‘ত্রিশ বছর যাবত্ আমি ফিকশানধর্মী কাজ করছি। প্রথম দশ বছর চিন্তিত ছিলাম অর্থসংস্থান নিয়ে। এবং তখন কেউ আমার কাছে কখনো জানতে চায়নি, কী পরিমাণ টাকা আমি রোজগার করি। দ্বিতীয় দশকেও কেউ এ সম্পর্কে কোনো প্রশ্ন আমাকে করেনি। শেষ দশ বছরে আমি অনেক টাকা ব্যয় করেছি এবং অনেকেই জানতে চেয়েছেন কীভাবে আমি এত টাকা ব্যয় করেছি, কিন্তু এর উত্তর তো আমি দেব না’।
আন্তর্জাতিক ডাবলিন সাহিত্য পুরস্কার-২০০৩ পাওয়ার পর এক প্রশ্নের উত্তরে তুরস্কের নোবেল বিজয়ী সাহিত্যিক ওরহান পামুক উপর্যুক্ত কথাগুলো বলেছিলেন। আর এ উক্তি আমাদের নির্দ্বিধায় মনে করিয়ে দেয়, তুরস্কের সমাজব্যবস্থায় একটা বড় ধরনের গলদ বিদ্যমান। যাহোক, পাঠক নিশ্চয় জানেন, পামুক সম্পর্কে কোনো বড় ভূমিকার প্রয়োজন পড়ে না। বিশ্বসাহিত্যের একজন পুরোধা ঔপন্যাসিক; আধুনিক-উত্তর সময়ে যাঁর উত্থান। ইতিহাস, সংস্কৃতি, সামাজিক মূল্যবোধ, ঐতিহ্য, পরমতসহিষ্ণুতা, জীবন-বাস্তবতা ইত্যাদি নানা বিষয় তিনি একটি ক্যানভাসে নিয়ে এসে তাঁর উপন্যাসে উপস্থাপন করেন। বোর্হেস, মার্কেজ, ফকনার, দস্তয়েভস্কি, টলস্টয় ও কাজী নজরুল তাঁর প্রধান প্রেরণা। পাঠক, চেষ্টা করেছি এক নিবন্ধে পামুকের নিজের কথা শোনাতে ও সেই সাথে আমার নিজের কিছু ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ আপনাদের সামনে তুলে ধরার।
ওরহান পামুকের লেখালেখির শুরু ১৯৭৪ সালে ‘ডার্কনেস অ্যান্ড লাইট’ উপন্যাসের মাধ্যমে। ইস্তাম্বুলের একটি জেলা শহর নিসািস, যেখানে বেড়ে উঠেছিলেন পামুক নিজে, সে শহরের এক ধনাঢ্য পরিবারের তিন প্রজন্মের গল্প নিয়ে এ উপন্যাস। এখন পর্যন্ত মোট আটটি উপন্যাস লিখেছেন পামুক। সবশেষটির নাম—‘দি মিউজিয়াম অব ইনোসেন্স’। এ লেখায় আমি চেষ্টা করেছি শেষটি সহ আরও দুটি উপন্যাস নিয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করার। দি মিউজিয়াম অব ইনোসেন্স-এর প্রকাশকাল ২০০৮। আখ্যানটিতে পামুক একটি জাতির প্রাণশক্তির উত্স খুঁজেছেন প্রেম ও ভালোবাসার মধ্যে। মূলত তিনি তাঁর অপরাপর আরও দুটি উপন্যাসে তুরস্কের প্রাণশক্তির সন্ধান করেছেন ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ের মধ্যে। তবে এও ঠিক, এ আখ্যান শুধু পৃথিবীর যে অংশে পামুকের বাস সে স্থানের জন্য প্রযোজ্য নয়, এর প্রাসঙ্গিকতা প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের নানাদেশে বিদ্যমান, এমনকি বাংলাদেশেও। পামুকের ভাষায়—
‘দ্য মিউজিয়াম অব ইনোসেন্স-এ আমি জাতির প্রাণশক্তির উত্স খুঁজেছি ভলোবাসা ও প্রেমের মধ্যে। হতে পারে এটি শুধুমাত্র পৃথিবীর যে অংশে আমার বাস সে-ই অংশকে নিয়ে, পুরো পৃথিবীর সব জাতির ক্ষেত্রে তা সত্য না-ও হতে পারে। আবার আমার গল্প সমস্ত
অ-পশ্চিমাদের ক্ষেত্রে সত্য যেখানে বিয়ে ব্যতীত যৌনতা কিংবা ভালোবাসার নানা অনুষঙ্গ বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত এবং যে সমাজে কুমারীত্বকে নিয়ে কুসংস্কার বিদ্যমান। এ বইটি চীন, স্পেন, ইতালি, গ্রিস এমনকি সমগ্র ভূ-মধ্যসাগরীয় অঞ্চলে ব্যাপক পাঠকসমাদৃত এবং জার্মানি, আমেরিকাতেও এ বই জনপ্রিয়। এসব বিষয় শুধু যে তুরস্কের ইস্যু এমনটি নয়, সকল দমনমূলক ও ইচ্ছা-আকাঙ্খা অবদমিত হয়—এমন সমাজসমূহে বিদ্যমান ভালোবাসার গল্প এটি। এমন সব সমাজের গল্প, যেখানে প্রেমিক-প্রেমিকারা তাদের ভালোবাসা নিয়ে আলাপের সুযোগটুকুও পায় না। উত্তর-ঔপনিবেশিক অ-পশ্চিমীয় বুর্জোয়া সমাজে অনেকটা রোমিও-জুলিয়েট ঘরানার গল্প এটি। আধুনিকতার প্রয়াস আর ঐতিহ্যের জেগে ওঠা পশ্চিমে যেভাবে অবতীর্ণ হচ্ছে—এর প্রচার, প্রয়োগের চেয়ে বেশি। এমন একটি অবস্থায় ধর্ম আর সংস্কৃতির ঐতিহ্যগত মেলবন্ধন প্রায় অসম্ভব।’
যদি উপন্যাসটি পাঠকরা পড়ে থাকেন তবে দেখবেন, ফুসন ও কেমাল, উপন্যাসের দুই অন্যতম চরিত্র, একে অপরকে ভালোবাসে অথচ সমাজে বিদ্যমান নানা কারণে তাদের কথা বলার সুযোগ নেই। একে অপরের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। নীরবতা এখানে ভাষা তৈরি করে। একজন প্রেমিকের তার ভালোবাসার মানুষের প্রতি যে ধরনের টান থাকে, কেমালের মনোযোগও ফুসনের প্রতি ঠিক তেমনই বৈশিষ্ট্যসূচক। চোখে চোখ রেখে কথা বলার সুযোগ নিতান্তই কম তবু কেমাল, ফুসনকে প্রতিরাতেই দেখে। একত্রে তারা টেলিভিশন দেখলেও যোগাযোগ অসম্ভব, কারণ অন্য সবাই তাদের একা রেখে যাবে না। যখন দুজনে একত্রে ফুসনের আঁকা ছবির দিকে তাকায়, সেই মুহূর্তটি হয় কেবল তাদের। এখন আপনারাই বিবেচনা করুন এমন অবদমন, নিপীড়ন কি আমাদের দেশের কোথাও নেই? নিশ্চয়ই আছে। পামুক চেষ্টা করেছেন একটি নিপীড়িত ও অবদমিত সমাজের ছবি আঁকার, যেখানে প্রেমিক-প্রেমিকার বিন্দুমাত্র সুযোগ নেই কথা বলার, দেখা করার।
প্রত্যেক সমাজের উত্তরণের জন্য একটা বিপ্লবের প্রয়োজন হয়। আর আমি বোধ করি, পামুক তাঁর প্রায় লেখায়-ই সেই বিপ্লবের এক নীরব ডাক দিয়ে থাকেন। কোনো কোনো সময় এই ডাকের স্ফুরণ ঘটে। লেখকও হয়তো তখন সজাগ থাকেন না। অথচ বিপ্লব বয়ে চলে অনেকটা অজান্তেই। টের পান পাঠকরা। এমনটি হয়ে থাকে লেখকের বোধশক্তির প্রগাঢ়তা, সমাজ-মজ্জায় লুকিয়ে থাকা পচন আবিষ্কারের ক্ষমতা ও সমাজের ঐতিহাসিক বিবর্তন নিয়ে বস্তুগত জ্ঞান থাকার ফলে। পামুক সে গোছের একজন ঔপন্যাসিক, যিনি জানেন তাঁর দেশ তুরস্ক ও এর রাজধানী ইস্তাম্বুল নগরীর প্রাচীন ইতিহাস। ইতিহাস খুঁড়তে গিয়ে তিনি আবিষ্কার করেছেন দৃশ্যমান সমস্যার অন্তরালের মূল কারণ। এসব ঘটনার পরম্পরা করতে যেয়ে আধুনিক-উত্তর নানা Technique, যার মধ্যে অন্যতম Intertextuality এর প্রয়োগ তিনি করেছেন। ‘স্নো’, ‘মাই নেম ইজ রেড’ কিংবা ‘ইস্তাম্বুল :দি মেমোরিজ অ্যান্ড দ্য সিটি’ তার প্রমাণ। আন্তর্জাতিক ডাবলিন সাহিত্য পুরস্কারজয়ী উপন্যাস মাই নেম ইজ রেড রহস্য, রোমান্স ও দার্শনিক ধাঁধার এক অসামান্য মিশ্রণ। প্রেক্ষাপট ষোল শতকের ইস্তাম্বুল। অটোম্যান সম্রাট মোরাত-৩-এর সময়কাল। ১৯৫১ সালের নয়টি তুষারস্নাত দিনের বর্ণনা পাঠকদের আহবান জানাচ্ছে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মধ্যে বিদ্যমান স্নায়ু যুদ্ধের অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য। ২৪টি ভাষায় অনূদিত এ উপন্যাস তুরস্কের ইতিহাসকে নতুনভাবে জানার সুযোগ করে দিয়েছে। অন্যদিকে, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার নিখাদ বর্ণনা উপস্থাপিত হয়েছে ইস্তাম্বুল : দি মেমোরিজ অ্যান্ড দ্য সিটি উপন্যাসে। পামুকের নিজের জীবনে ঘটে যাওয়া ও দেখা ছয় মাসের বর্ণনার সমষ্টি এ উপন্যাস। ব্যক্তিগত জীবনে তাঁর স্ত্রীর সাথে ছাড়াছাড়ি, বাবার মৃত্যু, চাকুরি ক্ষেত্রে সমস্যা—ইত্যাকার নানাবিধ ঘটনার স্মৃতিচারণামূলক আখ্যান এই ইস্তাম্বুল উপন্যাস। পামুকের ভাষায়—
‘দুঃখ, ক্লেদ, না পাওয়ার বেদনা, সর্বোপরি হতাশায় পেয়ে বসেছিল আমায়। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য আমি লিখেছি। প্রায় প্রতিদিন খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে ঠান্ডা পানিতে স্নান সেরে ১২ ঘণ্টার মতো কাজ করতাম আমি। স্মৃতি হাতড়িয়ে বেড়াতাম কেবল বইটির সৌন্দর্য যাতে আরও বাড়ে তার জন্য। বাবা মারা গিয়েছিলেন। মা তখনও জীবিত। বাবার মৃত্যুতে মা অত্যন্ত কষ্ট পেয়েছেন। জানি না তখন তার কতটুকু সেবা করতে পেরেছি! এমতাবস্থায়, আমার বইটির সৌন্দর্য বৃদ্ধি করা ছাড়া আর কী উপায় ছিল বলুন!’
বড় লেখক বা চিন্তকদের বেলায় যা ঘটে তা হলো, তাঁরা এক ডুবে সমাজের তলদেশ থেকে মৌলিক বিষয়াবলিকে তুলে নিয়ে আসেন। পামুকও এর ব্যতিক্রম নন। এক এক করে সমাজের মৌলিক সমস্যাসমূহ পামুক তাঁর ডিসকোর্সগুলোতে প্রাধান্য দিয়েছেন। যেমন—স্নো উপন্যাসটিতে তিনি দেখিয়েছেন আধুনিক তুরস্কে বিরাজমান ইসলামবাদ ও পাশ্চাত্যবাদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব। কার্স নামক সীমান্তবর্তী একটি অঞ্চলে এ গল্পের বেড়ে ওঠা। কা একজন উদ্বাস্তু তুর্কি কবি। তুষারময় নগরী কার্সে থাকাকালে কিছু ইসলামপন্থি গোড়া জনসাধারণ, আইনপ্রণেতা ও সেই সাথে কিছু প্রগতিশীল লোকের নানান ঘোর-প্যাঁচে পড়ে যান তিনি। এক সময় বিভিন্ন বিরোধপূর্ণ ঘটনা ও গোঁড়া দ্বান্দ্বিক আদর্শের জের ধরে দুই আদর্শধারী লোকজনের মধ্যেই হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত হয়। বৃহত্তর মানবকল্যাণকে পাশ কাটিয়ে যেসব নোংরা ও গোঁড়া আদর্শসমূহকে আমরা নিজেদের মধ্যে লালন করছি, তার-ই এক বাস্তব চিত্র এ উপন্যাসে চিত্রিত হয়েছে। আর পামুকের স্বীয় কথা বিশ্লেষণ করলে দাঁড়ায়—তিনি তাঁর এ বইয়ে প্রাণশক্তির উত্স খুঁজেছেন রাজনীতির মাঝে, যেমন মাই নেম ইজ রেড-এর বেলায় একই উপাদান অন্বেষণ করেছিলেন শিল্পে অন্তর্নিহিত সাংস্কৃতিক সত্যের মধ্যে। ২০০৪ সালে নিউ ইয়র্ক টাইমস স্নো উপন্যাসটিকে বিশ্বের সেরা দশ উপন্যাসের একটি বলে আখ্যায়িত করে।
গোড়াতেই বলেছি, তিনটি উপন্যাস নিয়ে অল্প বিস্তর আলোচনা করব। সংক্ষেপে যতটুকু সম্ভব করেছি। যাহোক, মোটা দাগে বলতে গেলে পামুক তাঁর লেখায় ইংরেজিতে যাকে বলে Identity Crisis, প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের মূল্যবোধগত দ্বন্দ্ব, আধুনিককালে রক্ষণশীল ও প্রগতিবাদীদের মধ্যকার মৌলিক বিরোধ প্রভৃতি বিষয়সমূহকে প্রাধান্য দিয়েছেন। তবে ইতিহাস-ঐতিহ্যকে মগজ থেকে কোনোভাবে ঝেড়ে ফেলে দেননি। প্রায় সব ক্ষেত্রেই ইতিহাস কিংবা ঐতিহ্যকে করেছেন মূল পুঁজি। এ যাবত্ বিশ্বের ৬০টি ভাষায় পামুকের লেখা অনূদিত হয়েছে। একবার আক্ষেপ করে তিনি বলেছিলেন—লেখালেখির শুরুতে প্রায় ২০ বছর আমার কোনো বই ভিন্ন কোনো ভাষায় অনূদিত হয়নি। আর যেহেতু ইংরেজি ভাষা পৃথিবীতে বহুল প্রচলিত, তাই আধুনিক সময়ে যেকোনো লেখকের বই অন্তত ইংরেজিতে অনুবাদ হওয়া দরকার। এতে করে একজনের লেখা বিশ্বব্যাপী পাঠকদের গোচরে আসে। শেষকথা, পামুকের মতো বড় মাপের একজন লেখককে নিয়ে লিখতে যেয়ে সত্যিই নতুন অনেক কিছু জানলাম। আমার এই কথার সত্যতা পামুক-প্রিয় পাঠকরা নিশ্চয় টের পাচ্ছেন।
