গাইবান্ধার সাঁওতাল ও ওঁরাও সমপ্রদায়ের হালচাল

আপডেট : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ১৯:৪৬
গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর ও গোবিন্দগঞ্জ উপজেলায় এখনও কিছু আদিবাসী সাঁওতাল ও ওঁরাও সমপ্রদায়ের বসবাস আছে। তবে অশিক্ষা, কুসংস্কার, সীমাহীন দারিদ্র্য এবং কর্মসংস্থানের অভাবে ভূমিহীন এই আদিবাসীদের অস্তিত্ব এখন বিলুপ্তির পথে। হতদরিদ্র পরিবারগুলোর দিনকাল এখন আর ভাল নেই। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের পূর্বে শুধু গাইবান্ধায় নয়। উত্তরাঞ্চলের রংপুর, বগুড়া, রাজশাহী ও দিনাজপুর জেলার লাল মাটির বরেন্দ অঞ্চলে কৃষিজীবী ওঁরাও পরিবারের বসতি ছিল অনেক। মুক্তিযুদ্ধের সময় গাইবান্ধাসহ উত্তরাঞ্চলের বরেন্দ এলাকার অধিকাংশ সাঁওতাল, ওঁরাও ও বুনো পরিবার পার্শ্ববর্তী দেশে চলে গিয়ে নিজ আবাস ভূমিতে আর ফিরে আসেনি। এরপরেও যারা ছিল তারাও সংখ্যা স্বল্পতায় পারিবারিক ও সামাজিক জীবনাচরণে নানা বিঘ্ন সৃষ্টি হয় বলে ধীরে ধীরে পাড়ি দিয়েছে ভারতের নাগাল্যান্ড, ত্রিপুরা, আসামসহ অন্যান্য এলাকায়। ১৯৯১ সালের আদমশুমারি অনুসারে উত্তরাঞ্চলের বরেন্দ অঞ্চলে ওঁরাও পরিবার ছিল প্রায় ৬ হাজার। আর এখন তাদের খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। তবে এখনও গাইবান্ধা জেলার সাদুল্লাপুর ও গোবিন্দগঞ্জ উপজেলায় নানা প্রতিকূল অবস্থার মধ্যেও টিকে আছে প্রায় আড়াইশ’ ওঁরাও পরিবার। এছাড়া গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার বরেন্দ এলাকা কামদিয়া, রাজাহার, সাখাহার, সাপমারা, গুমানীগঞ্জ ইউনিয়নে ২শ’ ২০টি ওঁরাও পরিবার, সাড়ে ৫ হাজার সাঁওতাল এবং ২ হাজার ৩শ’ বুনো পরিবার তাদের আদি সংস্কৃতি আঁকড়ে বসবাস করছে। এদিকে সাদুল্লাপুর উপজেলার তরফকামাল গ্রামে বসবাস করে ৩০টি ওঁরাও পরিবার। ‘ওঁরাও’ নামের আদিবাসীরা আদি-অস্ট্রেলীয় জনগোষ্ঠীর উত্তর পুরুষ। এদের গায়ের রং কালো, নাক চ্যাপটা, চুল কালো ও কুঞ্চিত, উচ্চতা মাঝারি। উপমহাদেশে ওঁরাওদের প্রধান বসতি উড়িষ্যা, ছোট নাগপুর, রাজমহল ও বিহারের সন্নিহিত অঞ্চলে। নৃতত্ত্ববিদগণের মতে একই অঞ্চলের মুন্ডা, মালপাহাড়ি ও সাঁওতালদের সঙ্গে ওঁরাওদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। ভাষার দিক থেকেও এরা সবাই একই অস্ট্রিক পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। কারো কারো মতে কুরুথ ভাষার বিভাজিত একটি অংশের টোটেম রূপে ওঁরাও কথাটা এসেছে। এরা ঠিক কবে কি কারণে বাংলাদেশে এসে বসবাস শুরু করে সে সম্পর্কে সঠিক কোন তথ্য জানা যায়নি। ওঁরাও’রা হিন্দু সমপ্রদায়ের নানা দেবদেবী, প্রকৃতির বড় প্রাচীন গাছ, নদী এবং সূর্য পূজার প্রতি এদের ধর্ম বিশ্বাস থাকলেও এদের ধর্মীয় উত্সবগুলোতে কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে। বৈশাখ মাসে এরা বসুন্ধরা ব্রত উত্সব, ভাদ্র মাসে ভাদু উত্সব, অঘ্রাণে সেঁজুতি, ফাল্গুনে ইতু এবং চৈত্র মাসে ওঁরাও’রা বসন্ত উত্সব পালন করে থাকে। বর্ষাকালে কদম ফুল ফোটার মৌসুমে এরা কদম গাছ এবং পাতা, ডাল ও ফুল নিয়েও পূজা অর্চনা করে থাকে। এই পূজা পার্বনের মূল উদ্দেশ্য হলো জমি ও ফসলের উর্বরতা শক্তি ও উত্পাদন বৃদ্ধির জন্য ভগবানের কাছে প্রার্থনা। সাঁওতালদের দেহ কাঠামোর বৈশিষ্ট্যগত দিক থেকে বিশুদ্ধ প্রাক দ্রাবিড়ীয় গোষ্ঠীর প্রতিনিধি স্থানীয় মনে করা হয়। তবে অস্ট্রেলীয় কৌমগুলোর সাথে সাঁওতালদের বেশ মিল লক্ষ্য করা যায় বলে তাদেরকে অনেক সময় আদি অস্ট্রেলীয় বলা হয়। এদের নিজস্ব ভাষা অস্ট্রো-এশীয় ভাষা গ্রুপের অন্তর্গত। সাঁওতালদের মধ্যে অধিকাংশই খ্রিষ্টান ধর্মে ধর্মান্ত্রিত হলেও হিন্দু ধর্মে বিশ্বাসী কিছু কিছু সাঁওতাল পরিবার তাদের আদি সংস্কৃতি এবং ধর্মকে টিকিয়ে রেখেছে। এরা ভূত-প্রেতের উপাসনা করে। এদের দেবতার নাম বোঙা, যিনি পাহাড়ে থাকেন বলে এরা বিশ্বাস করে। আর এক দেবতা চান্দো। দেবতার ভোগের জন্য মুরগি ছানা উত্সর্গ করে থাকে। ঝুমুর গান সাঁওতাল সমাজে প্রচলিত আছে। বাড়িঘর বেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখে সাঁওতালরা। এদের মধ্যে পিতৃতান্ত্রিক পরিবার ব্যবস্থা প্রচলিত। এদের বিয়ে হয় অনেক ধুমধামে। বিয়েতে নাচ গান এবং ভাত পচিয়ে ওদের বাড়িতেই তৈরি করা ‘হাঁড়িয়া’ (চোলাই মদ) থাকতেই হবে। নারী-পুরুষ উভয়েই মদ খায়। এই মদ আর পাঁঠা বা শূকরের মাংসের সাথে মোটা চালের ভাতের ভোজ দিয়েই চলে বিয়ের বাড়ির আহার পর্ব। সাঁওতালদের মধ্যে স্ত্রী-পুরুষের এক সঙ্গে দুই স্ত্রী বা স্বামী রাখার বিধান নেই। এখনও এদের সমাজে প্রাচীন পঞ্চায়েত ব্যবস্থা চালু রয়েছে। এদের মধ্যে বিধবা বিয়ে এবং ঘরভাঙ্গা বিয়ে প্রচলিত আছে, তবে শিশু বিয়ের প্রচলন কম। বিয়েতে পাত্রের পিতা পাত্রীকে প্রকাশ্যে যৌতুক দেয়। তাছাড়া বড় ভাই মারা গেলে ছোট ভাই বিধবা ভাবীকে বিবাহ করার রেওয়াজ সাঁওতালদের মধ্যে আছে। এখনও মাঝে মাঝে এরা শিকার করতে বাড়ি ছেড়ে বের হয়। বুনোদের অনেকটা সাঁওতালদের বিয়ের অনুকরণে বিয়ে হয় ধুমধামে। আগে গারোদের মত বুনোরাও দেকাচোঙ ঘর এবং আখ্রা ঘরের মতো বিবাহযোগ্য তরুণ তরুণীরা বিয়ের আগে পরস্পরের সাথে মেলা মেশার সুযোগ পেতো। বড় গোলা ঘর, যাকে বলা হয় ধুমকুরিয়া। এই গোলাঘরে নির্দিষ্ট পর্বের দিনে একসঙ্গে একাধিক বিবাহযোগ্য নারী পুরুষ একত্রে বসে তাদের পছন্দ মতো পাত্র-পাত্রী নির্বাচন করতো। পরে পরিবারের লোকজনের সম্মতিতে বিয়ে হতো। এখন আর সে প্রথার প্রচলন বা সুযোগ নেই। এসব আদিবাসী সমপ্রদায়ের সামাজিক জীবন ও ধর্ম চর্চায় উজ্জ্বল রঙিন ফুলের কদর অনেক বেশি। বিশেষ করে লাল জবা ফুল তাদের পূজা পার্বনে এবং উত্সব পর্বে বেশি মাত্রায় ব্যবহূত হয়। এদের মেয়েরা রঙিন শাড়ি পরে চুলে রঙিন ফুল গুঁজে নাচে গানে উত্সব পালন করে থাকে। স্ত্রী-পরুষ উভয়েই সামাজিক রীতি হিসেবে শরীরে উল্কি আঁকে। এ জেলার ওঁরাও, সাঁওতাল এবং বুনো পরিবারগুলো মূলত: কৃষিজীবী। এরা অন্যের জমি বর্গা নিয়ে চাষাবাদ করে। এছাড়া কৃষি শ্রমিক এবং দিনমজুরি তাদের পেশা। পরিবারের নারী-পুরুষ দু’জনেই কর্মঠ এবং উভয়েই শ্রমজীবী পেশাকে আঁকড়েই জীবন জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। তবে পুরুষদের চেয়ে মেয়েরা বেশি পরিশ্রম করে এবং কৃষিকাজেও তারা অত্যন্ত দক্ষ। বেশি কাজ করেও নারী শ্রমিকরা পুরুষের চেয়ে কম মজুরি পায়। সংখ্যালঘু হওয়ার কারণে এবং নারী বলে বিচার পায় না। ওঁরাও জনগোষ্ঠী স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সরকারি ত্রাণ সহায়তা থেকে প্রতিনিয়তই বঞ্চিত। অথচ দেখার কেউ নেই। নানা প্রতিকূলতা দারিদ্র্য এবং বঞ্চনার শিকার হয়েও এ জেলায় আদিবাসীরা টিকে আছে। এখনও যে আদিবাসী সাঁওতাল, ওঁরাও এবং বুনোরা এ জেলায় আদি সংস্কৃতি এবং একান্ত নিজস্ব জীবনযাপন পদ্ধতিকে উপজীব্য করেই স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে অস্তিত্বকে ধারণ করে রেখেছে এটাও কম কথা নয়।