১৯৭৬ সাল থেকে সমুদ্রগুপ্তের সাথে পরিচয়। যশোর উন্মেষের সদস্য হিসেবে নিয়মিত সাহিত্য আসরে যোগদান করতাম। তখন ঢাকার কবিদের নাম ও কবিতার সঙ্গে পরিচিত হতে শুরু করেছি মাত্র। উন্মেষের দুজন কবির নামের সাথে পরিচয় ঘটে—একজন সমুদ্রগুপ্ত অন্যজন মতিন বৈরাগী। কিছু পরে মুনীর সিরাজ এবং কাজী মনজুর। উন্মেষের মূল ব্যক্তি ছিলেন মহসিন শস্ত্রপাণি। ১৯৭৭ সালে প্রকাশ পেলো সমুদ্রগুপ্তের ‘রোদ ঝলসানো মুখ’ কাব্যগ্রন্থ। অদ্ভুত সুন্দর মলাট। লালচে রংয়ের লম্বা রেখা বিশিষ্ট বইটি কিনেছিলাম উন্মেষ থেকে। প্রায় একই সাথে বেরিয়েছিল মতিন বৈরাগীর ‘বিষণ্ন প্রহরে দ্বিধাহীন’। কিন্তু সমুদ্রগুপ্ত হয়ে উঠেছিলেন আমার প্রিয়। তাঁর অনেক কবিতা আমার মুখস্থ হয়ে গেল। সামাজিক দায়বদ্ধতা, ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধাচারণ, শোষণ ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে কবিতা যে একটা মারাত্মক অস্ত্র তা সমুদ্রগুপ্তের কবিতায় খুঁজে পেয়েছিলাম। একটা ছোট্ট কবিতা কিন্তু কী মনস্তাত্ত্বিক— ‘চমত্কার তিল দেখে হাত দিয়ে ছুঁতে যেতেই/ তোমার গাল থেকে উড়ে গেলো মাছি।’ কবিতার নাম যদ্দুর মনে পড়ে—বিভ্রম। সমুদ্রগুপ্ত আমাদের সমাজের মেকিত্ব আঙুল দিয়ে দেখাতে চেয়েছিলেন। কখনো নিজের অপছন্দের কোনো কিছুর সাথে আপোস করেননি। অনেক দারিদ্র্য সহ্য করেও মাথা উঁচু করে বাঁচতে চেয়েছেন। বাংলাদেশকে স্বাধীনতা পরবর্তীকালে এক অস্থির সাঁকো পার হতে হয়েছে। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা, আন্তর্জাতিক চক্রান্ত—সব মিলে সাধারণ মানুষ তার স্বদেশকে প্রতিবাদহীন মৃত পশুর মতো দেখছিল। কবি সমুদ্রগুপ্ত তাঁর একটি ছোট্ট কবিতায় লিখলেন—‘রাস্তার মধ্যিখানে শুয়ে আছে নির্বিকার একটি কুকুর/ গাড়ি ঘোড়া ছুটে যাচ্ছে এদিক ওদিক পাশকেটে কুকুরের মাথার ছায়ার/ পৃথিবীর রাজপথে শুয়ে থাকা/ এরকম কুকুরের লাশ যেন বাংলাদেশ।’ সুতীব্র চিত্কারে তিনি জানান দিতে চেয়েছেন, এই হচ্ছে ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশ। বালাদেশ কখনো মা কখনো প্রিয়তম নারী।
কী অদ্ভুত আগ্রহ নিয়ে দীর্ঘদিন অর্থাত্ আশির দশক পর্যন্ত পাঠ করেছি সমুদ্রগুপ্তের কবিতা। ‘ভালোবাসার ভাষা’ এক চমত্কার গীতিময়তা দেয় ‘দিনের পরে সন্ধ্যা যেমন আসে/ ঠিক সেরকম তোমার কাছে/ আমার যাওয়া আসা/ চোখের মধ্যে সাগর ধরে রাখো/ আমার শুধু আকাশ হয়ে/ মুখটা দেখে আসা/ ঠিক আছে না বদলে গেছে/ ভালোবাসার ভাষা’। নিজের মা মাতৃভূমিকে হূদয় দিয়ে উপলব্ধি করতে চেয়েছেন সমুদ্রগুপ্ত। কৃষক শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের কাছে দায়বদ্ধতার উচ্চারণ। কবিতা শুধু সৌখিন মজদুরী নয় তার আছে সমাজের ও মানুষের প্রতি দায়। ‘পথে প্রবাসে’ গ্রন্থে অন্নদা শঙ্কর রায় লিখেছেন—তিনি এবং তাঁর বন্ধু গিয়েছিলেন ফ্রান্সে রমা রঁলার সাথে দেখা করতে। রমা রঁলার সাথে অনেক আলাপ, মাঝখানে তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, কবিতার পাঠক কমে যাচ্ছে কেন? রমা রঁলা বললেন—‘মানুষের সুখ দুঃখের কথা কবিতায় থাকে না বলে।’ একার্থে তা-ই—এখনো আমরা রবীন্দ্রনাথ নজরুল সুকান্তকে পাঠ করি—কারণ তাঁদের লেখায় আমাদের সুখ দুঃখ আনন্দ-বেদনা বিরহের কথা পাই। অধুনা অনেক কবির কবিতায় শুধু শিল্পের কসরত। পাঠক বুঝুক আর না বুঝুক তিনি লিখে যাচ্ছেন। এই দায়হীনতা কবিতাকে পাঠক থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে। ওয়াল্ট হুইটম্যান আমেরিকার জাতীয় কবি। কবিতা সম্পর্কে তাঁর একটা চমত্কার কথা—‘কবিকে প্রতিটি শব্দে রক্ত ঝরাতে হয়’। আমরা এখন কোনো কবির কবিতায় কি রক্ত ঝরতে দেখি, কোনো কবির কবিতায় আগুন ঝরা অক্ষর পাই? সমুদ্রগুপ্ত মানুষ এবং তার অধিকার স্বদেশ ও স্বাধীনতা এই বাক্যবন্ধে অটল ও অবিচল ছিলেন—তাঁর পোস্টার কবিতায় পাই—‘আঘাত জমাও বুকে, যেনো/ পাথরের মতো জমে ওঠে/ রক্ত দাও যৌবনের, রক্তেই/ স্বাধীনতার পুষ্প ফোটে’।
রক্তেই স্বাধীনতার পুষ্প ফোটে এতে সন্দেহ নেই। যে জাতি তার ভাষাকে মুক্তি দিতে পারে না তারা কী করে স্বাধীন হবে? আমরাতো ভাষাকে মুক্তি দিয়েছি। এদেশের কবি-শিল্পীরা জীবনের বিনিময়ে অর্জিত ভাষায় লেখে আর ছবি আঁকে। আমরা যখন কামরুলের তিনকন্যা দেখি, মনে পড়ে সমুদ্রগুপ্তের ‘মাত্রাবর্ণ’ কবিতার কথা—‘ভালোবাসার যাত্রা/ ঠিক রাখাটাই কথা/ কারণ এর সবকটি অক্ষরই/ মাত্রাবর্ণ। তিনকন্যার যে মাত্রা তা যেন ভালোবাসার। প্রকৃতি ও জীবন জ্যামিতিক মাত্রায় বিন্যস্ত। একজন কবি জীবন থেকে প্রকৃতি এবং প্রকৃতি থেকে জীবনে দৌড়ে বেড়ান। সমুদ্রগুপ্ত মানুষ ও প্রকৃতিকে একটি রেখায় আনতে চেয়েছিলেন। সাম্যবাদী সমাজ ছিল তাঁর স্বপ্ন। ‘রোদ ঝলসানো মুখের উত্সর্গপত্রে কবি লেখেন—‘যে দেশের মাটির বুকে/ শুয়ে আছেন আমার বা’জান/ সে দেশের মাটির মাঠের মানুষ ন্যায় যুদ্ধরত/ সুনিশ্চিত তাদের বিজয়/ আমিয়ো বিশ্বাস করি তাহাদেরই মতো।’ এক সাম্যবাদী সমাজ বিনির্মাণে বিশ্বের সব মহত্ কবিরা সংগ্রামশীল। লুই অরাগঁ, লোরকা, নাজিম হিকমত, হোসে মার্তি, পাবলো নেরুদা, নজরুল, সুকান্ত, সুভাষ—এইসব নক্ষত্রের পাশে আমি অনায়াসে সমুদ্রগুপ্তের নাম লিখে দিতে চাই। আরেক বিপ্লবী কবি মায়াকোভস্কি যখন বলেন—‘ইয়া গোইয়া’ এই চিত্কারের সমধ্বনি তোলে সমুদ্রগুপ্তের কবিতা—
‘তারার আলোর নীচে আধপাকা ধানগুলো
ঠাঠা করে হেসে ওঠে
ধান বলে
আমি তার আমার শরীরে যার ভালোবাসা আছে
আমি তার আমার হূদয়ে যার রক্ত চোয়া ঘাম আছে
বেদখলী শত্রুর দিকে ট্রিগার টিপতে টিপতে
তর্জনীতে যার
কড়া পড়ে গেছে
আমার মাথার শিষের মতো অজস্র অগণিত
বুলেটের মালা যার ঝুলছে গলায় এবং
আঙুলে ট্রিগার আমি তার, আমি তার
আধুনিকতার আন্দোলনে ত্রিশের কবিরা যখন নন্দনচর্চায় ব্যস্ত তখন সারা পৃথিবীতে বিপ্লবী কবিরা ফ্যাসিস্টদের বিরুদ্ধে লড়ছে। সে লড়াই আজও শেষ হয়নি। হবে না। শোষক এবং শোষিত এই দুটি শ্রেণী যতদিন থাকবে ততদিন সমুদ্রগুপ্তের রোদ ঝলসানো মুখের মানুষেরা পৃথিবীতে অন্যায় ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে চিত্কার করে উঠবে—‘আমাদের ধমনীতে জ্বলিতেছে ক্রোধ’। ক্রোধ সংবরণ করতে দেখিনি সমুদ্র দা-কে। বোদলেয়ার বলেছিলেন, যার ক্রোধ নেই সে কবি নয়। সমুদ্রগুপ্ত ক্রোধী এবং দ্রোহী। বড় ভালোবেসে বাংলা ১৪০৪ সালে সমুদ্রগুপ্ত বাংলা একাডেমীর বইমেলায় আমাকে লিখে দিয়েছিলেন তাঁর ‘সাতসমুদ্র’ গ্রন্থটি। লিখেছিলেন প্রিয় স্টালিনকে। হ্যাঁ আমিতো তাঁর প্রিয়ই ছিলাম। তিনি মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছিলেন ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে। দেখতে গিয়েছিলাম। তখন তিনি কথা বলছিলেন। আমাকে দেখে বড় আনন্দিত হলেন। বললেন—স্টালিন, আমাকে একটা কবিতার লাইন শোনাবেন। আমি কোনো কবিতার লাইন শোনাইনি। বলেছিলাম রাইনের মারিয়া রিলকের একটা কথা—আমরা তোমাকে ভালোবাসি চিরদিনের জন্য—এমনকি তারপরেও।
