দেশের চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা অর্থনীতিকে গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে বলে আশংকা করেছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। আর এ অস্থিরতায় ব্যাহত হতে পারে প্রবৃদ্ধি। চলতি (২০১৩-১৪) অর্থছরের শেষ নাগাদ ৭ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা সরকারের থাকলেও ম্যানিলা ভিত্তিক এই উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার পূর্বাভাস প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৫ দশমকি ৮ শতাংশে নেমে আসবে। গতকাল এডিবি’র ঢাকাস্থ কার্যালয়ে এ পূর্বাভাস প্রতিবেদন আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়।
বিদায়ী (২০১২-১৩) অর্থবছরের সামায়িক হিসেব অনুযায়ী জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৬ দশমকি শূন্য ৩ শতাংশ। সেসময় এডিবির পূর্বাভাস ছিল ৬ শতাংশ। গতকাল আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে প্রতিবেদনের মৌলিক বিষয় তুলে ধরেন এডিবি কান্ট্রি ডিরেক্টর তেরেসা খো। মূল প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন এডিবি ঢাকা কার্যালয়ের প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন। এডিবির কান্ট্রি ডিরেক্টর বলেন, জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে যে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে তাতে বেসরকারি বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয়েছে, এর সথে যুক্ত হয়েছে বিদ্যুত্ ও গ্যাসের সংকট। সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেলেও বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোর সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের রয়েছে অনেক সম্ভাবনা, প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কম হলেও তা গত অর্থবছরের অর্জন থেকে খুব বেশি পিছিয়ে নেই। যথাযথ মুদ্রানীতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারে স্থিতিশীলতাসহ সামষ্টিক অর্থনীতির দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির স্থিতিশীলতা ধরে রাখা সম্ভব। তিনি উল্লেখ করেন, ঘাটতির পরিমাণ বাজেটের লক্ষ্য অনুযায়ী রয়েছে, মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাসও কমেছে। তবে বিদ্যুত্ ও জ্বালানি খাতে ভর্তুকি বেড়েছে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়ন হার বেড়েছে কিন্তু এডিপি বাস্তবায়ন ক্ষমতা বৃদ্ধি করার চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। পূর্বাভাস অনুযায়ী বপ্তানির পরিমাণ কমে যেতে পারে। ভোগ ও বিনিয়োগও কমে যেতে পারে।
নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ছে। এটি স্থিতিশিল অর্থনীতির জন্য সহায়ক নয় বলেও তিনি উল্লেখ করেন। আবহাওয়া অনুকূল থাকলে এ অর্থবছরে কৃষি খাতে ৩ দশমিক ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হতে পারে। তবে দেশিয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা কম থাকায় এ অর্থবছরে শিল্প খাতে প্রবৃদ্ধি ৮ দশমিক ২ শতাংশে নেমে আসতে পারে। গত অর্থবছরে ৭ দশমিক ৭ শতাংশ মূল্যস্ফীতি থাকলেও এ অর্থবছরে তা সাড়ে ৭ শতাংশে থাকতে পারে। তিনি আরো উল্লেখ করেন, বিগত কয়েক দশকে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক অগ্রগতি উল্লেখযোগ্য। সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যস্থাপনাও ভালো রয়েছে। সহস্রাব্দ লক্ষ্য অর্জনের মূল পথে রয়েছে বাংলাদেশ। তবে উন্নয়নকে আরো দ্রুত করার জন্য বাংলাদেশকে ব্যবসায়ের জন্য পরিবেশ উন্নয়ন ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার দিকে জোর দিতে হবে।
ঢাকা কার্যালয়ের প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন উল্লেখ করেন, এশিয়ার প্রবৃদ্ধি ২০১২ সালে ৬ দশমিক ১ শতাংশ থেকে ২০১৩ সালে ৬ শতাংশে নেমে এসেছিল। তবে ভারত ও চীনের অর্থনীতি শক্তিশালী হবার ফলে ২০১৪ সাল নাগাদ এশিয়ার প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ২ শতাংশে উন্নীত হতে পারে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির ঝুঁকির বিষয়ে তিনি উল্লেখ করেন, সরকারের রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ কমে যেতে পারে। রপ্তানি আয় ও রেমিটেন্সে বিগত সময়ে ঊর্ধ্বগতি থাকলেও তা কমে যেতে পারে। তাছাড়া রাজনৈতিক চাপে সরকার জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নাও নিতে পারে। সরকারের বড় আকারের ঋণ গ্রহণ আর্থিক ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা দেখা দিতে পারে যার ফলে আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা ভঙ্গ হতে পারে। রাজনৈতিক অস্থিরতা দেশের অর্থনীতিকে গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এসব কারণে চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশে ৫ দশমিক ৮ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হতে পারে বলে মনে করে এডিবি।
