১৫ বছরে চ্যানেল আই

প্রতিষ্ঠা বছরের তরুণ দর্শকটি যে আজ যুবকে পরিণত হয়েছে...

আপডেট : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২০:১৮
১৫ বছরে পদার্পণ করল চ্যানেল আই। সবকিছুকে উত্সবমুখর করে তোলা এবং একই সাথে ‘মেলা’ নামের কর্পোরেট ব্র্যান্ডিংয়ে নতুন এক কনসেপ্ট তুলে ধরেছে যে চ্যানেলটি তার নাম ‘চ্যানেল আই’। ধীরে ধীরে দর্শকদের ভালোবাসাতেই সিদ্ধেশ্বরীর ছোট্ট স্টুডিও থেকে যাত্রা শুরু করে আজ তেজগাঁওয়ে নিজস্ব ভবনে বিশাল স্টুডিওতে অনন্য কার্যালয়ে বর্তমান। এর সবই সাফল্যের অংকেরই ফল। চ্যানেল আইয়ের অনুষ্ঠান নিয়ে হাজারটা সমালোচনা হয়তো করাই যায়। তবে প্রকৃত অর্থে শিল্পীদের সাথে একেবারে পারিবারিক থাকার অন্যতম নিদর্শন দেখিয়েছে এই চ্যানেলটি। কবি, সাহিত্যিক, অভিনেতা কিংবা সংগীতশিল্পী যেকোনো বিপদসঙ্কুল সময়ে সব সময় পাশে দাঁড়িয়ে চ্যানেল আই। সর্বশেষ চলচ্চিত্রের নবাব আনোয়ার হোসেন থেকে শুরু করে দুস্থ অভিনেতা সাত্তার কিংবা বাউল আব্দুর রহমান বয়াতি সবখানেই চ্যানেল আই সবার আগে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে কিংবা পাশে দাঁড়িয়েছে সব সময়। এইসব জনহিতকর কাজে নিজেদের এগিয়ে রেখেছে তারা কয়েকধাপ সামনে। চ্যানেলের আভ্যন্তরীণ পরিবেশ যেমন ঘরোয়া তেমনি পুরো চ্যানেলের অনুষ্ঠান আঙ্গিকেও দর্শকদের সাথে রেখে পথ চলার বিষয়টি প্রশংসনীয়। হয়তো চ্যানেলের নিয়ন্ত্রণ কর্তা ফরিদুর রেজা সাগর নিজেও সাহিত্য ও শিল্পকর্মের সাথে সম্পৃক্ত বলেই হয়তো তা সম্ভব হয়েছে। এ ছাড়া বার্তা সম্পাদক শাইখ সিরাজ তার ‘হূদয়ে মাটি ও মানুষ’ নিয়ে নিরন্তর কৃষকদের প্লাটফর্ম তৈরি করে চলেছেন। যদিও বিটিভিতে রেজাউল করিম নামের একজন ‘মাটি ও মানুষ’-এর প্রতিষ্ঠাতা। প্রতিষ্ঠাতাকে হয়তো ভোলানোর চেষ্টা হলেও কিংবা এক্ষেত্রে এক সূক্ষ্ম দ্বন্দ্ব বা সমালোচনার সুযোগ থাকলেও মূলত শাইখ সিরাজ তার একান্ত পরিশ্রমে অনুষ্ঠানটি যে পর্যায়ে নিয়ে গেছেন তা প্রশংসার দাবি রাখে। তাই ‘মাটি ও মানুষ’-এর কৃতিত্বের ধারক শাইখ সিরাজ একা দাবি করলে আজ অত্যুক্তি হয় না। এ ছাড়াও একাধিক সমালোচনার জায়গায় যেন প্রশংসাসূচক বিষয়ই চলে আসবে। আছে মুদ্রার উল্টোপিঠের গল্পও। প্রথমত, যেকোনো বিষয় নিয়ে একাধিক মেলার আয়োজন, ‘মেলা’ শব্দের মূল আকর্ষণ ব্যাহত করছে কি না তা চ্যানেল কর্তৃপক্ষের ভেবে দেখা উচিত। এ ছাড়া চ্যানেল আই তাদের নিজস্ব ইভেন্ট কার্যক্রমে যতটা সফল ঠিক ততটাই ব্যর্থ তাদের নাটক বা ধারাবাহিক সেলেব টক শোর ক্ষেত্রে। সফলতার ক্ষেত্রে এ বছর থেকে তাদের লাক্স সুন্দরী প্রতিযোগিতার কোনো মডেল টিভিসি করার সুযোগ পেল। নয়তো পাক্ষিক আনন্দবিচিত্রা থেকে লাক্স রিয়েলিটি চ্যানেল আইতে সরে আসার পর থেকেই এ দেশে ঐশ্বরিয়া, ক্যাটরিনার অবাধ বিলবোর্ডে যাতায়াত বেড়ে যায়। সেদিক থেকে তারা এ বছর ইতিবাচক পথে হাঁটতে শুরু করেছেন মেহজাবিনের উদাহরণে। এ ছাড়া সিটিসেল-চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ড আজ এ দেশের গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ড হিসেবে স্বীকৃত সকল মিউজিশিয়ানের কাছে। এই সাফল্য কৃতিত্ব আয়োজক পক্ষ পেতেই পারেন। তবে দাগ কেটে যাওয়া নাটকগুলো যেন অন্য চ্যানেলেই প্রচার হয় বেশি। চ্যানেল আই তাদের নাটকের প্রিভিউ থেকে যতদিন কিছু ব্রোকারদের দখলদারি না কমাবে ততদিন হয়তো এভাবেই নাটকের অবক্ষয় দেখতে হবে তাদের পর্দায়! এ ছাড়া ‘তারকাকথন’, মতিউর রহমান চৌধুরীর ‘আজকের সংবাদপত্র’ বা জিল্লুর রহমানের ‘তৃতীয় মাত্রা’ থেকে শুরু করে একাধিক অনুষ্ঠান চ্যানেল আই জন্ম দিয়েছে যা পরবর্তীতে অন্যরা অনুকরণ করে হয়তো আঙ্গিকটা আরও খাকিটা বদলে দিয়ে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে। কিন্তু সনাতনী পদ্ধতিতে চ্যানেল আই থেকে যেন সেই খোলস বদলাতে পারেনি। এ বছর থেকে তারা নাকি আঙ্গিক বদলানোর শপথ নিয়েছেন। আর ১৫ বছরে আজ যে দর্শক তরুণ থেকে যুবকে পরিণত হয়েছে। তাই তার ম্যাচিউরিটির কথা চিন্তা করেও নিজেদের অনুষ্ঠানের আঙ্গিক বদলানো উচিত। এর বাইরে তরুণদের নিয়ে কর্পোরেট রিয়েলিটি শো অতি সম্প্রতি তারা শুরু করলেও সেই অর্থে তরুণদের রক মিউজিক বা লাইভ গান বা অন্য কোনো আঙ্গিকের অনুষ্ঠানেরও যেন কিছুটা অভাব রয়েছে। চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে আলোচনা ও সমালোচনা দুটিরই দাবি রাখে ইমপ্রেস চলচ্চিত্র। কারণ চলচ্চিত্রের এই ক্রান্তিকাল থেকে শুরু করে সুস্থ ধারার চলচ্চিত্র নিয়মিত তৈরি ও পরিবেশন করে যে ধারা অব্যাহত রেখেছে তাতে চলচ্চিত্র জগত্ যেমন সমৃদ্ধ হয়েছে ঠিক তেমনি একাধিক প্রথিতযশা চলচ্চিত্রকার তাদের চলচ্চিত্র নির্মাণের স্বপ্ন থেকে বিচ্যুত হননি। এই বিষয়টি যেমন অনেক প্রশংসার দাবি রাখে একই সাথে ‘বুটিক সিনেমা’র নামের এ বছর অল্প বাজেটে ভাষা বিকৃতকারীদের হাতে কিছু চলচ্চিত্রের সুযোগ করে দেওয়াটা যেন পরস্পরবিরোধী বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। একাধিক চলচ্চিত্র বোদ্ধাদের কাছে তাই তাদের এই বুটিক কনসেপ্ট হাজার সাফল্যের সাথে কিছুটা হলেও নিন্দায় ভোগাবে। চ্যানেল আই তাদের ‘মনের মানুষ’ বা ‘ঘেটু পুত্র কমলা’ থেকে শুরু করে ক্লাসিক ধারার চলচ্চিত্রের পাশাপাশি বড় বাজেটের সত্যিকার অর্থেই জনমানুষের চলচ্চিত্র নির্মাণে এগিয়ে আসবে তারা সেই প্রত্যাশা রাখাই যায়। যেন চলচ্চিত্র রিলিজের পর মাত্র দু-তিনটে হলে শুধু নয়, কিংবা কদিন বাদেই কর্পোরেট মোড়কে নিজেদের টিভি পর্দায় ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার নয়, সত্যিকার অর্থেই মূল ধারার চলচ্চিত্রের সাথে সম্পৃক্ত হোক চ্যানেল আই। তবে গানের ক্ষেত্রে অনন্য ভূমিকায় বর্তমান চ্যানেল আই। বিশেষ করে বিশিষ্ট শিশু সাহিত্যিক আমীরুল ইসলামের প্রযোজনায় ‘গানে গানে সকাল শুরু’র কনসেপ্টটা তারা মিউজিকের ‘আজ সকালের আমন্ত্রণে’ থেকে কপি পেস্ট হলেও তারা মিউজিকের গরিবী সেটের জায়গায় চ্যানেল আই তাদের নিজস্ব মিউজিশিয়ান আর নান্দনিক সেট ও উপস্থাপনা দিয়ে অনন্য এক ধারাবাহিক অনুষ্ঠান শুরু করেছে। যা মূল ধারার শিল্পী এবং মূল ধারার গানকে সমৃদ্ধ করার অন্যতম এক আন্দোলনের নামে পরিণত আজ। এর পাশাপাশি বলতেই হয় চ্যানেল আই সারা বছরজুড়ে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক উত্সবগুলোকে যেভাবে প্রমোট করে নিজ উদ্যোগে তাতে হয়তো সারাদেশের অগণিত সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর নতুনভাবে বেঁচে থাকার শক্তি পায়। এরপরও ১৫ বছরের পথ চলায় অনেক সমালোচনা বা ভুলে মাড়ানো আঁকাবাকা পথের চেয়ে হয়তো সাফল্যের সমীকরণই বেশি। আজ চ্যানেল আইয়ের জন্মদিনে বিনোদন প্রতিদিন-এর পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা।