প্রকল্প গ্রহণের অর্ধশতাধিক বছর পর শেষ পর্যন্ত ঈশ্বরদীবাসীর বহু প্রত্যাশিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুত্ কেন্দ নির্মাণ কাজ শুরু হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজ ২ অক্টোবর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে সূচনা করবেন দেশের প্রথম পারমাণবিক এবং বিশ্বের সর্বাধুনিক নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্টের নির্মাণ কাজ।
পূর্বকথা ঃ সুদীর্ঘ ৫২ বছর আগে ১৯৬১ সালে পাকিস্তান শাসনামলে এই প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। পাবনা জেলার ঈশ্বরদী উপজেলার পাকশীতে পদ্মানদীর তীরে হার্ডিঞ্জ ব্রীজের ১ কিঃমিঃ পূর্ব-দক্ষিণ কোণে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুত্ কেন্দ স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এই প্রকল্পের জন্য ২৫৯ দশমিক ৯০ একর জমি হুকুম দখল করা হয়। এসময় রূপপুর ও চর রূপপুর মৌজার ৪০৪টি পরিবারকে ৩৬ লাখ ৩৮ হাজার ৮৬৩ টাকা ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়। প্রকল্প এলাকা থেকে প্রায় ২ কিঃমিঃ উত্তরে আবাসিক এলাকা নির্মাণের জন্য আরও ৩১ দশমিক ৫৫ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। এজন্য ১৩৮টি পরিবারকে ক্ষতিপূরণ বাবদ ১ লাখ ১৬ হাজার টাকা করে দেয়া হয়। পরে চর রূপপুর এলাকায় ২ লাখ ৭১ হাজার ৭৮২ টাকায় ৮৮ দশমিক ৪৫ একর জমি ক্রয় করা হয় পুনর্বাসনের জন্য। প্রকল্পের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য ওই সময় ৩৫ লাখ টাকা ব্যয়ে সাহাপুরে ৪০টি গ্রেড-থ্রি, ১২টি গ্রেড-ফোর ও ২০টি গ্রেড-ফিফথসহ ৭২টি আবাসিক কোয়ার্টার নির্মাণ করা হয়। একই সাথে অফিস ভবন, অতিথি ভবন ও সম্মেলন কক্ষও নির্মাণ করা হয়। বর্তমানে ৭২টি আবাসিকের মধ্যে ৭টি কর্মচারীরা ব্যবহার করছেন । অবশিষ্ট ৬৫টি কোয়াটারের অবস্থা জরাজীর্ণ। দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত থাকায় ঝোপ-জঙ্গলে ভরে গেছে কোয়াটারগুলো। প্রকল্পের প্রশাসনিক কর্মকর্তা, নিরাপত্তাকর্মী ও অন্যান্য কর্মচারীসহ ১৭ জন বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন।সূত্র মতে, ১৯৬১ সালে প্রকল্পটি শুরুর উদ্যোগ নেয়া হলেও আন্তর্জাতিক নানা জটিলতায় চালু করা সম্ভব হয়নি। ১৯৬৩ সালে ৭০ মেগাওয়াট পারমাণবিক চুিল্ল স্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়। ১৯৬৪ সালে কানাডা সরকারের সাথে চুক্তি বিষয়ে আলোচনা হয়। ১৯৬৬ সালে কানাডা, সুইডেন ও নরওয়ের সাথে আলোচনা হয় ১৪০ মেগাওয়াট পারমাণবিক চুিল্ল স্থাপনের। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭৩ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু সরকার ২০০ মেগাওয়াট চুল্লি স্থাপনের জন্য রাশিয়ার সাথে আলোচনা করেন। ১৯৭৫ এর ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধু স্বপরিবারে নিহত হওয়ার পর এই প্রকল্প হিমাগারে চলে যায়। ১৯৭৯ সালে ৩০০ মেগাওয়াট উন্নীত করতে ফ্রান্স, ব্রিটেন ও কানাডার সাথে শুধু আলোচনা হয়। ১৯৮১ সালে ব্রিটেন ১৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৩০০ মেগাওয়াট পারমাণবিক চুল্লি স্থাপনের জন্য প্রকল্প দাখিল করেন। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে তাও বাতিল হয়ে যায়।
১৯৯৬ সালে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা ক্ষমতাসীন হওয়ার পর দেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুত্ চাহিদার কথা মাথায় রেখে ঈশ্বরদীর রূপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুত্ কেন্দ প্রকল্প বাস্তবায়নে তত্কালীন বিশিষ্ট পরমাণু বিজ্ঞানী ও বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ড. এম, এ, ওয়াজেদ মিয়া আবার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। জাতীয় জ্বালানি নীতি ১৯৯৬ এ রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুত্ প্রকল্প বাস্তবায়নে সুপারিশ করা হয়। ১৯৯৭ সালে ১৬ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিপরিষদের সভায় ঈশ্বরদী রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্প বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। সরকার পরিবর্তনের পর আবারো রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুত্ কেন্দ প্রকল্প আবার হিমাগারে চলে যায়।
২০০৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে আওয়ামী লীগ রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুত্ কেন্দ প্রকল্প বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করা হয়। শেখ হাসিনা সরকার গঠনের পর ২০০৯ সালের ২১ মে ফ্রেম ওয়ার্ক চুক্তিতে আবদ্ধ হয়। শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক আণবিক সংস্থার তত্ত্বাবধানে রাশিয়ার সহযোগিতায় বাংলাদেশে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়। ২০১১ সালের ২ নভেম্বর রাশিয়ায় পারমাণবিক জ্বালানি সংস্থা রোসাটমের প্রকল্প বাস্তবায়নে সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এ সময় বাংলাদেশের পক্ষে বিজ্ঞান ও তথ্য যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রী ড. ইয়াফেস ওসমান এবং রাশিয়ান ফেডারেশনের পক্ষে এ্যাটোমিক এনার্জি কর্পোরেশনের ডিজি সাগেই ভি কিরিয়েনাকো চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। চুক্তি স্বাক্ষরের সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উপস্থিত ছিলেন। রাশিয়ার পক্ষ হতে এসময় বলা হয়, নির্মাণ কাজ শুরুর পাঁচ বছরের মধ্যে কেন্দ থেকে বিদ্যুত্ পাওয়া যাবে। এ চুক্তির আওতায় ১ হাজার মেগাওয়াট সম্পন্ন দুটি ইউনিট নির্মাণ করা হবে। এর অবকাঠামো উন্নয়নে রাশিয়া সহযোগিতা করবে। চুক্তি মোতাবেক তেজস্ক্রীয় বর্জ্য রাশিয়া ফেরত নিয়ে যাবে। প্রকল্পের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ রাশিয়া প্রদান করবে। চুক্তির শর্তাবলী বাস্তবায়নে রাশিয়ান ফেডারেশনের পক্ষে দি স্টেট এ্যাটোমিক এনার্জি কর্পোরেশন এবং বাংলাদেশ সরকারের বিজ্ঞান ও তথ্য যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সার্বিক দায়িত্ব পালন করবে। এছাড়া রাশিয়ান ফেডারেশনের পক্ষে জয়েন্ট স্টক কোম্পানি ‘এটোমন্ট্রয়েক্সপার্ট’ কন্ট্রাক্টর হিসেবে এবং বাংলাদেশের পক্ষে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন কাস্টমার হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে। রিএ্যাক্টর স্থাপনের পূর্ব পর্যন্ত প্রথম ধাপে প্রকল্পের ব্যয় ৫,২০০ কোটি টাকা ধরা হয়েছে। এর ৯০ ভাগ রাশিয়ার ঋণ সহযোগিতা এবং বাকি ১০ ভাগ স্থানীয় সম্পদ হতে সরবরাহ করা হবে। ২ এপ্রিল একনেক-এর সভায় অনুমোদন দেয়ার পর ইতিমধ্যেই রাশিয়া ৪,০০০ কোটি টাকা প্রদান করেছে। প্রকল্পের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ, সম্ভাব্যতা যাচাই, পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন, মানব সম্পদ উন্নয়ন, বিনিয়োগ মূল্যায়ন, তথ্যকেন্দ প্রতিষ্ঠা এবং অবকাঠামোগত কাজে এই অর্থ ব্যয় হবে। তবে এই প্রকল্প সম্পন্ন করতে ১.৫ থেকে ২ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়েছে। বিজ্ঞান ও তথ্য যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রী ড. ইয়াফেস ওসমান ইত্তেফাককে জানান, বাংলাদেশে যে পাওয়ার প্লান্ট স্থাপন করা হচ্ছে তা বিশ্বের সর্বাধুনিক এবং এটি থার্ড প্লাস জেনারেশনের বলে তিনি দাবি করেন। দুটি ধাপে ২০০০+২০০০=৪০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদনের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে প্রকল্পের কাজ শুরু হচ্ছে। আশা করা হচ্ছে, প্রথম ধাপে ২০১৭ সালে ১ হাজার মেগাওয়াট এবং ২য় ধাপে ২০২২ সালে আরও ১ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুত্ জাতীয় গ্রীডে সরবরাহ করা সম্ভব হবে। এই প্রকল্প ২০৩০ সালের মধ্যে ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুত্ সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে।
