স্বাধীনতা আমার ভালো লাগে না
প্রভাষ আমিন
প্রচ্ছদ :ধ্রুব এষ
প্রকাশক :ঐতিহ্য
প্রকাশকাল :২০১৩
মূল্য :তিনশত পঁচাত্তর টাকা
প্রত্যেক মানুষের দুই কাঁধে দুজন ফেরেশতা আছেন। কেরামান আর কাতেবিন। তারা মানুষের ভালো-মন্দের সবকিছু প্রতিদিন লিখে যাচ্ছেন। আল্লাহর এই নিষ্ঠাবান কেরানিদের মতো নুরানি ও রুহানি নয় মানুষ। তাদের আছে ক্ষুধা-তৃষ্ণা-কামের মতো জাগতিক নানান রিপু। তারপরও তারা লিপিকার, কেরানি, কবি, লেখক কিংবা সাংবাদিক। তাদের মধ্যে লেখকরাই কেবল মর্যাদা পেয়েছিলেন ‘ঈশ্বরের কেরানি’র। ঈশ্বর নন, সে মর্যাদা দিয়েছিলেন আরেক লেখক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়। যে কারণে তা পক্ষপাতদুষ্ট হতেও পারে। ঈশ্বরের কেরানি তো পাওয়া গেল, রাষ্ট্র-রাজনীতি-সমাজ-সভ্যতা তথা সমসাময়িক বাস্তবতার কেরানি কে? বিভূতি দা থাকলে জিজ্ঞেস করা যেত। অনুমান করি সাংবাদিকরাই হবেন। স্যার আর্থার কোনান ডয়েলের মহা-জনপ্রিয় ফ্যান্টাসি অ্যাডভেঞ্চার ‘দ্য লস্ট ওয়ার্ল্ড’-এর সাংবাদিক চরিত্র এডওয়ার্ড ম্যালোনকে যারা জানেন তারা নিশ্চয়ই আমার সঙ্গে একমত হবেন।
‘স্বাধীনতা আমার ভালো লাগে না’ গ্রন্থের লেখক প্রভাষ আমিনও সাংবাদিক হিসেবে উপর্যুক্ত কেরানি গোত্রীয়। এই কেরানিদের নিয়তি হচ্ছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সমকালেই তাঁদের আবেদন সীমাবদ্ধ। তবে সান্ত্বনাও একটা আছে, সমকালে তাঁরা কমবেশি নন্দিত। কোনান ডয়েল তো আছেনই, কখনো কখনো মুনতাসির মামুনের মতো গবেষকরাও তাঁদের ভবিষ্যতে ডেকে নেন। এই গ্রন্থের সূত্রে আগামীদিনের গবেষকরা একুশ শতকে বাংলাদেশের সংবাদ ও সাময়িকপত্রের গবেষণায় তথ্য-তালাশ ও দলিল উপস্থাপনের খাতিরে একজন সাক্ষী হিসেবে কালের ধুলা ও জঞ্জালের ভেতর থেকে একদিন হয়তো প্রভাষ আমিনকেও টেনে বের করবেন।
ছোট ছোট অনেকগুলো লেখা নিয়ে ‘স্বাধীনতা আমার ভালো লাগে না’। ২০০১ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত প্রভাষ আমিনের লেখার একটা সংগ্রহ এই গ্রন্থ। প্রতিদিনের উল্লেখযোগ্য যেসব ঘটনা সংবাদ হয়ে ওঠে, তারই এক ধরনের বিশ্লেষণ এই গ্রন্থের রচনাগুলো। ছোট ছোট রচনায় প্রভাষ আমিন মূলত তুলে ধরেছেন ২০০৮ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে ঘটা উল্লেখযোগ্য ঘটনা ও সংবাদ এবং ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আসা মতামত-সিদ্ধান্ত-প্রতিক্রিয়ার প্রতিক্রিয়া। গ্রন্থের বেশির ভাগ রচনাই ওই ছয় বছরের। এই গ্রন্থে আত্মহত্যাকারী কবি সাংবাদিক মিনার মাহমুদকে নিয়ে স্মৃতি, সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত টিভি সাংবাদিক মিশুক মুনির ও চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব তারেক মাসুদকে স্মরণ এবং প্রভাষ আমিনের বাবার মৃত্যু নিয়ে লেখা আছে। আছে নিজের দুই দশকের সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা দিয়ে গত দুই দশকের সাংবাদিকতার সংক্ষিপ্ত মূল্যায়ন। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, সাংবাদিকের মানবিক-সামাজিক দায়বোধ এবং মফস্বল সাংবাদিকতা নিয়েও আছে কয়েকটি লেখা। একটা বড় অংশ জুড়ে আছে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, জঙ্গিবাদ, সাম্প্রদায়িকতা, দায়মুক্তি অধ্যাদেশ, ওয়ান ইলেভেন, ক্রসফায়ার, পুলিশি হয়রানি নিয়ে আলোচনা। এসবের সূত্রে এসেছে সরকার, রাষ্ট্র, সমাজ, রাজনীতি, নেতানেত্রীদের কথাবার্তা, আচরণ ও সিদ্ধান্তের নানা দিক নিয়ে আলোচনা। আছে ক্রিকেটার আশরাফুলের খেলা আর অজয় চক্রবর্তীর গায়কি নিয়েও কথাবার্তা। এসব ইস্যুর সঙ্গে মাখামাখি হয়ে আছে প্রভাষ আমিনের জীবন, সাংবাদিকতা ও যাপনের নানা অনুষঙ্গ।
যে বিশ্লেষণ সংবাদে দেওয়ার তেমন সুযোগ নেই তা আছে এই গ্রন্থে। সংবাদ একজন সাংবাদিক বা এক সাধারণ মানুষের মধ্যে কী প্রভাব ফেলে, কী প্রতিক্রিয়া তৈরি করে, কীভাবে আলোড়িত করে তা জানার জন্য সাংবাদিক এবং সমাজ-মনস্তাত্ত্বিকদের এই গ্রন্থ কাজে লাগতে পারে। গ্রন্থের লেখাগুলোতে প্রভাষ আমিন সাংবাদিকের চেয়েও বেশি সংবাদ-সচেতন একজন সাধারণ মানুষ। পাঠক পড়তে গিয়ে কখনোই নিজেকে ইনফিরিয়র ভাবার সুযোগ পাবে না। মনে হবে, তার মতো সাধারণ একজন প্রতিদিনের ঘটনা নিয়ে, প্রতিদিনের জীবনযাপনের অনুষঙ্গ নিয়ে পাণ্ডিত্য বিবর্জিত অনুভূতি ও প্রতিক্রিয়া শেয়ার করছে অসাধারণ পারঙ্গমতায়, যেখানে কাণ্ডজ্ঞানই বড় সম্বল। লেখার ধরনে এই ব্যাপারটি না থাকলে এই গ্রন্থে প্রভাষ আমিন যে পরিমাণ ব্যক্তিগত বিষয়-আশয় উঠিয়ে এনেছেন তা আমাদের খারাপ লাগত।
‘স্বাধীনতা আমার ভালো লাগে না’, প্রভাষ আমিনের প্রথম গ্রন্থ। গ্রন্থের নাম শুনলে মনে হতে পারে, কেউ উদ্যত কলম নিয়ে নিজের ইচ্ছা-অনিচ্ছা প্রকাশে যথেচ্ছাচার করেছেন। যথেচ্ছাচার না করলেও গ্রন্থের বিবেচনায় সর্বোচ্চ স্বাধীনতা নিয়েছেন তিনি। গ্রন্থের চরিত্র-বৈশিষ্ট্য ঠিক রাখার তোয়াক্কা না করে দুই মলাটে ঠেসে ঢুকিয়েছেন নানা ধরনের লেখা।
শ্লেষ, ব্যাজস্তুতি, বিদ্রূপ মিশিয়ে খোঁচা দেওয়ার ওস্তাদ প্রভাষ আমিন। গ্রন্থের নাম তো অবশ্যই, লেখাগুলোর শিরোনামেও তা স্পষ্ট। যেমন : স্বাধীনতা আমার ভালো লাগে না, তোমারে বধিবে যে গোকুলে বাড়িছে সে, আমি আর কখনো ক্রসফায়ার নিয়ে লিখব না, ভিক্ষা চাই না মা কুত্তা সামলাও, আকাশের যত তারা পুলিশের তত ধারা, প্লিজ এরশাদকে কেউ স্বৈরাচার বলবেন না।
বাংলাদেশের সাংবাদিকরা সংবাদ হয়তো লেখেন ভালোই। এর বাইরে তাঁদের হাত দিয়ে ভালো লেখা বের হয় না। যাঁরা একই সঙ্গে সাহিত্যিক ও সাংবাদিক তাঁদের কথা বলছি না, বলছি, যাঁরা শুধু সাংবাদিক তাঁদের কথা। সাংবাদিকতার ময়-মুরুব্বি অনেকেই দু-কলম লিখতে গিয়ে কলম ভেঙে ফেলেন কিংবা লেখার আগেই পায়ের ব্যথার অজুহাত তোলেন। এই পেশার জীবিত-মৃত অনেক শ্রদ্ধাভাজনকে কেন শ্রদ্ধা করি তা কেউ জানতে চাইলে এমন একটা গ্রন্থ তুলে ধরতে পারি না, যেটা দেখিয়ে বলা যায়—এই কারণে শ্রদ্ধা করি। এই অবস্থার মধ্যে তাঁর এই গ্রন্থ নিয়ে প্রভাষ আমিন এক উজ্জ্বল সম্ভাবনা।
