কারাগারেই কাটাতে হচ্ছে টেইলরকে

আপডেট : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২২:২৭
গত বৃহস্পতিবার হেগের যুদ্ধাপরাধ আদালতে আপিলের রায় দেয়া হয় লাইবেরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট চার্লস টেইলরের বিরুদ্ধে। এই রায়ের মাধ্যমে পুরো বিচার কার্যক্রমের সমাপ্তি হয় এবং টেইলরের বিরুদ্ধে ৫০ বছরের কারাদন্ডাদেশ বহাল থাকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী নুরেমবার্গ ট্রায়ালের পর আন্তর্জাতিক আদালতে এই প্রথম সাবেক কোন রাষ্ট্রপ্রধানের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধীর বিচার প্রক্রিয়া শেষ হলো। যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে গত বছর টেইলরকে ৫০ বছরের কারাদন্ডের আদেশ দেয়া হয়। তবে রায়ে সন্তুষ্ট হয়নি কেউই। প্রসিকিউশন ও আসামি উভয় পক্ষই এর বিরুদ্ধে আদালতে আপিল করেন। আসামি পক্ষের দাবি, ন্যায্য বিচার পাননি টেইলর। তার পক্ষে-বিপক্ষে আনা তথ্য-প্রমাণাদির সঠিক মূল্যায়ন করেনি আদালতের চেম্বার। এমনকি পুরো প্রক্রিয়ায় আইনের সঠিক প্রয়োগ হয়নি বলেও মনে করে আসামি পক্ষ। রায় পুনর্বিবেনার আবেদন জানিয়ে তাই আপিল করে তারা। অপরদিকে টেইলরের ৮০ বছরের কারাদন্ডাদেশ চেয়ে আপিল করে প্রসিকিউশন। তারা ফাঁসির দন্ড চাইতে পারেনি। কারণ সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক আইনে ফাঁসি দেয়ার কোন বিধান নেই। ২০০৬ সালের নভেম্বরে গঠিত ঐ আন্তর্জাতিক বিশেষ আদালতে লাইবেরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট চার্লস টেইলরের বিরুদ্ধে ১১টি অভিযোগে চার্জ গঠন করা হয়। প্রধান অভিযোগ, প্রতিবেশী দেশ সিয়েরা লিয়নের গৃহযুদ্ধে বিদ্রোহীদের সাহায্য, সহায়তা ও উত্সাহ দেয়া। টেইলরের মদদ পেয়েই বিদ্রোহীরা সিয়েরা লিয়নে নানা ধরনের সন্ত্রাসী ও মানবতা বিরোধী অপরাধ কর্মকান্ড চালায়। এর মধ্যে রয়েছে হত্যা, ধর্ষণ, নারীদের যৌনদাসে পরিণত করা, লুণ্ঠন এবং ১৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের যুদ্ধদলে ভেড়ানো। স্বাভাবিকভাবেই সব অপকর্মের দায়ভার গিয়ে পড়ে টেইলরের কাঁধে। চার্লস টেইলর লাইবেরিয়ার ক্ষমতায় আসেন ১৯৯৭ সালে দেশটির প্রথম গৃহযুদ্ধের মাধ্যমে। আর ক্ষমতা থেকে উত্খাত হন ২০০৩ সালে দ্বিতীয় গৃহযুদ্ধে। ক্ষমতা গ্রহণের আগে টেইলর ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ফেরারি আসামি। ক্ষমতা গ্রহণের পর পার্শ্ববর্তী সিয়েরা লিয়নের অস্থিরতাকে একটি সুযোগ হিসেবে নেন তিনি। ১৯৯১ সাল থেকেই ঐ দেশে চলছিলো গৃহযুদ্ধ। অভিযোগ রয়েছে, সিয়েরা লিয়নের রিভল্যুশনারি ইউনাইটেড ফ্রন্টের (আরইউএফ) বিদ্রোহীদের মদদ দিয়ে যাচ্ছিলেন টেইলর। সিয়েরা লিয়নের ছিলো ডায়মন্ডের খনি। লাইবেরিয়ার উপর জাতিসংঘের অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্বেও টেইলর কালোবাজার থেকে অস্ত্র সংগ্রহ করে তা বিদ্রোহীদের সরবরাহ করতেন। একই সাথে আরইউএফ সদস্যদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও করতেন তিনি। এ সবের বিনিময়ে বিদ্রোহীদের কাছ থেকে ডায়মন্ড সংগ্রহ করতেন টেইলর। ঐতিহাসিক ব্যাখ্যায় যাকে বলা হচ্ছে ‘ব্লাড ডায়মন্ড’। ক্ষমতায় থাকাকালেই মানবতাবিরোধী অপরাধের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে অভিযুক্ত হন টেইলর। সিয়েরা লিয়নে জাতিসংঘের একটি আদালত তার বিরুদ্ধে এই অভিযোগ আনে। ২০০১ সালে জাতিসংঘ লাইবেরিয়ার ডায়মন্ড বিক্রির উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। অস্থিতিশীল হতে শুরু করে খোদ লাইবেরিয়া। এ অবস্থায় ২০০৩ সালে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন টেইলর। আশ্রয় নেন নাইজেরিয়ায়। ইন্টারপোল গ্রেফতারি পরোয়ানা করলে স্ত্রীকে নিয়ে পালানোর চেষ্টা করেন তিনি। কিন্তু উত্তর নাইজেরিয়ার সীমান্ত এলাকা থেকে টেইলরকে গ্রেফতার করে সীমান্ত রক্ষী বাহিনী। টেইলরের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত রায় পড়ে শোনান বিচারক বেঞ্চের প্রধান বিচারক রিচার্ড লুসিক। সিয়েরা লিয়নের বিদ্রোহীদের অপকর্মের প্রতি সমর্থন যোগানোর জন্য টেইলরকে দায়ি করে তিনি বলেন, টেইলরের মদদে মানব ইতিহাসের নৃশংস ও বর্বরতম অপরাধ সংঘটিত হয়েছে সিয়েরা লিয়নে। বিচারপতি লুসিক জানান, টেইলরের বিরুদ্ধে এক নারী সাক্ষ্য দিয়েছেন যে, বিদ্রোহীরা তাকে মাথা ভর্তি একটি ব্যাগ বয়ে নিয়ে আসতে বাধ্য করে, যেখান থেকে চুয়ে চুয়ে রক্ত ঝরছিলো। এরপর তাকে হাসিমুখে ব্যাগ খোলার নির্দেশ দেয়া হয়। কিন্তু ব্যাগ খুলে ঐ নারী দেখতে পান নিজের সন্তানদের কাটা মাথা। বিচারপতি তার রায়ে আরেক সাক্ষীর জবানবন্দির কথা উল্লেখ করেন। এই সাক্ষী সাবেক শিশু সৈন্য, যাকে মাত্র ১২ বছর বয়সে বিদ্রোহীদের দলে ভেড়ানো হয়েছিলো। বিদ্রোহী নেতারা তাকে নির্দেশ দিয়েছিলো খামার বাড়িতে একজন বয়স্ক নারীকে ধর্ষণ করতে। ঐ নির্দেশ মানতে অস্বীকার করায় তাকে শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়। চূড়ান্ত রায়ে প্রসিকিউশন ও আসামি দু’পক্ষের আপিল আবেদনই নাকচ করে দেয় বিশেষ আদালত। রায়ে বলা হয়েছে, পূর্ববর্তী রায়ই যথার্থ ও ন্যায়সঙ্গত। টেইলরের শাস্তির মেয়াদ ৮০ বছরে উন্নীত করতে প্রসিকিউশনের আপিলকেও অতিরঞ্জিত বলে ব্যাখ্যা করা হয়। বলা হয়, বিদ্রোহী দলে টেইলরের সরাসরি কর্তৃত্ব আরোপের কোন প্রমাণ দিতে পারেনি প্রসিকিউশন। তাই ৫০ বছরের সাজাই যথোপযুক্ত। এদিকে, চূড়ান্ত রায়ের পরও টেইলর নিজেকে যুদ্ধাপরাধী বলতে নারাজ। তার দাবি, তিনি নির্দোষ, কিন্তু বিচারের বলি। কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর জন্য মার্কিন প্রশাসনকে দায়ি করে টেইলর বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রই তার বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনকে লাখ লাখ ডলার দিচ্ছে এবং সাক্ষীদেরও একই ভাবে সাজিয়েছে। এর আগে গতবছর বিচারের শুনানি চলাকালে টেইলর তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছিলেন, ‘যুদ্ধ পরিস্থিতি আদালতে যেভাবে স্থাপন করা হয়েছে, বাস্তবে তা ছিলো ভিন্ন প্রকৃতির। যেমন- সিয়েরা লিয়নে আমি শান্তি প্রক্রিয়ার জন্য জোর প্রচেষ্টা চালাই। যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানাই। অথচ আদালতে উপস্থাপিত বক্তব্য তার সম্পূর্ণ বিপরীত’। সিয়েরা লিয়নে মানবতাবিরোধী অপরাধের পেছনে বড় ভূমিকা পালনকারীদের বিচারের আওতায় আনতে জাতিসংঘ ও সিয়েরা লিয়ন সরকার যৌথভাবে গঠন করে বিশেষ আদালত। পরে আদালত সিয়েরা লিয়ন থেকে নেদারল্যান্ডের হেগে স্থানান্তরিত করা হয়। কারণ গৃহযুদ্ধ নিয়ে সিয়েরা লিয়নের মানুষের মধ্যে এখনও গভীর আবেগ কাজ করছে। আর আবারো অস্থিতিশীল হবার আশঙ্কায় সাবেক প্রেসিডেন্ট চার্লস টেইলরকে ৫০টি বছর কারাভোগ করতে হবে ব্রিটেনের কারাগারে।