যতদূর চোখ যায় কেবলই ধূ-ধূ মরুভূমি আর পাহাড়ের পরিবেষ্টন। জনমানবশূন্য, তরুলতাহীন ও খাদ্যপানীয়শূন্য একটি নীরব-নিস্তব্ধ এলাকা। চিন্তায় হযরত ইব্রাহিম (আ.) কে তোড়পাড় করে ফেলছিল। হঠাত্ সম্বিত ফিরে পেলেন, এটা যে আল্লাহতায়ালার পরীক্ষা! সঙ্গে সঙ্গেই তিনি হূদয়ের সব মমত্ববোধ পরিহার করে স্ত্রী ও শিশু পুত্রের দিক হতে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে চলতে থাকলেন
মুসলিম মিল্লাতের পিতা হযরত ইব্রাহিম (আ.)। তিনি আল্লাহতায়ালা কর্তৃক অনেক পরীক্ষার সম্মুখীন হন। আর পরীক্ষিত সকল বিষয়ে তিনি উত্তীর্ণ হন। যার কারণে আল্লাহতায়ালা তাঁকে খলিল বা একনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করে নেন। সাথে সাথে তাঁকে মুসলিম জাতির পিতা বানিয়ে দেন। যেহেতু হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর প্রতিষ্ঠা করা আদর্শ হজ্ব ও কুরবানী আমাদের মাঝে ঘনিয়ে আসছে। সেহেতু হযরত ইব্রাহিম (আ.) সম্পর্কে আমাদের প্রত্যেক মুসলমানের জানা উচিত। আজকের নিবন্ধে সেসমস্ত বিষয় আলোকপাত করতে প্রয়াসী হয়েছি। যেসমস্ত বিষয়ে তিনি পরীক্ষায় অবতীর্ণ হন, নিজ ঈমানী শক্তি ও আল্লাহর অনুগ্রহে তার সব ক'টিতে তিনি উত্তীর্ণ হন। আমরা জানি পৃথিবীতে যত নবী-রসূল এসেছিলেন সকলেই মূর্তির বিরোধিতা করেছিলেন। (তবে হযরত মুহাম্মদ (স.) অন্য ধর্মের উপাসনালয়ের মূর্তির ওপর আঘাত করতে ও প্রতিমা সম্পর্কে বিষোদগার করতে নিষেধ করেছেন) হযরত ইব্রাহিম (আ.) ও তাঁর কওমের মানুষদের মূর্তি পূজায় আকণ্ঠ নিমজ্জিত দেখে মানসিকভাবে বেকারগ্রস্ত হয়ে পড়লেন। যার কারণে তাদের মূর্তির ওপর তিনি সুযোগ বুঝে আঘাত করেছিলেন। এটা ছিল তাওহিদের দাবী। কিন্তু খোদা দাবীদার জালিমশাহী নমরুদ এটা বরদাস্ত করে নাই। সে বিশাল আগুনের কুণ্ডলী তৈরি করে তাতে নিক্ষেপ করে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছাই করে হযরত ইব্রাহিম (আ.)কে মারার পরিকল্পনা করেছিল। হযরত ইব্রাহিম (আ.) তাতে বিন্দুমাত্র ঈমান থেকে দূরে সরেন নাই। শংকিতও হন নাই। নমরুদ হাজার হাজার শ্রমিক দিয়ে বিশাল বড় গর্ত খনন করে তাতে রাজ্যের বড় বড় গাছগুলো ভরে ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ আগুনের লেলিহান তৈরী করেছিল। এরপর হযরত ইব্রাহিম (আ.)কে সেখানে হাজির করা হলো। গর্তের আগুনের বিশালতা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। কোন মানুষ গর্তের ধারে-কাছেও যেতে পারে না। তারা হযরত ইব্রাহিম (আ.)কে আগুনে ফেলার জন্য উপায় বের করল। একটি চড়ক তৈরি করা হলো। অনেক উঁচু এই চড়কে হযরত ইব্রাহিম (আ.)কে উঠিয়ে দিয়ে ঘুরপাক দিয়ে তাঁকে আগুনের মাঝখানে ফেলে দেওয়া হবে। তিনি আগুনে পুড়ে কিভাবে ছাই হয়ে যাবে সেটা দেখার জন্য নমরুদ এবং তার মন্ত্রী পরিষদ গর্তের অনতিদূরে উঁচু মঞ্চ করে বসে দেখছে। যে সময় হযরত ইব্রাহিম (আ.)কে চড়কে উঠিয়ে ঘুরপাক দিয়ে ফেলে দিবে, সেই মুহূর্তে তাঁর ঈমান পরীক্ষা করার জন্য আল্লাহতায়ালা হযরত জিব্রাইল (আ.)কে পাঠালেন। হযরত জিব্রাইল (আ.) এসে বললেন, হে ইব্রাহিম! আপনাকে আগুনে ফেলা হচ্ছে। আপনি আমার কাছে সাহায্য চান। আমি আপনাকে বাঁচিয়ে দেব। হযরত ইব্রাহিম (আ.) বললেন, জিব্রাইল, আমি তোমার কাছে কেন সাহায্য চাইবো? আমি তো কোন অন্ধ আল্লাহর ইবাদত করি না? যিনি তাঁর বান্দার দুঃখ-কষ্টগুলো নিজের চোখে না দেখেন। হযরত ইব্রাহিম (আ.) এই মুহূর্তেও ঈমান থেকে টলেন নাই। যার কারণে এই পরীক্ষায় তিনি উত্তীর্ণ হলেন। এর কিছুক্ষণ পরেই তাঁকে আগুনের কুণ্ডলীতে নিক্ষেপ করা হলো। আল্লাহ সঙ্গে সঙ্গে আগুনকে আদেশ করলেন হে আগুন, আমার ইব্রাহিমের জন্য শান্তিদায়ক ঠান্ডা হয়ে যাও। হযরত ইব্রাহিম (আ.) আগুনের মধ্যে নিক্ষিপ্ত হলেন; কিন্তু পুড়ে যাচ্ছেন না, সুস্থ্য-সুন্দর আছেন। এটা নমরুদ সহ্য করতে পারছিল না। তাই সে আগুনের প্রতি হুংকার ছেড়ে বলল, রে আগুন! আমার দুশমন কেন জ্বালাতে পারিস না? তোর পোড়ানোর শক্তি, দাহ্য শক্তি কি রহিত হয়ে গেছে নাকি? আগুনের মধ্য হতেও আওয়াজ বের হয়ে এলো-নমরুদ! আমার মধ্যে দাহ্য শক্তি আছে কি নেই, পোড়ানোর শক্তি আছে কি নেই, তুই নিজে আয়, তোরেসহ তামাম দুনিয়া পুড়িয়ে দিতে পারি; কিন্তু হযরত ইব্রাহিমের (আ.) একটি পশমও পুড়াতে পারি না। কারণ পৃথিবীতে যা কিছু আছে সবকিছুই আল্লাহর হুকুম মেনে চলছে। মহাকবি ইকবাল (রহ.) বলেছেন, ‘আজো ভিহো জু ইব্রাহিম কা ঈমা পয়দা আক কার ছেকতিহে এ্যক আন্দাজে গুলিস্তাঁ পয়ঁদা’ ইব্রাহিমী ঈমান যদি আজো কারো হয় বিদ্যমান, গড়তে পারেন অগ্নি কুন্ড খুবছুরত গুলিস্তান। এখনো যদি ইব্রাহিমের সন্তানদেরকে আগুনের মধ্যে ফেলে দেয়া হয়; আর ইব্রাহিমী ঈমান যদি থাকে তাহলে আগুনকে ফুলের বাগান বানানোর ক্ষমতা আল্লাহর আছে। হযরত ইব্রাহিম (আ.)কে আল্লাহ কর্তৃক যতগুলো পরীক্ষা ছিল তার মধ্যে আগুনে নিক্ষেপিত হওয়ার পরীক্ষাটি ছিল সবচেয়ে বড়। তাফছীর মা’রেফুল কুরআনের মধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে, ছোট-বড় সব মিলে প্রায় ত্রিশটির মত বিষয়ে হযরত ইব্রাহিম (আ.)কে আল্লাহতায়ালা পরীক্ষা করেন। অন্য পরীক্ষাগুলো হলো, আল্লাহতায়ালা হযরত ইব্রাহিম (আ.)কে মাদয়ান হতে সিরিয়ায় হিজরত করার জন্য বললেন। সঙ্গে সঙ্গে হযরত ইব্রাহিম (আ.) তা পালন করলেন। এরপর আল্লাহতায়ালা বললেন, হে ইব্রাহিম তোমার স্ত্রী ও শিশুপুত্র ইসমাইলকে নিয়ে জনমানবহীন মরুভূমিতে যাও। হযরত ইব্রাহিম (আ.) আল্লাহতায়ালার এই আদেশও পালন করার জন্য প্রস্তুত হয়ে গেলেন। আল্লাহ জিব্রাইল (আ.)কে পাঠালেন হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর সঙ্গে যাওয়ার জন্য। পথিমধ্যে যেখানেই কোন জনমানবহীন এলাকা দেখতেন সেখানেই হযরত ইব্রাহিম (আ.) বসে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হতেন। জিব্রাইল (আ.) বারবার বলছিলেন, এখানে নয় আর একটু চলুন। এভাবে চলতে চলতে একেবারে কাবা ঘরের সন্নিকটে নিয়ে পৌঁছলেন। এরপর আল্লাহর পক্ষ থেকে হুকুম হলো- হে ইব্রাহিম তোমার স্ত্রী ও শিশু পুত্রকে এখানে রেখে তুমি ঘরে ফিরে যা-ও। হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর হূদয় কন্দরে যেন একটি শূন্যতা হাহাকার করে উঠলো। কারণ যতদূর চোখ যায় কেবলই ধূ-ধূ মরুভূমি আর পাহাড়ের পরিবেষ্টন। জনমানবশূন্য, তরুলতাহীন ও খাদ্যপানীয় শূন্য একটি নিরব-নিস্তব্ধ এলাকা। চিন্তায় হযরত ইব্রাহিম (আ.) কে তোড়পাড় করে ফেলছিল। হঠাত্ সম্বিত ফিরে পেলেন, এটা যে, আল্লাহতায়ালার পরীক্ষা। সঙ্গে সঙ্গেই তিনি হূদয়ের সব মমত্ববোধ পরিহার করে স্ত্রী ও শিশু পুত্রের দিক হতে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে চলতে থাকলেন। (চলবে)
