সিমাস হিনির কবিতা

আপডেট : ০৩ অক্টোবর ২০১৩, ১৯:০৪
১৯৯৫ সালে নোবেলজয়ী আইরিশ কবি সিমাস হিনির কবিতায় ল্যান্ডস্কেপ, ইতিহাস, ঐতিহ্য আর সমগ্র জনপদ উঠে এসেছে। নিজের জন্মভূমি, জনপদ আর ভূদৃশ্যকে এত চমত্কারভাবে তিনি তুলে এনেছেন যে, সমকালের অন্য কোনো আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতিমান কবির রচনায় সেটা খুঁজে পাওয়া যাবে না। আধুনিক কবিতায় এভাবেই হিনি যুক্ত করেছেন ভিন্ন মাত্রা। শুধু নাগরিক মরবিডিটি, নির্বেদ কিংবা নৈঃসঙ্গ্য নয়, গ্রামজীবনের আধুনিক ভাষ্য রচনা করেও যে আধুনিক কবির শিরোপা অর্জন করা যায়, হিনির কবিতাসমগ্র তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। উপদ্বীপ যখন তোমার কিছু বলবার থাকবে না, তখন সারাদিন ধরে সমস্ত উপদ্বীপ জুড়ে তুমি শুধু গাড়ি চালাবে রানওয়ের মতো অবারিত বিস্তৃত আকাশ, যেখানে পৌঁছুবে সেই জায়গাটা এখনও চিহ্নিত করা যায়নি ফলে, কোথাও পৌঁছুনো হবে না তোমার। তবে যতদূর পার পথটা পেরিয়ে যেও, যদিও ওই প্রান্ত জুড়ে মাটি ধসে ধসে পড়ছে গোধূলি বেলায় দিগন্ত নিচু হয়ে পান করছে সমুদ্র আর পাহাড়, চষা খেত গিলে খাচ্ছে শাদা চুনকাম করা দেয়াল ঠিক এরকম একটা সময়ে আবার তুমি আঁধারে ডুবে গেলে এবার স্মরণ কর, ঝলমলে সেই তটভূমি আর ছায়াচ্ছন্ন ভাসমান কাঠের গুঁড়ির কথা আরো আছে, সেই যে পাথর, শ্রমিকেরা ছেঁড়া কম্বলের মতো তাকে টুকরো টুকরো করে ভাঙছে তো ভাঙছেই, পা-ভর দেওয়া পাখি এরই মাঝে নিজেদের পায়ের ওপর ভর দিয়ে তিরতির করে কাঁপছে, কুয়াশা এড়িয়ে এই দ্বীপ নিজের পিঠেই নিজেকে নিয়ে কোথায় যেন চলে যাচ্ছে এবার তুমি গাড়ি ঘুরিয়ে বাড়ি ফিরে এসো, যদিও তোমার ঠিক বলার মতো তেমন কোনো কথা নেই তুমি শুধু সমস্ত ভূদৃশ্যকে খুলে খুলে দেখাতে পার আসলে এরকমই হয় : বস্তুপুঞ্জ তার নিজের আকার নিয়েই স্বচ্ছ থাকে জল আর জমি তাদের সবটা উজাড় করে দেয়। স্বপ্ন আমার হাতে একটা নিড়ানি এর মাথাটা বেশ ভারী কামারশালায় হাতুড়ি পিটিয়ে পিটিয়ে বানানো আমি এটা দিয়ে খড়কুটো কাটছি আর জড়ো করছি খড়ের ছোট ছোট স্তূপ দেখতে হয়েছে যেন এক-একটা টেলিগ্রাফের খুঁটির মতো। আমার জামার লম্বা হাতা দুটো এখন গোটানো এদেরই ফাঁক গলে ঠান্ডা হিম বাতাস আমার দুবাহু ছুঁয়ে সরে সরে যাচ্ছে যখনি আমি নিড়ানির ফলাটা ঘুরিয়ে মাটি ঘেঁষে কোপ বসাচ্ছি তখনি হঠাত্ সব যেন পণ্ডশ্রম হয়ে গেল খড়ের গাদাটা তছনছ করে ভেঙে পড়ল। নিড়ানিটা আরেকবার চালাতেই দেখি এর ভারী ধারালো ফলায় গেঁথে আছে একজন মানুষের কাটা মুণ্ডু সংবিত্ ফিরে পাবার আগেই আমি শুনতে পেলাম মুণ্ডুটার কপালের হাড়ের মাঝে গিয়ে ইস্পাত থমকে আছে। কামারশালা আমি যেটা জানি সেটা হলো অন্ধকারের ভেতর একটা দরোজা আছে। বাইরে পুরোনো লোহার গোল চাকতি আর তার ভেতরকার লৌহদণ্ড থেকে ঝরে পড়ছে মরিচার গুঁড়ো আরো গভীরে হাতুড়ির ছোট ছোট আঘাতে তৈরি হচ্ছে অগ্নিবলয় তৈরি হচ্ছে ঝিলিক দেওয়া অনির্দেশ্য ধারণাতীত স্ফুলিঙ্গের উড়ন্ত লেজ অথবা পানিতে ডোবানো নতুন জুতো পায়ে দিলে শক্ত হয়ে যেমন একধরনের হিসহিস শব্দ হয়, ঠিক সেরকমই শব্দ হচ্ছে। কামারের হাপরটা মাঝখানে কোথাও হয়তো আছে রূপকথার একশিংঅলা ঘোড়ার মতো তার হয়তো শিং গজিয়েছে কামারশালার ভেতরেই ঘোড়াটা স্থির হয়ে আছে : বদলে গিয়ে ওর ভেতরেই নিজের মতো আকার নিচ্ছে আর গান গাইছে। কখনো আবার হয়তো চামড়ার পোশাক পরছে, নাকে গজাচ্ছে চুল অগ্নিকুণ্ডের গা ঘেঁষে ঘেঁষে শব্দ করে বাইরে চলে আসছে আর ঠনঠন শব্দে তার খুরগুলো বেজে উঠছে সার বেঁধে এভাবেই ঘোঁত্ ঘোঁত্ শব্দ করে ভেতরে ছুটে চলেছে। সেই সঙ্গে থেকে থেকে প্রচণ্ড শব্দ হচ্ছে, ঘটছে অগ্নিবিচ্ছুরণ এভাবেই আসলে সবকিছু ঘটে লোহাকে হঠাতে হলে হাপরের কাছেই আমাদের যেতে হবে। কবিতা প্রেম, আমি তোমার জন্যে পরিশুদ্ধ করে যাব হে শিশু তুমি অনেক কষ্ট করে আমার মস্তিষ্কের মধ্যে ঢুকে পড়েছো ঘাসে ঘাসে আচ্ছাদিত মাটির চাঁই কেটে স্তূপ না-করা অব্দি ভারী একটা কোদাল দিয়ে তুমি খুঁড়েই চলেছো অথবা গভীর কোনো নালা দিয়ে বইয়ে দিচ্ছ গোবর, বালি আর কাদার স্রোতধারা। বছরে বছরে আমি দীর্ঘ একটা বাগানে বীজ বুনে চলেছি। চাপ চাপ মাটি দেয়াল তৈরির জন্যে আমি তুলে আনছি এসবই করছি বীজ বোনার জন্যে আর মুরগিরা যাতে শস্যের দানা খুঁটে খুঁটে খেতে পারে, সেই লক্ষ্যে। প্রতি বছর, এইসব করতে করতে মাটির স্তূপ একদিন ভেঙে পড়তে পারে। অথবা আমি মহানন্দে টক দইয়ের ঝাপটা তুলে বহমান ওই নালার ভেতর দিয়ে বইয়ে দিতে পারি কিন্তু আমার কাদার দুর্গ আর কাদায় গোলানো থিকথিক পানি আসন্ন শরত্-বৃষ্টির আগেই ঝমঝম করে ঝরে পড়তে পারে। প্রেম, এই শিশুর মধ্য দিয়ে তুমি আমার কাছে পরিশুদ্ধ হতে পার প্রেমের এই ছোট ছোট নানা সীমাবদ্ধতা দিয়ে কত কী যে ভাঙতে পারি আমরা। নতুন এই গণ্ডির ভেতরেই এখন পৃথিবীকে নানাভাবে সাজাও বৃত্তটাকে বানাও চতুর্ভুজ; বানাও চারটি দেয়াল আর একটা আঙটি।