নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলার ছুটাছুটি আর সেই সঙ্গে রৌদ্র-ছায়ার লুকোচুরি খেলা—এই হচ্ছে শুভ্র স্নিগ্ধতার অপরূপ ঋতু শরতের চিরায়ত অবয়ব। নগর জীবনে শরেক সেভাবে এ বছর খুঁজে পাওয়া না গেলেও গ্রাম-বাংলায় বিস্তীর্ণ চরাচরে শরত্ এসেছে চিরকালের পথ ধরেই। আকাশ কালো করে দেয়া মেঘ, বিজলির আলো মাখা ঝমঝম বৃষ্টিই যেন এ বছর রাজধানীবাসীকে বঞ্চিত করে শরতের রূপ-রস আস্বাদন থেকে। তারপরও শরত্ যে নগরবাসীর জীবনেও কাশবনের দোলায় ডাক পাঠায়—গতকাল শুক্রবার ঢাকার শরত্ উত্সবের দুটি অনুষ্ঠানে মানুষের ঢল দেখে তা অস্বীকার করার উপায় ছিল না। গানে, নৃত্যের ছন্দে মানুষের মনের উচ্ছ্বল আনন্দ মূর্ত হয়ে উঠেছিল গতকাল সকালে প্রকৃতিপ্রেমী মানুষের সরব উপস্থিতির মধ্য দিয়ে।
সকালে ধানমন্ডির রবীন্দ্র সরোবরের শতায়ু অঙ্গনে রবীন্দ্র সঙ্গীত সম্মিলন পরিষদ, ঢাকা মহানগর শাখা আয়োজন করেছিল প্রভাতি অনুষ্ঠানের। আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে সত্যেন সেন শিল্পী গোষ্ঠী আয়োজন করেছিল সারাদিনব্যাপী শরত্-উত্সব।
মেয়েরা সাদা রঙের শাড়ি, খোঁপায় শিউলি ফুলের মালা, ছেলেরাও সাদা রঙের পাঞ্জাবি পড়ে অনুষ্ঠানস্থল জমিয়ে তুলেছিল। নগর জীবনের এই কোলাহলে মানুষ নিষপ্রাণ, হিসেবী, প্রকৃতি-বিচ্ছিন্ন। প্রকৃতিকেন্দ্রিক এই উত্সবগুলোতে তাই আমরা প্রকৃতির সাথে, মানুষের সাথে মিলতে চাই। নিজেকে নতুন করে চিনে নিই, মিলিয়ে নিই প্রীতির বন্ধনে। সেই মিলবার তাগিদে শিল্পীদের গানে সুর মিলিয়ে বাঙ্গালি আমন্ত্রণ জানালো সজীব প্রাণময় প্রকৃতিকে।
চারুকলার বকুলতলায় সত্যেন শিল্পী গোষ্ঠীর প্রভাতি অধিবেশন স্বভূমি লেখক শিল্পীদের কণ্ঠে দেশের গান দিয়ে শুরু হয়। তারা গেয়ে শোনান ‘শত স্বপ্নের দেশ আছে এই মানচিত্রে’। এরপর একে একে দলীয় সঙ্গীত পরিবেশন করে বহ্নিশিখা, সত্যেন সেন শিল্পী গোষ্ঠী, সুর বিহার শিশু সংগঠন, ধ্রুব শিশু-কিশোর সংগঠনের শিল্পীবৃন্দ। দলীয় নৃত্য পরিবেশন করে স্পন্দন, নটরাজ, নৃত্যমের শিল্পীবৃন্দ। একক সঙ্গীত পরিবেশন করে মহিউজ্জামান চৌধুরী ময়না, নাসিমা শাহিন ফেন্সী, বিমান চন্দ্র বিশ্বাস ও জান্নাতুল ফেরদৌস লাকী। আবৃত্তি করেন নায়লা তারাননুম চৌধুরী কাকলি ও লায়লা আফরোজ।
শরত্কথনে অংশ নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আ.আ.ম.স. আরেফিন সিদ্দিক, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সহ-সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ, ড. নিগার চৌধুরী ও এম.ই. চৌধুরী শামীম। সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের সভাপতি ড. হায়াত্ মামুদ। অনুষ্ঠান সঞ্চালন করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মানজার চৌধুরী সুইট। এছাড়া সকালে শিশু-কিশোরদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়।
বিকালের আয়োজনে শিশু-কিশোর সংগঠন কল্পরেখা দলীয় আবৃত্তি পরিবেশনা করে। দলীয় সংগীত পরিবেশন করে-পঞ্চভাস্কর, ধ্রুবতান, প্রতীতি, ক্রান্তি, মংলু ও সত্যেন সেন শিল্পী গোষ্ঠী। দলীয় নৃত্য পরিবেশন করে-নটরাজ, নৃত্যশ্রী ও স্পন্দন। এছাড়াও একক সংগীত পরিবেশন করেন-খায়রুল আনাম শাকিল, কল্পনা আনাম, তানিয়া মান্নান, আরিফ রহমান, আবিদা রহমান সেতু, সমর বড়ুয়া, মাহজাবিন রহমান শাওলী, রত্না সরকার, নবনিতা জাইদ চৌধুরী অনন্যা, ঝর্ণা মন্ডল, মাফিয়া রহমান মিঠি, সুষ্মিতা মন্ডল ও শহিদুল ইসলাম সৌরভ প্রমুখ। সকালের পর্বটি চ্যানেল আই সরাসরি সম্প্রচার করে।
এদিকে, বাঁশি ও বেহালাবাদন দিয়ে শুরু হয় রবীন্দ্র সঙ্গীত সম্মিলন পরিষদের প্রভাতি অনুষ্ঠান। ‘দেখো, দেখো, দেখো, শুকতারা আঁখি মেলে চায়’ এ গান দিয়ে শুরু হয় অনুষ্ঠান।
অনুষ্ঠানে একক গান গেয়ে শোনান সাজেদ আকবর, আদ্রিনা জামিলী, লাইসা আহমেদ লিসা, অভয়া দত্ত, ইলোরা আহমেদ শুক্লা, স্বাতী সরকার, লোপা আহমেদ, অভীক দেব, এটিএম জাহাঙ্গীর প্রমুখ। উপস্থাপনা করেন রিআ মাহমুদ, নৃত্য পরিচালনা করেন ওয়ার্দা রিহাব। অনুষ্ঠানটির পৃষ্ঠপোষকতা করেছে ‘এসপারটো হেলথ কেয়ার’।
