মানব জগত্ রেখার বাঁধনে বাঁধা। গাছপালা, জীবজন্তু সকলই আপন আপন রেখার সত্তায় প্রত্যক্ষ হয়ে ওঠে। রেখা ও রংয়ের মিতালীতেই জগতের সৃষ্টি। এই সৃষ্টি ও সৃষ্টির জগতে আমরা একান্ত দ্রষ্টারূপে সৃষ্টিকারের সত্তা আবিষ্কার করে আনন্দিত হই। যিনি চিত্রপটে জগত্ তৈরি করেন এবং দেখার আনন্দ দেন, তাঁকে নিয়ে রবীন্দ্রনাথ যথার্থই বলেন—চিত্রকর গান করে না, চিত্রকরের চিত্র বলে, ‘অয়মহং ভোঃ—এই যে আমি’।
তেমনি শিল্পী গৌতম চক্রবর্তী তাঁর একক চিত্রপ্রদর্শনীর শিরোনাম রেখেছেন ‘I am’ বা ‘আমি’। উত্তরার গ্যালারি ‘কায়া’য় অনুষ্ঠিত এই চিত্রপ্রদর্শনীটি চলবে ২৭ সেপ্টেম্বর থেকে ১১ অক্টোবর পর্যন্ত। মোট ৬৮টি শিল্পকর্মের মধ্যে ২৭টি তৈলচিত্র, ৬টি চারকোলের কাজ, ১৫টি জলরং, ১০টি ড্রইং এবং ১০টি সেরিগ্রাফের কাজ প্রদর্শনীতে রয়েছে। দীর্ঘ ষোল বছর অতিক্রান্তের পর এটি তাঁর ৫ম একক চিত্রপ্রদর্শনী। এর আগে দেশে বিদেশে তাঁর আরও ৪টি একক চিত্রপ্রদর্শনী হয়েছে এবং দর্শক কর্তৃক তা প্রশংসিতও হয়েছে। এবারের প্রদর্শনীর শিরোনাম সম্পর্কে বলতে গিয়ে শিল্পী বলেন, ‘‘ছবির সমালোচনা তা পক্ষেই হোক বা বিপক্ষেই হোক তাতেও ‘আমি’র সফলতা বা ব্যর্থতার দায়ভারেও ‘আমি’! ব্যর্থতা আমাকে সামনে এগিয়ে যাবার প্রেরণা দেয়, থেমে যাবার নয়। এটা একটা স্বীকারোক্তি এবং একটা এক্সপেক্টেশন আমার ‘আমি’র কাছে। তবে এই আমি ‘গৌতম’ কে? এই ‘আমি’ আমার অজস্র বন্ধুর নির্মাণ এবং বিনির্মাণ। এই জীবনের তরঙ্গে ওঠানাম ও ঝরে যাওয়ার মধ্যেই জীবনের চলা—আমার সকল বন্ধুদের নিয়ে হাতে হাত ধরে চলা আর এইসব নিয়েই ‘আমি’। স্লো স্পিড শিল্পী গৌতম চক্রবর্তী তাঁর চারপাশের ভালোবাসার বিষয় নিয়ে ‘আমি’র সৃষ্টির জগত্ তৈরি করেন। এই সৃষ্টির মিছিলে হাতি, বেড়াল, মাছ, মোরগ, বৃক্ষ, অর্কিড, লতাগুল্ম—সব ভিড় করে। আর আছে কিছু আমাদের অতিপরিচিত ভালোলাগার আইকনিক ফিগার। যেমন—মাদার তেরেসা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ইত্যাদি। প্রথমেই আলোচনা করতে হয় তাঁর মাদার তেরেসাকে নিয়ে ৩৫, ৩৬, ৩৭ শীর্ষক ছবিগুলোর কথা। তিনি একটি ছবিতেও মাদার তেরেসার মুখাবয়ব স্পষ্ট আঁকেননি। শুভ্র সফেদ শাড়িতে শুধু পাড় দিয়েই মাদার তেরেসাকে আঁকেন এবং বাজিমাত করেন। প্রতীকী এ চিত্রে মাদার তেরেসাকে নিজের অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে ধারণ করেন। যেমন—মাদার তেরেসা সর্বত্রই ধারণ করতেন যিশুকে বা ত্রাণকর্তাকে। কুষ্ঠ নথর জীবের সেবার নামে তিনি পরোক্ষভাবে ঈশ্বরকেই সেবা করতেন। শিল্পী তাঁর ধ্যান দিয়ে পবিত্র শাড়িটিকেই আইকনিক আইডল হিসেবে আঁকেন; তাঁর মুখশ্রী নয়। তেমনি টেগোর ১৬, ১৭, ১৪, ১৫ শীর্ষক ছবিতে শুভ্র কেশবিন্যাসেই রবীন্দ্রনাথকে প্রতীকী রূপ দেন। শিল্পীর আরেকটি প্রিয় বিষয় অতি চেনা জীবজন্তু যা তাঁর একান্তই নিজস্ব শৈলীতে চিত্রপটে বিদ্যমান। দীর্ঘদিন রেখা ও রংয়ের বোঝাপড়ায় তিনি এই শৈলী নির্মাণ করেন। বিড়াল, হাতি তাঁর একটি প্রিয় বিষয়। তবে শিল্পী এখানে সচেষ্ট থাকেন চিত্রে দেশীয় উপাদান মেশাতে। তেমনি একটি সার্থক চিত্রকর্ম হচ্ছে—ক্যাট ৯৭। সেলুয়েট এই বিড়ালটির পাশ্চাতে গাঢ় হলুদাভ আকাশ। জমিনে ক্রস চিহ্ন দিয়ে বাঁশবেড়ার আদল তৈরি করেন। দেশীয় ঘরবাড়ির বাঁশবেড়া চিত্রে চমত্কার ডিজাইনের অনুষঙ্গ হয়ে যায়। রাগী, কুিসত, কপট, ভণ্ড বেড়াল নিয়ে যেমন তিনি নিরীক্ষা করেন, তেমনি শক্তির প্রতীক হাতিকে নিয়েও নানান নিরীক্ষায় সচেষ্ট হতে দেখি। হাতি আমাদের উপমহাদেশের ডিজাইনের আইকন হিসেবে বহুল চর্চিত। বিচিত্র এই হাতির শুঁড়, কান, দাঁত, রংয়ের সুরের ঐকতানে নিজস্ব ঢংয়ে বিভিন্নভাবে চিত্রপটে আবদ্ধ করেন। আমরা দেখে অনুরণিত হই। মিনিয়েচার অঙ্কনে দক্ষ এই শিল্পী—সমুদ্র সৈকত, স্বাধীনতা শীর্ষক ছবিগুলোও অত্যন্ত দক্ষতার সাথে ফুটিয়ে তোলেন। রং ও রেখার মায়াজালে দর্শকদের আবদ্ধ করেন বারংবার। এক টুকরো পাথর, শামুক, বেড়াল, হাতি, কাটা গাছ, কলাগাছ ও বুড়ি যা-ই হোক না কেন, তা-ই যেন অসীমকে স্পর্শ করে। আমাদের মন আনন্দিত হয়ে বলে ওঠে—‘অয়মহং ভোঃ’।
