হেরমান হেসের গল্প

নতুন জীবনে প্রবেশ

আপডেট : ০৩ অক্টোবর ২০১৩, ১৯:০৫
আমার জীবনে, যেমন অন্যসব মানুষের জীবনে থাকে একটা সংকট, শাশ্বত থেকে সুনির্দিষ্ট কোনো কিছুতে বদলে যাওয়ার একটা ভয়-লাগা ও অন্ধকার অবস্থান, বিভ্রান্তি ও নিসঃঙ্গতা, বর্ণনা-অযোগ্য এক অসারতা ও শূন্যতাবোধ, যে কিনা এক অনুপম সন্ধ্যা আমার সামনে নিয়ে এসেছিল আকাশের অসংখ্য নতুন তারায় সাজিয়ে, সত্তার ভেতর নতুন এক দৃষ্টি এনে দিয়েছিল, তাকে নিয়ে একটু ভাবি। কাঁপতে ছিলাম আমি, যেতে ছিলাম যৌবনের ওই দিনগুলোর ধ্বংসোন্মুখ পৃথিবীর ভেতর দিয়ে, বিচূর্ণিত ভাবনাগুলো পেরিয়ে, ও ঘূর্ণিনৃত্যমুখর প্রকম্পিত স্বপ্নগুলো ছাড়িয়ে, সবকিছু আমি দেখেছিলাম ধুলোয় লুটিয়ে যেতে, এবং বেঁচে থাকায় টেনে দিতে এক সমাপ্তিরেখা। বন্ধুদের দেখেছিলাম, যাদের জানতে চেয়ে কুণ্ঠা এসে গেছিল আমার ভেতর, ভেবেছিলাম যে-সব ভাবনা এই অধুনা, তাকিয়ে দেখেছিলাম ওদের মুখের দিকে, ওরা বেড়ে উঠেছিল অন্য গ্রহ হতে আসা এলিয়েনের মতো, দূরাগত, অনেক বুড়ো, বয়স যেন ওদের একশ বছরেরও বেশি পেরিয়েছে, যেন কখনোই ওরা ছিল না আমার বন্ধু। সবকিছু দূরে সরে গিয়েছিল আমার কাছ থেকে, আমাকে ঘিরে দীর্ঘ দিনের মৃত ও গভীর এক শূন্যতা ও প্রশান্তি তৈরি হয়েছিল খুব দ্রুত। এত বেশি সংলগ্ন আর কিছুই ছিল না আমার কাছে, কেউ ছিল না ভালোবাসার, ছিল না কোনো প্রতিবেশী, জীবন বেড়ে উঠেছিল আমার ভেতর এক দুর্লভ ঘৃণার থরথর অনুভূতি নিয়ে। প্রতিটা পরিমাপ ছিল উপচে পড়া, বর্ণনার অযোগ্য, অধিক পূর্ণ, প্রতিটা বেদিতে ছিল অপবিত্রতার ছোঁয়া; কোনো মিষ্টতা ছিল না কোথাও, আমাকে অসুস্থ করে তুলেছিল এসব, কোনো একটা শিখরও পেছনে ফেলে আসিনি আমি। খাঁটিত্বের প্রতিটা ঔজ্জ্বল্য হয়েছিল ধূসর কালিমালিপ্ত, সুন্দরের প্রতিটা আলিঙ্গন হয়েছিল বিকৃত, পিষ্ট হয়েছিল পায়ের নিচে। আকাঙ্ক্ষার কিছুই ছিল না আমার, দেখার ছিল না কোনো কিছুই, এমনকি ঘৃণার জন্যও ছিল না অবশিষ্ট কোনোকিছু। যা-কিছু তখনো ছিল পবিত্র, নিরাপদ ও শ্রুতিমধুর, এবং সেসব দেখার দৃষ্টি, ও উচ্চারণের স্বর, এর সবই হারিয়ে গেছিল আমার কাছ থেকে। আমার জীবনের সব অভিভাবকেরা পড়েছিল ঘুমিয়ে। সকল বাঁধন হয়েছিল ছিন্ন, অসীম নীলের ওই অসামান্য রাজ্যটা লুটে নেওয়া হয়েছিল আমার সবকটা দিগন্ত হতে। যখন সবকিছু ছিল সম্মোহনযোগ্য, ও ভালোবাসার মতো, দূরে সরে গিয়েছিল সেসব, এবং যখন আমি পরিশ্রান্ত, আমার দারিদ্র্য অনিঃশেষ, ও বঞ্চিত আমি, এক আধ্যাত্মিক পরিভ্রমণে ধ্বংস আমি, জেগে উঠেছিলাম তখন, অথবা নিঃস্বতায় নামিয়ে নিয়েছিলাম আমার চোখ, তুলে ধরেছিলাম প্রসারিত বাহু দুটো, শিকারবিদ্ধ এক অপরাধীর মতো, যে শুধু নিজের ঘরে ঘুমোয় রাতের অন্ধকারে, কোনো ছুটি না নিয়ে, পেছনের দরোজা বন্ধ না করে, অতীতের সব অভ্যাস হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে। কে দেখেছে মেপে ওই একাকিত্বের গভীরতা আমার? কে বলতে পারে, কতটুকু জমিন আছে আমার আত্মঅস্বীকৃতির? কাঁধের ওপর মাথা টলে উঠেছিল আমার যখন তাকিয়েছিলাম নিচে, পাতালসম এক গভীর গহ্বরের অন্ধকারে খুঁজে পাইনি কোনো সমাপ্তিবিন্দু। পথ হারিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছিলাম আত্মঅস্বীকৃত ওই জমিনের ভেতর, যে-পর্যন্ত-না আমার হাঁটুগুলো ভেঙে এসেছিল যন্ত্রণায়, এবং এখনো সম্মুখের পথ আমার ছড়িয়ে আছে নিঃসীম এক সনাতনতায়। তবুও এক দুঃখ-রাত বাঁকা কাস্তের মতো নুয়ে ছিল আমার মাথার ওপর, অভাবিত এক আয়েশ এনে দিয়েছিল আমাকে, ও দিয়েছিল অনাবিল এক ঘুমের সুষমা। ঘুম ও স্বপ্নেরা এসেছিল বন্ধুর মতো, আমার কাছে, এক ঘরে ফেরা মানুষের কাছে, এবং শ্রান্তি দিয়েছিল আমাকে, আমার কাঁধ হতে এক মরণ-বোঝা নামিয়ে দিয়ে। কখনো কি হারিয়ে গেছিলে সমুদ্রে, আর দেখেছিলে তীর হতে এক সাঁতারু ছুটে আসছে তোমার দিকে? কখনো কি সুস্থ হয়ে উঠে আবার ফিরে এসেছিলে মৃত্যু-শয্যা হতে? বুক ভরে নিতে পেরেছিলে বাগানের সবুজ ও সতেজ বাতাসের নির্মল নিঃশ্বাস, এবং অনুভব করেছিলে রক্তের ভেতর নতুন এক জীবনের মধু-উন্মাদনা তোমার? উদ্ধার পাওয়া এক নাবিকের মতো, আরোগ্য ফিরে পাওয়া এক মানুষের মতো, অনুভব করেছিলাম ভালোবাসা ও অনুগ্রহের ঘূর্ণায়মান এক স্রোতধারা, শক্তি, আলো, ও ভালোলাগা ওই রাত্রি, যখন ওটা পরিষ্কার হয়েছিল আমার কাছে, যে এক দুরধিগম্য রহস্য নিচে তাকিয়েছিল আমার দিকে, ওর বন্ধুসুলভ চোখ দুটো নিয়ে। আকাশ ধরা দিয়েছিল একেবারে অন্যভাবে। স্বর্গীয় বিষয়গুলোর অবস্থান ও পুনরাবর্তন প্রবেশ করেছিল পূর্বনির্ধারিত বন্ধুত্বের এক অকৃত্রিম বন্ধনে, আমার জীবনের গভীরতম রন্ধ্রে, এবং সনাতন প্রতিটা বিষয়কে বেঁধে নিয়েছিল এক স্বচ্ছ ও শীতল প্রশান্তি দেয়া কোনো রীতিনীতিতে, ও আমার ভেতরের অজানা কোনো একটা কিছুর সঙ্গে। অনুভব করেছিলাম যে মরুময় কোথাও সোনালি ভিত্তি-প্রস্তর দেয়া এক অবস্থান হতে এক অসাধারণ পুনর্জন্ম হতে চলেছিল আমার, একটা নতুন শক্তি ও কানুন, যার সঙ্গে মিলিয়ে অনুভব করেছিলাম আমার অত্যুজ্জ্বল আনন্দগুলো, সব পুরোনো ও নতুন চিরস্থায়ী হয়ে গেছিল আমার ভেতর, মহত্ ও স্ফটিকস্বচ্ছ ওই অনুকম্পার পর এসবের শেষ হয়েছিল হিতসাধনকারী এক আঁতাতে, সবকিছুর সঙ্গে, এবং বিশ্বের অত্যাশ্চর্য ওইসব অনুষঙ্গের সঙ্গে। ইনসিপিট ভিটা নোভা : নতুন জীবনে প্রবেশ, এক নতুন মানুষ হয়েছি আমি, এখনো এক দৈব আশ্চর্য রয়ে গেছে আমার ভেতর, কখনো প্রত্যক্ষ কখনো পরোক্ষ, পেতে থাকা ও দিতে থাকা, কোষাগারের অমূল্য রত্নরাজি হয়ে, যার মধ্যে সবচেয়ে দামিটা হচ্ছে, সম্ভবত এখনো যা অজানা আমার কাছে। [১৯৬৪ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী হেরমান হেসের জন্ম ১৮৭৭-এ জার্মানির কাল্ভ শহরে। হেসের বাবা ছিলেন একজন মিশনারি। ১৮৯১ সালে ধর্মতত্ত্ব অধ্যয়নের জন্য বিদ্যালয়ে পাঠানো হয় তাঁকে। সাত মাস পর পালিয়ে আসেন সেখান থেকে। ১৮৯২ থেকে ১৮৯৮ পর্যন্ত সময়কালে দু-বছর স্কুলে পড়াশোনা করেন, দেড় বছর ঘড়ি মেরামতির প্রশিক্ষণ নেন, তারপর বছর তিনেক বই ব্যবসার প্রশিক্ষণ নিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯০৪-এ প্রথম উপন্যাস ‘পিটার ক্যামেনঝিন্ড’ সাফল্যের মুখ দেখলে বই ব্যবসা ছেড়ে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি করে স্বাধীনভাবে জীবিকা নির্বাহ শুরু করেন। ১৯১১ সালে ভারত ভ্রমণ করেন। ওই অভিজ্ঞতা নিয়ে তাঁর বিখ্যাত বই ‘সিদ্ধার্থ’ ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। ১৯১২ সাল থেকে সুইজারল্যান্ডে বসবাস শুরু করেন। ১৯৬২ সালে দেহাবসান হয় অসাধারণ এই সাহিত্য-স্রষ্ঠার। অনূদিত ছোট্ট এই গল্পটাতে রয়েছে অপূর্ব এক কাব্যিক ব্যঞ্জনা। প্রথম জীবনে কবি হতে চেয়েছিলেন তিনি। তাঁর বিখ্যাত কবিতাগ্রন্থ ‘রোম্যান্টিক সঙ্স’। এ গল্পটাতে অনন্য এক রোম্যান্টিকতার আবহ পাওয়া যায়।]