দুই বাংলার ভোটের সংস্কৃতিও অভিন্ন!

আপডেট : ১৮ মে ২০১৯, ০৩:১২

প্রতিবেশী দেশ ভারতে এখন লোকসভার ভোট চলছে। ১১ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া এই নির্বাচন আগামী রবিবার শেষ হবে সপ্তম পর্বের ভোটগ্রহণের মধ্য দিয়ে। ফল জানা যাবে ২৩ মে। এই নির্বাচনের গোড়া থেকে এই পর্যন্ত প্রচার-প্রচারণা ও সামগ্রিক হালচালের দিকে চোখ রাখলে সহজেই যে চিত্র ফুটে ওঠে সেটি হলো—ভারতের বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের ভোটের হালহকিকত আর বাংলাদেশের নির্বাচনের রূপ যেন একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ।

প্রতিপক্ষকে ব্যক্তিগত আক্রমণ, দলের প্রয়াত নেতাদের সমালোচনা, মিছিল-মিটিংয়ে হামলা পাল্টা হামলা, জালভোট প্রদান, ব্যালটবাক্স ছিনতাই, প্রতিদ্বন্দ্বীর এজেন্টকে কেন্দ্রে ঢুকতে বাধা প্রদান এবং এজেন্টকে বের করে দেওয়া, প্রভাব খাটিয়ে কেন্দ্র দখল করে নেওয়া—কী নেই এই নির্বাচনে! প্রতিপক্ষকে সমাবেশ করতে না দেওয়া, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর গাড়িবহরে হামলা, ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া, গোলাগুলি, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকদের বাড়িঘরে হামলা ও গুলি করে হত্যা, নির্বাচন কমিশনের কাছে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ, সংবাদ মাধ্যমের কাছে পরস্পরের বিরুদ্ধে বিষোদগার সবই আছে এই নির্বাচনে। এমনকি বাংলাদেশের আদলে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রায় প্রতিদিনই অভিযোগ তুলতে দেখা যাচ্ছে প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোকে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ ইত্তেফাককে বলেন, ভারতের বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনের যে সংস্কৃতি ছিল সেটি আস্তে আস্তে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তাদের নেতাদের বক্তব্যের ভাষা অনেকাংশে বাংলাদেশকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছে।

নির্বাচন বিশ্লেষকদের মতে, গতবারের মতো ভারতের এবারের নির্বাচনেও সারাদেশে ক্ষমতাসীন বিজেপির একমাত্র নির্বাচনী মুখ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। দলকে ছাপিয়ে মোদিই মুখ্য হয়ে উঠেছেন ভোটের হাওয়ায়। একইভাবে বাংলাদেশের একাদশ সংসদ নির্বাচনেও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নির্বাচনী মুখ ছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। লোকসভার নির্বাচনে বিজেপির প্রধান প্রতিপক্ষ কংগ্রেসের প্রচারণায় যেমন এবার নেই সোনিয়া গান্ধী, তেমনি বাংলাদেশেও সর্বশেষ নির্বাচনে বিএনপি ভুগেছে নেতৃত্বহীনতায়।

বাংলাদেশের নির্বাচনে এক পক্ষ যেমন আরেক পক্ষের নির্বাচনী প্রচারে বাধা দেয়, একইভাবে গত মঙ্গলবার পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনী রোড শো করতে গিয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা-কর্মীদের বাধার মুখে পড়েন বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি অমিত শাহ। একই দিন মধ্যপ্রদেশে নির্বাচনী প্রচারণায় গিয়ে বিজেপির কর্মী-সমর্থকদের তোপের মুখে পড়েন কংগ্রেসের উত্তর প্রদেশের পূর্বাঞ্চলের সাধারণ সম্পাদক প্রিয়াঙ্কা গান্ধী। বাংলাদেশেও এমন ঘটনা অহরহ ঘটছে।

বাংলাদেশে নির্বাচনে পুলিশ ও প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে বিরোধী দলগুলোর অভিযোগের অন্ত থাকে না। নির্বাচনের সময় বাংলাদেশে যেমন বিভিন্ন আসনে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে হতাহতের ঘটনা ঘটে, তেমনি ভারতেও এই ধরনের ঘটনা ঘটছে। গত ১২ মে লোকসভার ষষ্ঠ ধাপের ভোটের আগেরদিনেও পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনী সহিংসতায় দুইজন নিহত হন। বিভিন্ন আসনে তৃণমূলের সঙ্গে বিজেপির সংঘর্ষ, ভোটকেন্দ্রে বিজেপির এজেন্টদের ঢুকতে বাধা দেওয়া ও বের করে দেওয়া, কেন্দ্র দখল এবং জালভোট দেওয়ার ঘটনাও ঘটে। বাংলাদেশের নির্বাচনের সময়ও বিভিন্ন আসনে এরকম ঘটনা মামুলি ব্যাপার হয়ে ওঠে।

ভোটের আগে বাংলাদেশের প্রধান প্রধান দলগুলো নিজেদের জয়ের ব্যাপারে আশা প্রকাশ করে থাকে। ভারতের চিত্রও অভিন্ন। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, ‘এবারই মোদি শেষ, টেনে হিঁচড়ে মোদিকে গদি থেকে নামাবো।’ জবাবে মোদি বলেছেন, ‘পশ্চিমবঙ্গের মানুষ তাঁর (মমতা) ওপর ক্ষুব্ধ, দেশ ও দেশের মানুষের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার কারণে ভোটে তাকে খেসারত দিতে হবে।’

বাংলাদেশের নির্বাচনের সময় যেমন কোনো কোনো দল বক্তব্য-বিবৃতিতে আকারে-ইঙ্গিতে সেনাবাহিনীকে টেনে আনার চেষ্টা করে, এবার ভারতের নির্বাচনেও সেরকম ঘটনা ঘটেছে। কংগ্রেস বহুবার অভিযোগ করেছে, বিজেপি সেনাবাহিনীকে ব্যবহারের চেষ্টা করছে। নির্বাচনের দিনগুলোতে বাংলাদেশে যেমন বড় নেতা-নেত্রীর পরিবারের সদস্যরাও আক্রমণের শিকার হন, পশ্চিমবঙ্গও এর ব্যতিক্রম নয়।

বাংলাদেশে একাদশ সংসদ নির্বাচনে ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিনের (ইভিএম) ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তোলে বিএনপিসহ দলটির জোটসঙ্গীরা। ভারতেও ইভিএম ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বিরোধী দলগুলো। বাংলাদেশে নিত্যপণ্যের দাম বাড়লে, নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন হলে কিংবা ধর্ষণের ঘটনা ঘটলেও সেটিকে দলগুলো নিজেদের সুবিধামতো রাজনীতিতে ব্যবহারের সুযোগ খোঁজে। এবার ভারতেও ঘূর্ণিঝড় ‘ফণী’ নিয়ে বাহাসে জড়ান মোদি ও মমতা। মোদি অভিযোগ করেন, ‘স্পিড ব্রেকার দিদি বড্ড বেশি অহংকারী। পশ্চিমবঙ্গে ফণীর ক্ষয়ক্ষতি জানার জন্য ফোন করেও দিদিকে পাইনি।’ জবাবে মমতা বলেছেন, ‘মেয়াদোত্তীর্ণ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আমি মঞ্চ ভাগাভাগি করতে রাজি নই।’

বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচনে বড় দলগুলোর নেতারা পরস্পরকে যেমন ব্যক্তিগত আক্রমণ করতে ছাড়েন না, তেমনি ভারতেও নেতারা অভিন্ন তোপ দাগেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি নিজেকে দেশের ‘চোকিদার’ বলে দাবি করেছেন। জবাবে রাহুল বলেছেন, ‘চোকিদার নিজেই চুরি করেন’। এখানে যেমন কৃষক ও কৃষিপণ্যকে রাজনীতিতে টেনে আনা হয়, ভারতেও তেমনটিই ঘটে থাকে।

সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার এ বিষয়ে বলেন, নির্বাচনে চুরি করা ও ফাঁকি দেওয়ার অভ্যাসের ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে কোনো মিল আছে কি না জানি না, তবে প্রশ্ন হলো এই অপসংস্কৃতি কে কার কাছ থেকে চুরি করলো! তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও ভারত উভয় দেশেই দেখছি ক্ষমতার অত্যন্ত নগ্ন ব্যবহার হচ্ছে, যা বাঙালি হিসাবে আমাদের জন্য লজ্জার।