গাইবান্ধা অঞ্চলের লোকগান

আপডেট : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ১৯:৫১
একথা বলার অপেড়্গা রাখে না যে লোকসাহিত্যের অন্যান্য শাখার মতোই লোকগানের বিশেষ কোন সময় নেই, কোন সীমানা নেই। এক যুগ থেকে আর এক যুগে, এক অঞ্চল থেকে আর এক অঞ্চলে, এমনকি এক দেশ থেকে অন্য দেশে পাড়ি জমানোর মধ্যেই তার প্রমাণ মেলে। তবুও ভাষা বৈশিষ্ট্য, উচ্চারণের ঢং, ব্যতিক্রমী বর্ণনাভঙ্গি সর্বোপরি ঐতিহ্যিক স্বাতন্ত্র্য গাইবান্ধার লোকগানকে আলাদা বিশেষত্ব দান করেছে। একদিন গাইবান্ধার মানুষের ঘরে ঘরে গোলাভরা ধান ছিল, গলাভরা গান ছিল। সেসব এখন অতীতের বিষয়। বন্যায়, খরায়, দুর্ভিক্ষ আর নদী ভাঙনে গাইবান্ধার পলস্নী অঞ্চলের নিস্তরঙ্গ সুখী জীবন আজ বিপর্যস্ত। দুঃখ-দারিদ্র্য নিত্যদিনের সাথী। কামারজানীর আফিল গীদালের অনেকদিন আগে বাঁধা গান আজও গাইবান্ধার গাঁও গেরামের বাতাস ভারী করে তোলে: ওকি ওরে ইলিপের (রিলিফের) কাপোড়/কি জঞ্জাল বাজালু রে এত দুঃখকষ্টের মধ্যেও গাইবান্ধার মানুষ গান গায়। গান গায় ক্ষেতে খামারে। গান গায় পাটকাটা, নিড়ানি কিংবা গাতার কিষাণ দেয়ার সময়। দোতারার গীদাল অবসর সন্ধ্যায় আসর জমায়। বর্ষাকালে নৌকা বাইচের সারি গান অথবা মহররমের জারি এখনো কর্মক্লান্ত শ্রোতাদের মোহাবিষ্ট করে। এমন এক সময় ছিল মানুষ সারারাত জেগে শুনতো জাগের গান, যোগীর গান, মোনাই যাত্রা, ভাসান যাত্রা, ছোকরা নাচা বা মালশী গান। এই ইলেকট্রনিকের যুগে টিভি, রেডিও, ক্যাসেট, সিডি ইত্যাদির ব্যাপক প্রসারের ফলে সেসব এখন বিলুপ্ত প্রায়। সংগীতাঞ্চল হিসেবে গাইবান্ধা ভাওয়াইয়া প্রভাবিত। যদিও ‘গাড়ীয়াল ভাই’ অথবা ‘মৈষাল বন্ধু’ এ অঞ্চলের গান নয় তবুও গাইবান্ধার গানের মূলস্রোত ভাওয়াইয়ার। অবশ্য ‘উদাসনী’ বলে এক ধরনের দীর্ঘ সুরের বিরহের গান এ অঞ্চলের নিজস্ব বলে মনে হয়। এছাড়াও ভাটিয়ালী, মারফতী, মুর্শিদী, দেহতত্ত্ব ইত্যাদি গানের প্রভাবও অঞ্চল বিশেষে লক্ষ করা যায়। এতদঞ্চলের লোকসংগীতের লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে পুরুষের কণ্ঠে গাওয়া অধিকাংশ গানের বিষয় বঞ্চিত নারীত্বের অবদমিত কামনার বেদনাময় রূপ। যেমন:মনের হাউস (শখ) মনে রইলো দাদা/ছাগল চরা’তে- আবার ভাওয়াইয়ার দীর্ঘসুরে নারীর মনের গোপন ইচ্ছেটাও সহসাই প্রকাশ হয়ে পড়ে:ওকি ওরে ভাবের দ্যাওরা/তোকে দ্যাখোম মুঁই নিজের মানুষের মতো। সত্যি কথা বলতে কি এ সকল ভাওয়াইয়া গান শুধু গাইবান্ধার নয়, বৃহত্তর রংপুরের অধিকাংশ এলাকায় এর বিস্তৃতি। ব্রহ্মপুত্র-ঘাঘট-বাঙালি বিধৌত এই বিস্তীর্ণ অঞ্চলের বিশাল লোকসংগীতের ভান্ডার থেকে গুটিকয়েকের দৈহিক পরিচয় দেয়ার প্রয়াস পেলাম মাত্র। এগুলোর আসল পরিচয় আছে অশিক্ষিত অর্ধশিক্ষিত মানুষের কণ্ঠে। তাদের প্রাণ পাগল করা সুরের মাধুর্যে। কিন্তু সে পথ আমার জন্য দুরধিগম্য। শিক্ষক ও লেখক, গাইবান্ধা।