হূদরোগ প্রতিরোধ করুন

আপডেট : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ১৭:১৫
সংক্রামক ব্যাধি কমার সাথে সাথে অসংক্রামক ব্যাধি বিশেষ করে হূদরোগ, ক্যান্সার, শ্বাস-প্রশ্বাসজনিত অসুখ ও ডায়াবেটিস বিশ্বে এক বিরাট স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। হূদরোগ এবং স্ট্রোক সমগ্র বিশ্বে সবচেয়ে বড় ঘাতক ব্যাধি। বিশ্বে প্রতি বছর ১ কোটি ৭১ লাখ লোক এই রোগে মারা যায়। যার মধ্যে শতকরা ৮২ ভাগ মৃত্যু হয় নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশগুলোর জনগণের। হূদরোগের ঝুঁকিসমূহ ++ উচ্চ রক্তচাপ ++ তামাক গ্রহণ ++ উচ্চ কোলেস্টেরল ++ শারীরিক পরিশ্রমের অভাব ++ অতিরিক্ত ওজন ++ ডায়াবেটিস হূদরোগ নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব শুধু নীতি-নির্ধারক ও বিশ্ব নেতৃবৃন্দ-এর নয়। বিশ্বের যে যেখানে আছে সবাই নিজ নিজ অবস্থান থেকে যদি হূদরোগের ঝুঁকি জেনে সেগুলো এড়িয়ে চলে তাহলে তার পরিবার যেমন ঝুঁকিমুক্ত থাকবে তেমনি বিশ্বে হূদরোগজনিত জটিলতাও কমবে। কিছু নিয়ম যেমন- স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া, শারীরিক পরিশ্রম করা, তামাকমুক্ত জীবন-যাপনের মাধ্যমে এই অকাল মৃত্যু অনেকাংশে এড়ানো সম্ভবপর হয়। পরিবারের মধ্যে মেনে চলার জন্য চারটি বিষয়কে চিহ্নিত করা হয়েছে, যা পরিবারের সদস্যদের সুস্থ হার্ট গঠনে সহায়ক হিসেবে কাজ করবে। ১. বাড়িতে সিগারেট, বিড়ি, জর্দ্দা,সাদা পাতা সহ সকল প্রকার তামাকের ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করুন ++ বাড়িতে তামাকমুক্ত পরিবেশ বজায় থাকলে তা আপনার এবং আপনার সন্তানের হার্টকে সুস্থ রাখতে সহায়তা করবে। কারণ এটা প্রমাণিত যে, তামাক গ্রহণ করোনারী হূদরোগের অন্যতম রিস্ক ফ্যাক্টর। সুতরাং কঠোরভাবে ধূমপানসহ সকল ধরণের তামাক গ্রহণ থেকে পরিবারের সবাইকে মুক্ত রাখার চেষ্টা করতে হবে। ++ তামাক সেবন করোনারী হূদরোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। তামাক ছেড়ে দেওয়ার পর হূদরোগের ঝুঁকি এক বছরে অর্ধেকে নেমে আসে এবং ১৫ বছর পর এই ঝুঁকির মাত্রা একেবারে যে কখনও তামাক খায়নি তাদের কাছাকাছি হয়ে যায়। ২. পরিবারের সকলের প্রতিদিন শাক-সবজি ও ফলমূলসহ স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যাভাস গড়ে তুলুন- ++ বাড়িতে স্বাস্থ্যকর খাবার তৈরি করুন এবং এই সব খাবার খেতে সকলকে উত্সাহিত করুন। স্কুল বা অফিসে বাসার তৈরি খাবার দিয়ে দিন। সবাই ফল এবং সবজি খাওয়ার অভ্যাস করুন। ++ প্রতিদিনের শুরুতে একটি করে ফল খাওয়ার চেষ্টা করুন। কমপক্ষে ২ থেকে ৩ পরিবেশন শাক সবজি দিনে প্রত্যেকের খাওয়া নিশ্চিত করুন। ++ স্বাস্থ্যকর খাবারে সম্পূর্ণ চর্বি ও লবণের পরিমাণ কম থাকে যা হূদরোগ প্রকিরোধে সহায়তা করে। ৩. পরিবারের সবাইকে খেলাধূলাসহ অন্যান্য শারীরিক পরিশ্রম করতে উদ্ধুদ্ধ করুন। প্রতিদিন মাত্র ৩০ মিনিট শারীরিক পরিশ্রম হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোক প্রতিরোধে সাহায্য করে ++ নিজের কাজ নিজে করা চেষ্টা করুন। ++ পরিবারের সদস্যদের টেলিভিশন দেখার সময়কাল সীমিত করে ফেলা উচিত। প্রতিদিন দুই ঘন্টার বেশি সময় টেলিভিশন দেখা উচিত নয়। ++ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ঘরের বাইরে বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করুন। যেমন- সাইক্লিং, হাঁটা, দড়ি খেলা কিংবা বাগানে বা ছাদে বিভিন্ন ধরনের খেলধূলা করুন। ++ সম্ভব হলে গাড়ির পরিবর্তে হেঁটে কিংবা সাইকেলে করে আপনার বাড়ি থেকে গন্তব্যে পৌঁছান। ++ বাড়িতে লিফট থাকলে সেটা পরিহার করে সিঁড়ি ব্যবহার করুন। ++ বাগানের কাজ যেমন- ঘাস কাটা, ঝরা পাতা কুড়ানো, আবর্জনা পরিস্কার করা, মাটি খনন করা, গাছের ডাল-পাতা ছাঁটাই করার মাধ্যমে কায়িক পরিশ্রম করা সম্ভব। ৪. হূদরোগের ঝুঁকির মাত্রা জেনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করুন ++ একজন স্বাস্থ্যকর্মী বা ডাক্তারের নিকট থেকে আপনার রক্তচাপ, কোলেস্টেরল এবং গ্লুকোজের মাত্রা, কোমর ও নিতন্বের আনুপাতিক পরিমাপ এবং বডি মাস ইনডেক্স জানুন। সবগুলো ঝুঁকির মাত্রা জেনে সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করুন। ++ একবার আপনি আপনার হূদরোগের ঝুঁকির মাত্রা জানলে সে অনুযায়ী হার্টকে সুস্থ রাখার জন্য এবং হার্টের অবস্থার উন্নতির জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারবেন। বাড়ির এই পরিকল্পনা এমনভাবে লিপিবদ্ধ করে রাখুন যেন তা মেনে চলার জন্য বারে বারে মনে পড়ে। উপরোক্ত নিয়মগুলো মেনে চললে পৃথিবীর যে প্রান্তেই হোক না কেন একটি পরিবার হূদরোগের প্রকোপ কমাতে অনেকখানি সক্ষম হবে। তবে এটা ঠিক যে, হূদরোগজনিত সকল সমস্যাসমূহ প্রতিরোধযোগ্য নয়। এজন্য বাড়িতে হার্ট অ্যাটার্ক বা স্ট্রোক হলে করণীয় সম্পর্কে জানা প্রয়োজন। শতকরা প্রায় ৭০ ভাগ কার্ডিয়াক এবং শ্বাস-প্রশ্বাসজনিত জটিলতা বাড়িতে ঘটে থাকে। সুতরাং বাড়িতে উপস্থিত সদস্য পরিবারের আক্রান্ত সদস্যকে সাহায্য করতে পারেন। এজন্য হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের লক্ষণ ও উপসর্গসমূহ জানা প্রয়োজন। কারণ এগুলো জানা থাকলে পরিবারের কেউ এই রোগসমূহে আক্রান্ত হয়েছেন কিনা সেটা বুঝতে পারা যাবে। তবে পরিবারের কোন সদস্যের মধ্যে এই লক্ষণ বা উপসর্গসমূহ দেখা দিলে জরুরী ভিত্তিতে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে এবং চিকিত্সকের শরণাপন্ন হতে হবে। হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ ও উপসর্গগুলো জানুন এই লক্ষণগুলো একেক জনের ক্ষেত্রে একেক রকম হয়ে থাকে। যেমন- ++ বুকের মাঝখানে প্রচন্ড ব্যথা হয় যা বাম দিকে অথবা সারা বুকে ছড়িয়ে যেতে পারে, এমনকি গলা বা বাম হাতে ও চোয়ালেও ছড়িয়ে যায়। ++ প্রচুর ঘাম হয় এবং বুকে চাপ চাপ বা ভারী অনুভূত হয়। ++ শ্বাসকষ্ট বা অস্থস্তিবোধ, দূর্বলতা ও ক্লান্তিবোধ হয়। ++ পেটে গ্যাস ও পেটে ব্যথা হতে পারে। ++ বমি, বদহজম, মাথা ঘোরানো, মাথা ব্যথা হতে পারে কিংবা কখনও কখনও অজ্ঞানও হতে পারে। স্ট্রোকের লক্ষণ ও উপসর্গগুলো জানুন স্ট্রোকের উপসর্গগুলোও একেক জনের ক্ষেত্রে একেক রকম হয়ে থাকে। যেমন- ++ হঠাত্ মুখমন্ডল, বাহু বা পা-এ দূর্বল অনুভব হতে পারে; বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এটা শরীরের এক পাশে হয়ে থাকে। ++ হঠাত্ বলতে বা বুঝতে অসুবিধা বা দ্বিধাগ্রস্থ হতে দেখা যায়। ++ হঠাত্ হাঁটতে অসুবিধা, তন্দ্রাচ্ছন্ন, শরীরের ভারসাম্য বা সমন্বয়তার অভাব দেখা যায়। ++ হঠাত্ কোন জানা কারণ ছাড়াই মারাত্মক মাথা ব্যথা হয়। যদি উপরোল্লেখিত উপসর্গগুলোর কোনটি দেখা যায়, যা আসে এবং যায়; সঙ্গে সঙ্গে নিকটস্থ হাসপাতালের জারুরী বিভাগে যোগাযোগ করতে হবে। লেখক: প্রখ্যাত হূদরোগ বিশেষজ্ঞ ও মহাসচিব, ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ