হেলাল হাফিজ

জনারণ্যে একাকী কবি

আপডেট : ০৩ অক্টোবর ২০১৩, ১৯:০২
হেলাল হাফিজ বাংলাদেশের একজন আধুনিক কবি যিনি স্বল্পপ্রজ হলেও বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে বিশেষ জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। খুব কম বাঙালি পাঠকই আছেন যারা ‘যে জলে আগুন জ্বলে’র সঙ্গে পরিচিত নন। হেলাল হাফিজের প্রথম বই প্রকাশিত হয় ১৯৮৬ সালে। দীর্ঘ সতেরো বছর লেখালেখির পর এই গ্রন্থের প্রকাশ। এমন দৃষ্টান্ত বাংলাদেশের কবিতার ইতিহাসে সম্ভবত তিনিই দেখিয়েছেন। ৭ অক্টোবর বোহেমিয়ান, কষ্ট ফেরিঅলা, যাযাবর এই কবির ৬৫তম জন্মদিন। জন্মদিন উপলক্ষে কবির সঙ্গে কথা বলেছেন—পলিয়ার ওয়াহিদ কেন বাড়ি ছাড়লেন? কোন সে প্রেমিকা যে কবিকে যাযাবর করে দিল?—এমন প্রশ্নে তিনি শুধু হাসেন আর বলেন, দুঃখ কি সবাই দিতে পারে! দুঃখও যে এক মূল্যবান সম্পদ। দুঃখকে যত্নে লালন-পালন করতে হয়। তাহলে সেখানে রত্ন ফলে। ‘কবির জীবন খেয়ে জীবনধারণ করে কবিতা এমন এক পিতৃঘাতী শব্দের শরীর’। কবিকে যে কী পরিমাণ কষ্ট ধারণ করতে হয় তা যদি মাপা সম্ভব হতো, তাহলে বোঝানো যেত। আমি চেষ্টা করেছি কষ্টকে কবিতায় রূপ দিতে। আর তোমরা যারা মনে করো, আমাকে যে কষ্ট দিলো কেমন সে নারী? কিন্তু আমি তার কাছে কৃতজ্ঞ। সে কষ্ট না দিলে হয়তো তোমরা এই হেলাল হাফিজকে পেতে না। সব তো তারই অবদান। ছোটবেলায় মা মারা যাওয়ায় আমি খুব ভেঙে পড়ি। কয়েক বছর পরে বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করে নিয়ে আসেন আমাদের নতুন মা। আমিও তখন বাইরে পা রাখি। আর বাড়ি ফেরা হয়নি। তারপর এলাম ঢাকায়। তখন আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। আর্থিক অনটন। লেখাপড়া ছেড়ে চলে গেলাম মুন্সীগঞ্জে এক স্কুলে চাকরি করতে। সেখানে বেশিদিন ভালো লাগল না। আবার ফিরে এলাম লেখাপড়ায়। আমি, আবুল হাসান, গুণ—আমরা এক সাথে লিখতাম। আমার হাসানের কবিতা খুব ভালো লাগত। ও সবসময় আমাদের কাছে থাকত। কবিতা ছাড়া ও যেন আর কিছুই চিন্তা করত না। সারাক্ষণ শুধু কবিতা আর কবিতাই ছিল ওর ধ্যান-জ্ঞান। আপনি একটা সময় নাকি খুব জুয়া খেলতেন? জানতে চাইলে হেসে বলেন—দেখো, সময় কাটানোর জন্য তো খেলতামই। কিন্তু এক সময় নেশায় পরিণত হয়ে গেল। এখন তো আলসেমি আমার নেশা হয়ে পড়েছে বলে লেখালেখি তেমন হচ্ছে না। আর কি কবিতা লিখবেন না? কথা থামিয়ে দিয়ে বললেন—দেখো, কবিতা তো জোর করে লেখার জিনিস না, এটা তো খানিকটা সাধনার বা নাজিল হবার বিষয়, তাই না? আমি ইচ্ছে করলেই একটা কবিতা লিখতে পারি না। আমার কবিতা আমাকে দুমড়ে মুচড়ে ধরে। আমাকে ঝড়ের মতো আহত করে পরে আবার সুস্থ করে তোলে। আমি কবিতার মধ্যে জন্মগ্রহণ করি। কবিতার মধ্যে মরে যেতে চাই। বহুল পঠিত ও ব্যাপক আলোচিত কবিতা ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ নিয়ে কিছু বলুন। এ প্রসঙ্গ কবিকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় তাঁর স্মৃতিময় অতীতে।—একদিন রথখোলা থেকে হলে ফিরছি। সন্ধ্যার আগে আগে। নবাবপুর এসে ফুলবাড়িয়া স্টেশনের দিকে প্রচণ্ড চিত্কার আর হৈচৈ শুনতে পেলাম। মিছিল যাচ্ছে। পুলিশ মিছিলে লাঠিপেটা করছে। আমি রিকশায় ছিলাম। হঠাত্ দেখলাম, সামনে মিছিল থেকে একজন রিকশাওয়ালা চিত্কার করে বলছে, মারো... মারো। কিছু কিছু প্রেম আছে তার জন্য মানুষ মারাও জায়েজ হয়ে যায়। সে দেশপ্রেমের কথাই বলছিল, মারাত্মক কথা তো! একটা ঘোর তৈরি হলো আমার মধ্যে। এই ঘটনার ওপর একটা কবিতা লিখতে শুরু করলাম। কিন্তু লেখাটা সহজ হয়ে উঠছে না। রিকশাওয়ালার সেই উক্তি ভুলতেও পারছি না, আবার কবিতার মাঝে সাজাতেও পারছি না। অস্থিরতায় পেয়ে বসল। নেশার প্রতি আসক্তি আরও বেড়ে গেল। ক্লাসে মন টেকে না। কখনো হলে, কখনো মধুর ক্যান্টিনে, কখনো শরীফ মিয়ার ক্যান্টিনে বসি। যখন যা মনে আসে তা-ই লিখি। অবশেষে একদিন একটি দীর্ঘ কবিতা দাঁড় করালাম। হুমায়ুন কবির প্রথম কবিতাটি পড়লেন। দুই পাতার দীর্ঘ কবিতাটিকে তিনি ১০ থেকে ২০ লাইনে আনার পরামর্শ দিলেন। বললেন, ‘বাকি সব ফেলে দাও। কী ফেলবে সেটা তোমার দায়িত্ব।’ আরও বললেন, ‘আমি মনে করি এই কবিতার পর তোমার আর না লিখলেও চলবে। এই কবিতার জন্যই তুমি অমরত্ব পাবে। কিন্তু কবিতাটিকে ছোট করতে হবে।’ আবার আমার মাথায় তালগোল শুরু হলো। কবিতা ছোট করব কী করে? অবশেষে ১৫-১৬ লাইনের মধ্যে কবিতাটিকে দাঁড় করালাম। আহমদ ছফা ও হুমায়ুন কবির খুশি হয়ে বললেন, ‘হ্যাঁ, এবার কবিতাটি যথার্থ রূপ পেয়েছে। তুমি জীবনে যদি আর কবিতা না-ও লেখ, ক্ষতি নেই। এই একটি কবিতাই তোমাকে যুগ যুগ ধরে বাঁচিয়ে রাখবে। তোমার অমরত্ব নিশ্চিত হয়ে গেছে।’ পরবর্তীতে তাঁদের কথাই সত্যি হয়েছে। দেখো, সময় আসলে কবিকে দিয়ে লিখিয়ে নেয়। তখন ঊনসত্তর সাল। গণঅন্দোলন চলছে। তখন আমি এই কবিতাটি লিখি। মানুষের মুখে মুখে এই কবিতা স্লোগানে রূপ নিল। শ্লোগান আসলে কতটা কবিতা তা নিয়ে অনেক আলোচনা-সমালোচনা আছে। আপনার কী মনে হয়? —হ্যাঁ, থাকতে পারে। মানুষকে জাগানো কি মুখের কথা? সেটা কবিতা ছিল। আমি কবিতাই লিখেছিলাম। যদি সেটা শ্লোগান হয়ে যায়, তবে খারাপ কী? কবিকে কেমন হওয়া উচিত? —কবিকে নীলকণ্ঠ হতে হয়, জীবনের সব বিষ কিংবা না পাওয়াকে ধারণ করে বেঁচে থাকা এবং মানুষকে স্বপ্ন দেখানো এবং আনন্দ দেওয়াই হচ্ছে কবির কাজ। স্বপ্নভঙ্গের বেদনাকেও কবি ধারণ করেন এবং তা মানুষের মাঝে সংক্রমিত করেন। আপনি এত জনপ্রিয় হবার পরেও কেন লোকচক্ষুর আড়ালে থাকেন?—জানতে চাইলে কবি বলেন, আসলে আড়ালে থাকতে আমার ভালো লাগে। নিজেকে নিজে বাজারি করে তোলাটা লজ্জ্বাকর নয়? তাছাড়া কবিরা তো পর্দার আড়ালে থাকতে ভালোবাসে। কোকিল কত মধুর সুরে গান গায়, তাকে কে কতটা দেখতে পায়, বলো? আড়ালে থাকি বলেই তো তোমরা খুঁজে বের করো। এটা এক ধরনের আনন্দ। মৃদু হাসি—হা হা হা...। নিজের জীবন সম্পর্কে কিছু বলুন। —আমি কখনো আমার সম্পর্কে কোনোকিছু লুকাইনি। ২৬ বছর স্বেচ্ছানির্বাসনে ছিলাম। এক সময় প্রচুর জুয়া খেলেছি। এসব নিয়ে কোনো রাখঢাক নেই। জীবনের প্রাপ্তি শুধু আমার বই—‘যে জলে আগুন জ্বলে’। আমি একা, নিঃসঙ্গ, একটি মাত্র কাব্যগ্রন্থ আমার পাথেয়। কবি না হলে কী হতেন? —শৈশব থেকেই খেলাধুলার প্রতি দারুণ ঝোঁঁক ছিল। ছিলাম একজন ভালো খেলোয়াড়। স্কুলজীবন থেকে লেখালেখি শুরু করি। তবে কি কবি না হলে খেলোয়াড় হতেন? —না না, আমি খেলোয়াড় থেকে কবি হয়েছি। আমি তো বরাবরই একজন ভালো খেলোয়াড় ছিলাম। এখনো খেলা দেখতে বেশ পছন্দ করি। প্রিয় খেলার তালিকায় আছে লন টেনিস ও ফুটবল। এখন সময় কাটে কীভাবে? —জানতে চাইলে কবি বলেন, আমি বরাবরই একটু অলস প্রকৃতির। খাই-দাই, ঘুমাই। এর চেয়ে বেশিকিছু করতে ইচ্ছা করে না। এই আলস্যের কারণেই কিন্তু আমার আর নতুন কোনো কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হলো না। এক প্রকাশনা উত্সবে আপনি বলেছিলেন, ধর্ম ও রাজনীতি কিছু ভুল মানুষের হাতে পড়ে গেছে। বিষয়টি একটু ব্যাখ্যা করবেন? —একটি সমাজের দুঃসময়ে একজন কবি পারেন সেই সময়ের ত্রুটিগুলো তুলে ধরে মানুষকে সচেতন করে তুলতে; যদি তিনি প্রকৃত কবি হন। এ বিষয় নিয়ে নিজ নিজ অবস্থান থেকে ভাবতে হবে। আমরা একটু সচেতন হলে ধর্ম থাকবে, রাজনীতি থাকবে, কবি থাকবে এবং তার সংস্কৃতিও সঠিক পথে থাকবে। এটা সম্ভব হবে যদি আমরা একটি পুঁতির সাথে অন্য পুঁতিকে সঠিকভাবে সাজিয়ে মালা গাঁথতে পারি। এ সময়ের কবিতা সম্পর্কে আপনার অভিমত কী? —ভালো, বেশ ভালো। তরুণরা খুব ভালো লিখছে। আমি বাংলা সাহিত্য নিয়ে বেশ আশাবাদী। এখন তো কবিতার সময়। সময় যত দুঃসময় হয়, কবিতা তো তত ভালো হওয়া উচিত। সবাই বলে নতুন কিছু করো, নতুন কিছু লেখো। আসলে নতুন বলতে আগে যে কথাটা কেউ বলেছে সেটা না বলে অন্যভাবে বলা। সবকিছু তো উপস্থাপনার ওপরই নির্ভর করে, তাই না? কবিতা হচ্ছে নিজের মনের সাথে অন্যের মনের ভাবনার সংযোগ, সেটা যখনই হোক, যেসময়েই হোক। হূদয় ছুঁয়ে যায় এমন কোনো স্মৃতির কথা বলবেন? —একবার সিলেটে একটি সাহিত্য অনুষ্ঠানে গেলাম। অনেক দূরের গ্রাম থেকে একজন অন্ধ লোক এলেন। বললেন, ‘আমি তো চোখে দেখি না, তাই আপনার কণ্ঠস্বর শুনতে এসেছি।’ সে কথা মনে পড়লে আমি আর নিজের ভেতর থাকি না।