ফের সামরিক শাসনের কবলে মিসর!

আপডেট : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২২:২৬
আরব বসন্তের বিক্ষোভের মুখে ২০১১ সালে ক্ষমতাচ্যুত হন মিসরের তিন দশকের বেশি সময় ক্ষমতায় থাকা স্বৈরশাসক হোসনি মোবারক। কারাবন্দিও হন মোবারক। সাময়িক ক্ষমতা গ্রহণ করে দেশটি ক্ষমতাধর সেনাবাহিনী সমর্থিত অন্তর্বর্তী সরকার। তবে এ সরকারের সবকিছুর কেন্দ্রে ছিল মিসরের ক্ষমতাধর জেনারেলরা। তারা একটি অবাধ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তরের ঘোষণা দেয়। ঘোষণা অনুযায়ী অনুষ্ঠিত নির্বাচনে জয়ী হয়ে দেশটির ইসলামপন্থী দল মুসলিম ব্রাদারহুড ক্ষমতায় আসে। ঠিক এক বছরের মাথায় আবার জনবিক্ষোভের মুখে ব্রাদারহুড নেতা প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করে সেনাবাহিনী। বর্তমানে মুরসিও আটক রয়েছেন। তাকেও বিচারের মুখোমুখি করা হচ্ছে। সেনাবাহিনী সমর্থিত বর্তমান সরকার নতুন করে নির্বাচনের রোডম্যাপ আগেই ঘোষণা করেছে। যদিও মিসর এখন ক্ষমতার দ্বন্দ্বে বিভক্ত একটি দেশে পরিণত হয়েছে। আর সবচেয়ে ক্ষমতাধর হিসেবে পুরনো চেহারায় ফিরে এসেছেন জেনারেলরা। তবে নির্বাচন হলেও সর্বশেষ ক্ষমতায় থাকা মুসলিম ব্রাদারহুড অংশ নিতে পারবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। কারণ গত ২৩ সেপ্টেম্বর মুসলিম ব্রাদারহুডের সব কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। একই সঙ্গে দলটির সকল সম্পত্তিও বাজেয়াপ্তের নির্দেশ দিয়েছে দেশটির একটি আদালত। গত ৩ জুলাই প্রেসিডেন্ট মুরসিকে উত্খাতের পর থেকেই ব্রাদারহুডের নেতাকর্মীদের ওপর সেনা সমর্থিত সরকার কঠোর দমনাভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। যেমন আকস্মিকভাবে দলটি ক্ষমতায় এসেছিল, ঠিক তেমনিভাবেই তাদের উত্খাত করেছে দেশটির সেনাবাহিনী। মুরসিকে উত্খাতের পর থেকেই ব্রাদারহুডকে নিষিদ্ধ করা হতে পারে বলে জল্পনা-কল্পনা চলছিল। অবশেষে তাই হলো। নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি দলটির বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতাকেও আটক করা হয়েছে। তবে ব্রাদারহুড বলছে, তাদের অস্তিত্ব মিসরের মাটিতে সব সময়ই থাকবে। ব্রাদারহুড মিসরীয় সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্বাচিত দলটিকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে সেনা সমর্থিত সরকার যে নির্বাচন করুক না কেন তাতে গণতন্ত্রের বিকাশ হবে না। বরং দীর্ঘদিন ধরে যে বিভক্তি মিসরে বিরাজ করছে তা আরো বাড়বে। মিসরের ৮৫ বছরের পুরনো ইসলামী দলটিকে ১৯৫৪ সালেও নিষিদ্ধ করেছিল সেনা শাসকেরা। পরবর্তীতে এটি মুসলিম ব্রাদারহুড অ্যাসোসিয়েশন নাম নিয়ে একটি এনজিও হিসেবে নিবন্ধিত হয়। ব্রাদারহুডের ‘ফ্রিডম অ্যান্ড জাস্টিস পার্টি (এফজেপি)’ নামে বৈধ নিবন্ধিত রাজনৈতিক শাখাও রয়েছে তাদের। স্বৈরশাসক হোসনি মোবারকের বিরুদ্ধে ২০১১ সালে গণ-অভ্যুত্থান শুরুর পর এ শাখা প্রতিষ্ঠিত হয়। যার উপর ভর করে ক্ষমতায় এসেছিল ব্রাদারহুড। মোবারকের পর মুরসির পতন, আবার ক্ষমতায় সেনাবাহিনী। এ বিষয়ে মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ড. ওমর আশর বলেন, আরব বসন্ত দেশটিকে সাবেক প্রেসিডেন্ট নাসের ও তার আগের যুগে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। যেখানে সেনাবাহিনী ছিল ক্ষমতার কেন্দ্রে। ১৯৫২ সালের ১ আগস্ট মিসরের প্রসিদ্ধ ইতিহাসবিদ আবদ আল-রহমান আল রাফাই দেশটির অল-আখবার পত্রিকায় মিসরের সামরিক অভ্যুত্থানের নেতা মোহাম্মদ নাগুয়িব অপমানিত হওয়ার একটি উদাহরণ দিয়ে বলেছিলেন, সেনা কর্মকর্তারা শুধু শীর্ষ পদমর্যাদা চায়, ক্ষমতা নয়। কিন্তু তার বক্তব্য সময়োচিত ছিল না। ১৯৫৪ সালে দেশটির অতি বিনয়ী তরুণ ক্ষমতালোভী কর্নেল গামাল আব্দুল নাসের ক্ষমতা দখল করে প্রেসিডেন্ট হন। মিসর এখন আগের সেই বিভক্ত মিসর। দেশটির একটি অংশ চায় সংসদীয় গণতন্ত্র, সংবিধানের প্রত্যাবর্তন আর ব্যারেকে সেনাবাহিনীর অবস্থান। অন্য অংশ চায়, শক্তিশালী মিসর যেখানে রুটি রুজির নিশ্চয়তা থাকবে। ১৯৫৪ সালের নভেম্বরের পর থেকে দ্বিতীয় অংশটি সব সময় প্রথম অংশকে দাবিয়ে রেখেছে। শুধু তাই নয়, তাদের দাবিকে ধ্বংসও করেছে। ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারিতে মোবারকের পতনের পর মিসরের সুপ্রিম কাউন্সিল অব দ্য আর্ম ফোর্সেস (এসক্যাফ) এর তিনটি দাবি ছিল। এগুলো হলো রাজনীতিতে ভেটো দেয়ার ক্ষমতা, সেনাবাহিনীর আর্থিক খাতে স্বাধীনতা এবং দুর্নীতি ও নির্যাতনের যেসব অভিযোগ রয়েছে তা থেকে সেনা ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের অব্যাহতি দেয়া। এসব দাবি পূরণে তারা সাংবিধানিক নিশ্চয়তা চাইছিল। ২০১২ সালের জুনে সংবিধানে নতুন করে ধারা যুক্ত করার মাধ্যমে সেই দাবি পূরণের প্রতিফলন দেখা গিয়েছিল। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর মোহাম্মদ মুরসি ঐ বছরের আগস্টে সংবিধানের এই নতুন সংযোজন বাতিল করে। এছাড়া যেসব জেনারেলরা এ সংযোজন করেছিল তাদের অপসারণ করেন। আর এ ধরনের পদক্ষেপের মূল্য দিতে হয়েছে মুরসিকে। যে কারণে তিনি নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসলেও বেসামরিক সরকার ও সামরিক প্রশাসনের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য কখনোই আসেনি। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী একজন সেনা কর্মকর্তারা, ন্যাশনাল ডিফেন্স কাউন্সিলে (এনডিসি) বেশিরভাগই সেনা কর্মকর্তা। যারা জাতীয় নিরাপত্তাসহ স্পর্শকাতর পররাষ্ট্রনীতিতে প্রভাব খাটিয়েছে। অর্থাত্ নির্বাচিত সরকার সেনাবাহিনীর ক্ষমতার বলয় থেকে মুক্ত হতে পারেনি। এ অবস্থায় স্পষ্ট বলা যায়, মিসরের গণতন্ত্র নিশ্চিতভাবেই ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। যখন অতীতের ধরন অনুযায়ী নির্বাচিত সরকারকে সেনাবাহিনী উত্খাত করে তখন তার ফল গণতন্ত্রের জন্য সুখকর হতে পারে না। বরং বেসামরিকের মুখোশে সামরিক একনায়কতন্ত্র, সামরিক প্রভাব হলো গৃহযুদ্ধ, মানব সমাজের অস্থিরতার কারণ। নির্যাতন নিপীড়ন বন্ধ ছাড়া গণতান্ত্রিক ধারায় ফেরা সম্ভব হবে না। আর গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে প্রয়োজন সেনাবাহিনীসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপর নির্বাচিত বেসামরিক সরকারের অর্থপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ। যেটা গণতন্ত্রের ক্রান্তিকাল থেকে মিসরের উত্তরণের জন্য হবে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।