জেলা পাবনার ১৮৫ বছর পূর্তি আগামী ১৬ অক্টোবরে। লর্ড বেন্টিকের শাসনামলে ১৮২৮ খৃস্টাব্দের এই দিনে পাবনা স্বতন্ত্র জেলা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। জেলা গঠনের সময় যশোরের ধরমপুর, মধুপুর, কুষ্টিয়া, পাংশা এবং পাবনা, ক্ষেতুপাড়া, মথুরা ও রায়গঞ্জ এই আটটি থানা নিয়ে জেলা গঠিত হয়। একই বছরে খোকসা থানা সামিল হয় পাবনায়। ১৭৬৫ খৃস্টাব্দের পর বাংলা বিহার যে আট ভাগে বিভক্ত হয় তার মধ্যে পাবনা হুগলি বিভাগের অন্তর্গত রাজশাহী পরগনার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল। ইতিহাসে উল্লেখ আছে, ১৭৯০ খৃস্টাব্দে লর্ড কর্নওয়ালিশের সময় দশশালা বন্দোবস্ত চিরস্থায়ী কালীন পাবনার ভূসম্পত্তি নাটোর রাজ রামকৃষ্ণের সাথে বন্দোবস্ত হয়। তখন এ জেলায় অন্য কেউ জমিদার মর্যাদায় ছিলেন না। হ্যামিলটনের লেখা ইন্ডিয়া গেজেটিয়ারে উল্লেখ করা হয়, ‘হান্ডিয়ালের পার্শ্ববর্তী এলাকার বন-জঙ্গলে ডাকাতেরা লুকিয়ে থাকত। তাই নৌপথের যাত্রীদের রক্ষাকল্পে ষোল দাঁড়ের একখানা দ্রুতগামী নৌকাসহ জনৈক জমাদার নিযুক্ত করা হয়।’ সে সময় পাবনায় সরকারের দায়িত্বপূর্ণ কর্মচারিদের অভাব, পুলিশের অযোগ্যতা এবং জমিদারদের পক্ষ থেকে ডাকাতি ঘটনার তথ্য গোপন রাখা বা এড়িয়ে যাওয়ার কারণে অপরাধীরা দলে দলে গ্রামাঞ্চলে ঘুরে বেড়াতো। এদের প্রতিরোধ করতে ও জমিদারদের শান্তি রক্ষাসহ শাসনতান্ত্রিক সুবন্দোবস্তের জন্য কোম্পানি সরকারের মন্তব্য অনুসারে পাবনাকে উন্নীত করা হয় জেলায়। তখন পশ্চিম বাংলার মালদহ জেলার জয়েন্ট ম্যাজিস্ট্রেট এ ডব্লিউ মিলস এ জেলায় নিযুক্ত হন স্বপদে। ১৮৩২ খৃস্টাব্দে এ পদ স্থায়ী করে নিয়োগ করা হয় স্বতন্ত্র ডেপুটি কালেকটর। মোগল আমলে (১৬৭৩-১৭৭৩) মাহামুদাবাদ পাঁচ বলতে বুঝাত বেলকুচি, পাবনা, সলঙ্গাহাট, সুজানগর, লাহিড়ী ও পোতাজিয়া। সংবাদ প্রভাকর ১২৬১ বঙ্গাব্দের ২৮ পৌষ সংখ্যায় উল্লেখ, জেলায় আটটি থানা-পাবনা, নাজিরগঞ্জ, মথুরা, পাংশা, হান্ডিয়াল, ধর্মপুর, কুষ্টিয়া ও খোকসা। দুটি পাবনা ফাঁড়ি অরনকোলা ও নওপাড়া।
পাবনা নামকরণ প্রসঙ্গে নানা মত। তারমধ্যে পদ্মা নদীর তিনটি শাখার একটি হলো পাবনী। এ ধারা হেজে-মজে স্থলভাগে পরিণত হয়। পাবনী শব্দ পাবনা হয়ে যায়। হয়ে ওঠে ইতিহাস। স্থানীয় নদীসমূহকে অবলম্বন করে জেলাবাসীর চিন্তা অনিবার্যভাবে বিকশিত ও প্রবাহিত হতে থাকে।
১৮৫৩ খ্রিস্টাব্দের মে মাসে পাবনা সদরে স্থাপন করা হয় ডির্সপেনসারি। আংশিক ব্যয় বরাদ্দ করত টাউন্ড ফান্দ। বাকি ব্যয় করা হতো চাঁদার টাকায়। এ বছরেই স্থাপিত হয় জেলা স্কুল ১৮৫৮ তে বেড়ায় এবং ১৮৬১ তে চাটমোহরে বেসরকারি হাইস্কুল প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে সিপাহী বিদ্রোহ চলাকালে তাঁতীবন্দের জমিদার বিজয় গোবিন্দ চৌধুরী সরকারকে সহায়তা করেন। এ কারণে পরবর্তীতে তাকে বিনা লাইসেন্সে কামান ও আগ্নেয়াস্ত্র রাখার অনুমতি দেন লেফটেনেন্ট গভর্নর অফ বেঙ্গলের এস ডি এইচ জে এস কটন। মাছ-মাখন-হলুদ-ধান ও পাট উত্পাদনে পাবনার রমরমা অবস্থা। কলকাতার বাজারে তখন ধন্ধুমার রফতানি বাণিজ্য। জেলাবাসীর সমৃদ্ধি দেখে উর্বর মাটি দেখে ইউরোপিয়ানেরা ব্যবসায় নেমে পড়ে। অন্যেরা নীল ব্যবসায় বিনিয়োগ করেন। গড়ে ওঠে নীল কুঠি। ১৮৫৭ তে নীল বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে! এসময় পাংশা, বালিয়াকান্দি ও কুমারখালি থানা নিয়ে গঠিত হয় কুমারখালি মহকুমা থাকে পাবনার অধীনে। ১৮৬০ খৃস্টাব্দে পাবনার বেগসাবাদ পরগনার জমিদার প্যারীসুন্দরী নীল বিদ্রোহীদের মধ্যে অন্যতম হয়ে ওঠেন। ১৮৬৩ তে মহকুমা ভেঙে দেয়া হয়। ১৮৫৫ তে ময়মনসিংহ থেকে সিরাজগঞ্জকে কেটে পাবনা জেলাভুক্ত করা হয়। ১৮৫৯ এ কুষ্টিয়াকে পাবনা থেকে কেটে নদীয়া জেলাভুক্ত করা হয়। এর আগে শাহজাদপুর পাবনাভুক্ত হয়। রায়গঞ্জকে বগুড়ায় দিলেও আবার পাবনায় সামিল হয়। ১৮৭২ জেলার জমিদারের খাজনা বাড়ায়। প্রজা সাধারণ বিদ্রোহী হয়ে ওঠেন। এ সময় জেলার লোকসংখ্যা ছিল বার লাখ সাড়ে এগার হাজার। ১৮৭৩ এর ৩ জুলাই ইংরেজরা এই বিদ্রোহ কঠোর হাতে দমন করে। ভূমি আন্দোলনের ফলে ইতিহাস গড়ে ওঠে। ফলে কোম্পানি সরকার ভূমি সংক্রান্ত মোকদ্দমা আইন তৈরি করে। ১৮৮৫ তে বেঙ্গল টেনান্সি অ্যাক্ট তৈরির মাধ্যমে স্থায়ী আইনের পরিপূর্ণতা লাভ করে। ১৮৭৬ এ মিউনিসিপ্যালটি স্থাপিত হয়। ১৮৭৯ তে পাবনা ও বগুড়ার জন্য নিযুক্ত করা হয় সেসন জজ। ১৮৮৪ তে নির্মিত হয় জজকোর্ট। পরের বছর জেলাবোর্ড প্রবর্তনের পর কাঁচা রাস্তা নির্মাণ শুরু। ১৮৯১ তে টেকনিক্যাল স্কুল স্থাপিত। ১৮৯৮ এ এডওয়ার্ড কলেজ। ১৮৭৮ এ জেলার রেলপথ স্থাপিত হয়। ১৯২৬ এ মোটর সার্ভিস চালু। ১৯৪০ এ বিদ্যুত্ সরবরাহ কেন্দ স্থাপন। ঘোড়ায় টানা পালকি গাড়ি থেকে টমটন। ১৯৬২ তে বিমান যোগাযোগ স্থাপিত হয় ঈশ্বরদী থানায়। ১৯৬৪ তে নগরবাড়ী ফেরিঘাট। ১৯৬৭ তে পাবনা-ঈশ্বরদী- নগরবাড়ী ঘাট পর্যন্ত সরকারি বাস সার্ভিস উদ্বোধন। ১৯৬৭ তে ভুট্টা আন্দোলন।
১৯৪৮ এ টেলিফোন চালু। বর্তমান পাবনা শহর শিক্ষা শহর হয়ে উঠেছে। ১৯৮৫ তে সিরাজগঞ্জ পাবনা থেকে আলাদা হয়ে জেলার মর্যাদা লাভ করে। বর্তমান পাবনার আয়তন দাঁড়ায় ২,৩১৭ বর্গকিলোমিটার ১৯৪২ এ শহরে রেডিও বাজতে থাকে। ১৯৬৬-৬৭ তে টেলিভিশন। ১৯৭১ এর মার্চে ৪ দিনে ১৭টি খন্ড যুদ্ধে এশহরে প্রায় এক রেজিমেন্ট পাক সেনা নিহত হয়। পাবনা মুক্ত থাকে ৩০ মার্চ থেকে ১০ এপ্রিল পর্যন্ত। হানাদার বাহিনী ১১ এপ্রিলে পাবনা দখলে নেয়।
