোগ্যতার অভাব, কোনো প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ পদবি ধারণের পরও নিজের সম্মানের জায়গাটুকুতে নিজেকে সমাজে হতাশাব্যঞ্জক অবস্থানে আবিষ্কার অতপর দূর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়া—এরকম একটা নিজস্বহীনতার অনুভূতিতে আক্রান্ত দেশে ছোটরা বড়দের শ্রদ্ধা অথবা সম্মান করতে শেখে না। ফলে আমাদের এই প্রজন্ম নৈতিকতার বোধের ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলছে। নড়বড়ে হয়ে যাচ্ছে পারিবারিকভাবে গড়ে ওঠা আত্মিক ভিত্তিমূল। অবিশ্বাস, একাকিত্ববোধ, হতাশা, নিরাপত্তাহীনতা এবং বেকারত্ব-ভীতি আমাদের স্বপ্নহীন এক অতিবাস্তবতা হওয়ায় প্রতিনিয়ত এই প্রজন্মের ভেতরে আপনজনদের প্রতিও অবিশ্বস্ত হওয়ার প্রবণতা লক্ষণীয়। তাই ইন্টারনেটে দূরবর্তী মানুষদের কাছে তারা তাদের সেই স্থানটুকু পূরণের জন্য লালায়িত, যা তাদের জীবন থেকে কেড়ে নিচ্ছে তাদের মূল্যবান সময়। অবিশ্বাস-অশ্রদ্ধার এমন সামাজিক প্রেক্ষাপটে একটা জাতিতে যে সংকট তৈরি হয় তা হলো নেতৃত্ব প্রদানে আত্মবিশ্বাসহীনতা। সংকট উত্তরণের পন্থা হিসেবে এমন পরিস্থিতিতে স্বপ্নালু চোখে সমাজ সচেতন মানুষগুলো তখন মেধাবী ও স্পর্শকাতর, হূদয়বান এবং অতিন্দ্রীয় ক্ষমতার অধিকারী শব্দ-কারিগর অথবা শিল্পীর দিকে তাকিয়ে থাকেন এই আশায়; এতদিনে গড়ে ওঠা তাদের সভ্যতা হয়তো সেইসব প্রতিভাধর মানুষদের হাতে রক্ষা পাবে।
গদ্যের শুরুতে, আমরা কেন লিখি তা অনুসন্ধান করতে গিয়ে আমি লিখেছিলাম, ‘আমি জানি না’। এখনো, এমনকি সারাজীবনে কোনোদিন এই প্রশ্নের উত্তর না খুঁজে পেলেও আপাতত আমি লিখতে চাই কারণ, উপন্যাস লেখার চেয়ে আমার ছোটগল্প/উপন্যাসে যারা আলোর কণা খুঁজে ফেরেন, তাদের উদ্দেশ্যের মাঝে আমি পথ খুঁজতে চাই।
একজন লেখক লিখতে চান, কারণ তিনি নিজকে বলতে চান ‘শ্রেণী-ভেদাভেদের ঊর্ধ্বে আমি নিতান্তই এক সাধারণ মানুষ’। যারা গোত্র, পদবি আর সামাজিক অবস্থান দিয়ে মানুষের আত্মিক অবস্থানকে শ্রেণীভুক্ত করেন-খুব সম্ভবত ছোট্ট এই জীবনের ‘অর্থ’ বোঝার মতো দূরদর্শিতা তাদের নেই।
একজন লেখক লিখতে চান কারণ, তার সৃষ্টিকে কেন্দ্র করে বয়ে চলা এই মহান সময়কে ধারণ অথবা সভ্যতা সংরক্ষণের যে জাদুঘর তিনি তৈরি করে চলেন, জ্বালাতে চান আলোর অনন্ত শিখা—তিনি চান না, তার অবশিষ্ট রশ্মিটুকু নিভে যাক।
