মহান মুক্তিযুদ্ধে গাইবান্ধা

আপডেট : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ১৯:৪৪
সারাদেশের মতো গাইবান্ধাও একাত্তরের মার্চে উত্তপ্ত হতে থাকে। ১৭ মার্চ তত্কালীন জাতীয় পরিষদ সদস্য মরহুম লুত্ফর রহমান (সাবেক এম পি) কে আহ্বায়ক ও প্রাদেশিক সদস্য ওয়ালিউর রহমান রেজা এবং অধ্যাপক আতাউর রহমানকে যুগ্ম আহ্বায়ক করে ১৭ সদস্য বিশিষ্ট মহকুমা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। এছাড়া আবু তালেব মিয়া (সাবেক এম পি), হাসান ইমাম টুলু, হিরুসহ আরো বেশ কয়েকজন নেতা ও কর্মী মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকের ভূমিকা পালন করেন। ২৩ মার্চ ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে গাইবান্ধা পাবলিক লাইব্রেরী মাঠে তত্কালীন মহকুমা ছাত্রলীগের সভাপতি এমএন নবী লালু গাইবান্ধায় প্রথম বাংলাদেশের পতাকা আনুষ্ঠানিকভাবে উত্তোলন করেন। ২৭ মার্চ ছুটিতে আসা এবং অবসরপ্রাপ্ত সেনা, নৌ, বিমান এবং আনসার বাহিনীর সদস্যদের সমম্বয়ে এখানে মুক্তি বাহিনী গঠন করা হয়। মুক্তি বাহিনীর নেতৃত্ব দেয়া হয় তদানীন্তন ইপিআর-এর সুবেদার আলতাফকে। সেইদিন থেকে গাইবান্ধা কলেজ মাঠ, ইসলামিয়া হাইস্কুল মাঠ ও আনসার ক্যাম্পে ছাত্র, যুবক ও জনতাকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। প্রশিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন সুবেদার আলতাফ, নৌবাহিনী হতে দলত্যাগী জওয়ান কাজিউল ইসলাম, ওয়াহেদুন্নবী মিন্টু, সেনাবাহির মকবুল হোসেন বাদল, ওয়াহিদুল্লাহ আজাদ, মাহবুব আলী, এনামুল হক টুকু, আনসার কমান্ডার আজিম উদ্দিন ও মমতাজুল ইসলাম। প্রতিরোধ যুদ্ধ ও পাকসেনাদের আগমন:- রংপুর ক্যান্টনমেন্ট থেকে যাতে পাকসেনারা গাইবান্ধায় আসতে না পারে সে জন্য আগে থেকেই গাইবান্ধায় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধারা ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের পলাশবাড়ী আংরার ব্রিজে এবং সাদুল্লাপুরের মীরপুরে অবস্থান নেন। ১৫ এপ্রিল রাতে হানাদার বাহিনী আংরার ব্রিজে পাহারারত বাঙ্গালি সৈনিকদের উপর হামলা চালায়। দীর্ঘ সময়ের তুমুল লড়াইয়ের পর আংরার ব্রিজের যুদ্ধে পাঞ্জাবী হানাদাররা পিছু হটে যায়। পরদিন ১৬ এপ্রিল গাইবান্ধায় খবর আসে হানাদার পাঞ্জাবী বাহিনীর একটি বহর রংপুর থেকে শঠিবাড়ী-বড়দরগা-মাদারগঞ্জ হয়ে গাইবান্ধা অভিমুখে এগুচ্ছে। এ খবর পেয়ে কিছু বীরযোদ্ধা নিয়ে সুবেদার আলতাফ রওয়ানা দেন মীরপুরে। ১৭ এপ্রিল ভোর রাতে ৫/৬টি মেশিনগান সংযোজিত গাড়ি থেকে পাঞ্জাবীরা নেমে গাইবান্ধা-রংপুর সীমান্তবর্তী নলেয়া নদীর ব্রিজের পশ্চিম পার্শ্বে মাদারগঞ্জে অবস্থান নেয়। গাড়িগুলো একটু সরে গিয়েই মেশিনগানের গুলি ছুুঁড়তে থাকে। সুবেদার আলতাফ ত্বরিত ফিরে এসে পাল্টা গুলিবর্ষণ শুরু করেন। সেনা সদস্যসহ মুক্তিপাগল প্রশিক্ষণার্থীরা শত্রু নিধনে একযোগে গুলি ছুঁড়তে থাকে। এ প্রতিরোধ যুদ্ধে ২১ জন পাঞ্জাবী নিহত ও নুরুল আমিন নামে একজন মুক্তিযোদ্ধা আহত হন। পরে ওই দিন সন্ধ্যায় ওই পথ ধরেই আবারো পাক হানাদার বাহিনী ভারি ও আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রসহ সাদুল্লাপুর হয়ে গাইবান্ধায় প্রবেশ করে। তারা শহরের স্টেডিয়ামে (বর্তমান শাহ আব্দুল হামিদ স্টেডিয়াম) ঘাঁটি করে। এ অবস্থায় মুিক্তযোদ্ধারা গাইবান্ধা শহর ত্যাগ করে যমুনা-বক্ষ্মপুত্রের চরে নিরাপদ স্থানে চলে যান। গাইবান্ধা শহর হানাদারদের আয়ত্তে আসে। মুক্তিসেনারা সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে দেশের মুক্তির জন্য পুনরায় প্রস্তুতি নিতে ভারতের মানকার চর ও তুরায় প্রশিক্ষণ নেয়।গাইবান্ধা জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কমান্ডার নাজমুল আরেফিন তারেক জানান, জেলায় মোট তালিকাভুক্ত মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ২ হাজার ১ শত ৬২ জন। এর মধ্যে সরকারি ভাতা পান প্রায় ১৫ শত মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে ৯১ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। তিনি আরো জানান, জমির অভাবে এখনও পর্যন্ত জেলায় মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ভবন নির্মাণ হয় নাই। জেলার ২৮ চিহ্নিত বধ্যভূমি ও গণকবরের মধ্যে কেবল মাত্র কাটাখালিতে সরকারিভাবে স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হচ্ছে।