মহান মুক্তিযুদ্ধে পদ্মা-যমুনা পাড়ের তেজোদীপ্ত ভূমিকা

আপডেট : ০১ অক্টোবর ২০১৩, ১৯:২৪
বাঙালীর হাজার বছরের ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল ও মহিমান্বিত ঘটনা ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ। এই যুদ্ধের মাধ্যমেই বাঙালী জাতি পেয়েছে লাল-সবুজের পতাকা ও স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। এর পেছনে রয়েছে বহু বছরের সংগ্রাম আর অগণিত মানুষের ত্যাগ তিতিক্ষা ও প্রাণ বিসর্জনের ইতিহাস। সেই ত্যাগ তিতিক্ষা ও মহাযজ্ঞে পদ্মা-যমুনার পানি ছঁয়ে যাওয়া জনপদ পাবনাবাসীর রয়েছে তেজোদীপ্ত অংশগ্রহণ। ইতিহাসের পরতে পরতে লেপ্টে আছে পাবনার মানুষের রক্তের দাগ। কৃষক বিদ্রোহ, নীল বিদ্রোহ, স্বদেশী আন্দোলন, খেলাফত আন্দোলন, অসহযোগ আন্দোলন, সলঙ্গা বিদ্রোহ, ভূট্টা আন্দোলন, ৬৯ এর গণঅভ্যূথানসহ সকল আনোদালন সংগ্রাম সর্বপরি একাত্তুরের মহান মুক্তিযুদ্ধে পাবনাবাসীর রয়েছে অসামান্য অবদান। পাবনার মানুষ বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামে অংশগ্রহণের মাধ্যমে অর্জন করেছে স্বপ্নের স্বাধীনতা ও স্বাধীন বাংলাদেশ। মহান মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে পাকিস্তানী বাহিনী অপারেশন সার্চ লাইটের নামে ২৫ মার্চ রাতে নিরস্ত্র বাঙালীর উপরসর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। অপারেশন সার্চ লাইটের কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ ভোররাতে রাজশাহী থেকে পাঞ্জাব রেজিমেন্টের এক কোম্পানি পদাতিক সৈন্য পাবনায় এসে পৌঁছে। তারা অবস্থান নেয় বিসিক এলাকায়। এ কোম্পানির কমান্ডার ছিলেন ক্যাপ্টেন আজগর ও ডেপুটি কমান্ডার ছিল লেফট্যানেন্ট রশিদ। পাবনায় কোন বাঙালী আর্মি বা ইপিআর ছিল না। ফলে তারা সাধারণ মানুষের উপর হামলা চালায়। কারফিউ জারি করে গোটা শহরে। পাক বাহিনী শহরের আব্দুস শুকুরের জানাযায় গুলি চালিয়ে মানুষ হত্যা করে। পাকবাহিনীর হাতে শহীদ হন এ্যাড. আমিন উদ্দিন, ডা. অমলেন্দু দাক্ষী,সাঈদ তালুকদার,রাজেমসহ অনেকে। চলতে থাকে পাকবাহিনীর নির্যাতন নিপীড়ন। পাক বাহিনীর নেতৃত্বে গঠিত হয় রাজাকার ও আলবদর বাহিনী। গঠিত হয় শান্ত্মি বাহিনী। দেশের সার্বিক ঘটনা প্রবাহের ধারাবাহিকতায় পাবনাতে স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরম্ন হয়। ২৩ মার্চ পাবনাতে ব্যাপক মহড়া, গণমিছিল ও বিশাল জমায়েত অনুষ্ঠিত হয়। পাবনার মুক্তিকামী মানুষ ২৭ মার্চ পুলিশ লাইন যুদ্ধ, ২৮ মার্চ ইপিসিক শিল্পনগরীর যুদ্ধ, ২৯ মার্চ মাধপুর যুদ্ধে পাকবাহিনীর অপারেশন সার্চ লাইট ব্যর্থ করে দেন। পাক আর্মিদের বিরম্নদ্ধে পাবনাবাসী ব্যাপক প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। ২৯ মার্চ পাক বাহিনীর সব সদস্য নিহত হয়। ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল পুনরায় পাবনা শহরের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে পাকবাহিনী। পর্যায়ক্রমে পাকবাহিনী জেলার বিভিন্ন থানা, গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে। তাদের এদেশীয় দোসররা পাক বাহিনীকে ব্যাপক সহায়তা করে। মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস তারা ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালায়, লুটপাট করে, সম্ভ্রমহানী ঘটায়। জেলার বিসিক শিল্প নগরী, নুরপুর, এডওয়ার্ড কলেজ, নাজিরপুর, বাঙ্গাবাড়িয়া,মাধপুর, ঈশ্বরদী, পাকশী, দাশুড়িয়া, বাঁশেরবাদা, মীরকামারী, ডেমরা, হাদল, চাটমোহর, ফৈলজানা, সাতবাড়িয়া, ধূলাউড়ি, শহিদনগর, বেড়া নগরবাড়ি,বনগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক গণহত্যা চালায়। পাবনার মানুষও প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। পাশের দেশ ভারতে গিয়ে ট্রেনিং গ্রহণ করে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। মুক্তিযোদ্ধা, ভারতীয় মিত্রবাহিনী ও পাবনার সংগ্রামী জনতার ব্যাপক পরাক্রম দ্বারা পাকসেনা ও তাদের দোসরদের নাসত্মানুবাদ করে স্বাধীনতার লাল সূর্য ছিনিয়ে আনে। মহান মুক্তিযুদ্ধে পাবনার দামাল ছেলেদের অবদান ছিল অসামান্য। বিজয় অর্জনের দুদিন পর ১৮ ডিসেম্বর পাবনা, ২০ ডিসেম্বর চাটমোহর ও ২১ ডিসেম্বর ঈশ্বরদী শত্রুমুক্ত হয়। পাবনার পাক সেনারা ভারতীয় সেনার উপস্থিতিতে আত্মসমর্পনের ইচ্ছা ব্যক্ত করায়। ১৮ ডিসেম্বর মিত্রবাহিনীর একজন অফিসারের উপস্থিতিতে ওয়াপদা কলোনীতে পাক সেনারা আত্মসমর্পন করে। ২০ ডিসেম্বর চাটমোহরে ও ২১ ডিসেম্বর ঈশ্বরদীতে পাকবাহিনী মিত্রবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পন করে। মহান মুক্তিযুদ্ধে পাবনাবাসীর অবদান অসামান্য। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু বারবার পাবনা জেলায় এসে জ্বালাময়ী বক্তৃতা দিয়ে এখানকার মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছেন। ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, আব্দুর রব বগা মিয়া, আমজাদ হোসেন, শহীদ এ্যাড. আমিন উদ্দিন, প্রসাদ রায়, আমিনুল ইসলাম বাদশা, ডিসি নুরম্নল কাদের, পুলিশ সুপার আব্দুল গাফফার, আরই আবুল খায়ের, এ্যাড. আমজাদ হোসেন, রনেশ মৈত্র, অধ্যক্ষ আব্দুল গণি, মহি উদ্দিন আহমেদ, অধ্যাপক আবু সাইয়িদ, আহমেদ তফিজ উদ্দিন, গোলাম হাসনায়েন, ওয়াজি উদ্দিন খান, দেওয়ান মাহবুবুল আলম, গোলাম আলী কাদেরী, রফিকুল ইসলাম বকুল,এ্যাড. শামসুল হক টুকু, ইকবাল হোসেন, আহমেদ রফিক উদ্দিন, শহীদ মওলানা কছিমুদ্দিন, সোহরাব উদ্দিন সোবা, আব্দুস সাত্তার লালু, বেবী ইসলাম, জহুরুল ইসলাম বিশু, ফজলুল হক মন্টু,আবু তালেব খোন্দকার, মোহাম্মদ নাসিম, আলতাফ হোসেন, শিরিন বানু মিতিল, রবিউল ইসলাম রবি, হাবিবুর রহমান হাবিব, শামসুর রহমান শরীফ, জহিরম্নল ইসলাম, আতাউল হক, জাহিদ হাসান, রফিকুল হক রবি, রেজাউল করিম মঞ্জু, আনোয়ার হোসেন রেনু, নিজাম উদ্দিন, লোকমান হোসেন, মোজাহারুল হক, মোজাম্মেল হক ময়েজসহ অগণিত মানুষ মহান মুক্তিযুদ্ধে পাবনায় ব্যাপক অবদান রেখেছেন। তাঁদের নাম অম্লান হয়ে থাকবে।