শুদ্ধতম শিল্পই কবিতা। আত্মার আগুনে, নিভৃতির ধ্যানে, আবেগের আভায়, মননের দ্যুতিতে সে পরিস্রুত, পরিশীলিত। কবিতা এসে ভর করে কবির ওপর। তার মধ্যে ঐশী একটা ব্যাপার আছে বলে উপলব্ধ হয়। এই অতীন্দ্রিয় বোধের অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞার ব্যাখ্যা-বয়ান চিত্রায়ণ আসলেই অসম্ভব। চৈতন্যের এক গোপন নিভৃত প্রদেশে কবিতার ঠাঁই— সেই মনোলোক রহস্যলোকের সঙ্গে কবির যে সখ্য, তা অত্যন্ত নিবিড়-গভীর, ছায়াঘন, মায়াময়।
কবিতা এক ধরনের মরমিয়তার সাধনাও বটে। কবিতা লেখার কাজটি কঠিন, অত্যন্ত কঠিন। মানসিক মূল্য দাবি তো সে করেই। এমনকি শারীরিক এক প্রকার ক্লেশ, অবসাদও অনুভব করি আমি। মেঘে মেঘে বেলা কম হলো না। জীবনের সায়াহ্নকালে এসে মনে হয়, নতুন করে শুরু করছি বুঝি বা। এ পর্যন্ত আমার ৯৩টি বই বেরিয়েছে, তার মধ্যে কাব্যগ্রন্থ ৩৩টি। আমার কবিতাচিন্তা সেসবে নিশ্চয়ই প্রতিফলিত, প্রজ্বলিত। কবিতা নারীর মতোই রহস্যময়ী, অধরা, তৃষ্ণার্ত, ঈপ্সিতা। পণ্ডিত রবিশঙ্কর একবার তাঁর সাক্ষাত্কার নেওয়ার সময় আমাকে বলেছিলেন, ‘উচ্চাঙ্গ সংগীত সকলের জন্যে নয়। তা বুঝতে হলে প্রস্তুুতি থাকা চাই।’ বিশ্বনন্দিত এই সংগীতজ্ঞের কথাটা বড়ই খাঁটি। কবিতার পাঠকের ক্ষেত্রেও এই কথা প্রযোজ্য।
বিষণ্ন বেহালা-দাহ
চিন্তার ধোঁয়ার মধ্যে উড়তে থাকে জাগতিক স্বপ্নমালা
উড়ুক্কু স্বভাব তার চাতুর্যের চূড়া ছোঁয় ওড়ে দিগ্বিদিক
ধোঁয়ামেঘে আকাশের আদিঅন্ত দিগন্তসন্ধ্যার ছবি
গোধূলিয়া ইচ্ছাপূরণের গল্প সবই ওড়ে ছাইভস্মে
ওই ডানা ধার করে কবিও তো উড়তে পারে ইচ্ছেমতো
কিন্তু কবি হারিয়ে ফেলেছে তার ব্যথাতুর ওড়ার বাসনা
নিজেই নিজের কাছে অস্বচ্ছ আয়নার কষ্ট মর্চে পড়া ধুলো
এমন আশ্চর্য ধন্দে কোথায় লুকোনো যায় তেমন গহ্বর কই
তারই খোঁজে কেটে যায় একেলা বিরহবেলা একেলা জীবন
চিন্তা নয় চালধোয়া স্নিগ্ধ হাত জীবনানন্দ কবি যার সখ্য চেয়ে
একেলা নিজেরই মধ্যে গুমরে গুমরে বিষণ্ন বেহালাছড়ে দাহে
উদযাপন করে গেছে উপেক্ষা ও বঞ্চনার তপ্ত খর শীতার্ত সময়
সে কবি নিঃসঙ্গ ছিল লোকালয়ে নৈঃসঙ্গ্যের ধু ধু চর্চা মনোমতো
করা হয়তো সম্ভব ছিল না সত্য, তারপরও দীর্ঘশ্বাসই ব্রত মেনে
পুড়েছে হাওয়ায় পুড়ে একাকিত্বে বিদীর্ণ বিশীর্ণ হয়ে একা হয়ে
চিন্তা তুমি মনোলগ্না ধূপ হয়ে চৈতন্যের কেন্দ্রমূলে জ্বলতে থাকো
জ্বলো অনিঃশেষ তুমি আঁধারে একক দুঃখে ঘষে ঘষে জ্বালাও জীবন
এই আটপৌরে মর্ম থেকে মননের মুক্তি ক্ষমা দাও...
মৃত্যু হঠ যাও
আধো ঘুমে আধো স্বপ্নে আধো অল্প জাগরণে
মনে মনে জপে যাচ্ছি জীবন তোমারই নাম-
মধ্যযাম শেষ হয়, উঁকি দিতে উদ্যত হয়েছে ভোর
সে প্রসন্ন উত্থানের আগে ভাগে হয়তো কিছুটা
অবসন্ন, প্রকৃত সে আধো ক্লান্ত আর্তি মনোচোর
তাকে বলছি ফুলের উপমা, সে বিহঙ্গ নিরুপমা
উড়ে উড়ে বেড়ায় মোহান্ত-সত্যে ওড়ে পোড়ে বহু দূর
পাষাণের প্রাণ ভেঙে জেগে ওঠো জীবন আনন্দসোনা
মৃত্যুকে রাঙাও চোখ, মৃত্যু এক মর্মান্তিক যন্ত্রণা অসুর...
কেন করো
সত্যের স্বাদ তেতো কিন্তু কলঙ্ক হয় মিঠে
পাপের মগ্ন কোমলতায় পিছলিয়ে যায় পা
নিয়ন্ত্রণের বাইরে গেলে ফেরত পাচ্ছো না।
সবার জন্যে কলঙ্কভাগ হওয়ার মধ্যে আছে
তৃপ্তি পাবার মতন কিছু মনবিবেকের কাছে
সত্য কঠিন সত্য সাধন বৈরাগী মন চায়
কিন্তু সে হয় ঘরপালানি নিঝুম নিরালায়
সত্য স্বাধীন মন পরাধীন মনের জ্বালা বড়ো
ও মন তুমি কেমন করে এমন কাজটি করো?
দাও গো উড়াল
ক.
উদ্বেগ চতুর খুবই, অতি দ্রুত সংক্রমিত হয়
মানুষের মগজেই নির্বিবাদ রাজ্যপাট, অন্য কোথা নয়
খ.
ফ্যাকাশে পাণ্ডুর হয়ে আসছো তুমি পাখি
খাঁচা ফেলে উড়াল দেয়ার বুঝি
এসে গেছে মোক্ষম সময়
নাই দ্বিধা ইতস্তত অথবা সংকোচ
আঁধার এভাবে গাঢ় হয়
গ.
পাথর পাথর অন্ধ পাথর
আমার দিকে নিপুণ ছুঁড়ে মারো
আঘাত পেয়ে উল্ল¬সিত
আনন্দ পাই আরো
ঘ.
এই দেহ এই আত্মা এই স্নিগ্ধ ফুলের ইশারা
কিভাবে সম্ভবপর বেঁচে থাকা ওর স্পর্শ ছাড়া
ঙ.
ভাসতে ভাসতে জীবন ভেলায় মরণ ছবির আঁকা
শেষ হলো না আঁকার গর্ব-তাই ক্যানভাস ফাঁকা
