সরকার বদলেছে, কিন্তু বদলাচ্ছে না ইরানের অর্থনীতি। ইরানীরা প্রতিদিনই কোনো না কোনো দুঃসংবাদ শুনছে। রাত পোহালেই বেড়ে যাচ্ছে ভোগ্যপণ্যের দাম। উদাহরণস্বরূপ, ২০১০ সালে রুটির ওপর সরকারের ভর্তুকি উঠে যাওয়ার পর থেকে এর দাম বেড়েছে কমপক্ষে ১৬ গুণ। আহমেদিনেজাদকে অনুসরণ করে হাসান রুহানি সরকারও একই কথা বলছে, দেশের অর্থনীতি খুব একটা খারাপ অবস্থায় নেই। তবে বাস্তব তথ্য হল— যতই অস্বীকার করা হোক, ইরানের অর্থনীতি যে নড়বড়ে অবস্থার দিকে এগোচ্ছে, তা বুঝতে কারোরই বাকি নেই। বিশ্লেষকদের অভিমত, বর্তমান অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতার জন্য পশ্চিমা অবরোধের চেয়ে বেশি দায়ী তারা নিজেরাই। ২০০৫ সালে তেল রাজস্ব রেকর্ড স্তরে উঠা সত্ত্বেও সাবেক প্রেসিডেন্ট আহমেদিনেজাদ গ্রহণ করেছিলেন আমদানিনির্ভর নীতি। সরকারের বিদেশপ্রীতির কারণে অনেক দেশি উত্পাদক বাধ্য হয়েছিলেন ফ্যাক্টরি বন্ধ করে দিতে। যেগুলো এখন পর্যন্ত টিকে আছে সেগুলো চলমান অবরোধের কারণে বর্তমান ফন্দি-ফিকির করে সম্পদকে ভিন্ন কাজে লাগাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। এরই মধ্যে অনেক ফ্যাক্টরি মালিক শ্রমিকদের ছুটি দিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন বিদেশি মুদ্রা ও কাঁচামাল ক্রয় এবং সম্পত্তি কেনাবেচার কাজে। এগুলোর চেয়ে লাভজনক ব্যবসা ইরানে আর নেই।
শিল্পশহর পাকাদাশতে অধিকাংশ ফ্যাক্টরিতে এখন তালা ঝুলছে। অথচ এগুলোর পাশ দিয়েই তুরস্কের পণ্যবাহী ট্রাকগুলো তেহরানের দিকে ছুটে যায় যেনো বিদ্যুতের গতিতে। ৬৩ বছর বয়সী প্রকৌশলী ও শিল্পপতি মানৌশার এসব দেখে আক্ষেপ করেই বলছিলেন, ‘মাত্র এক দশক আগে কোনো কারখানার মালিক হওয়া মানে ছিল নিরাপদ আয়ের সংস্থান। চাকরি সৃষ্টিকারী হিসেবে অন্যরা তাঁকে সমীহের চোখে দেখত। ভাবা হত, তিনি ইরানের ভবিষ্যত্ গড়ছেন। কিন্তু এখনকার পরিস্থিতি পুরোপুরি ভিন্ন। ফ্যাক্টরির মালিক হওয়া মানেই নিশ্চিত আর্থিক ক্ষতি। অনেক শ্রমিককে বিদায় করে দিতে বাধ্য হয়েছি। তাদের কথা চিন্তা করলে খারাপ লাগে। তাদেরকে এ পথে আনার জন্য আমিই দায়ী।’
মানৌশার নিজের পুরো নাম প্রকাশ করতে রাজী হননি, কারণ তিনি পণ্য বিক্রি করেন সরকারি একটি কোম্পানির কাছে। ৬ মাস ধরে সরকারি কোম্পানিটির কাছ থেকে বিল না পাওয়া মানৌশার মনে করেন দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের অবস্থা চরম খারাপ, ‘এ পেশায় আসার জন্য নিজেকে এখন অপরাধী মনে হয়। ফ্যাক্টরি না খুলে জমি, ইমারত কিংবা বিদেশি মুদ্রা কিনলে আমি এবং আমার সকল ব্যবসায়িক অংশীদারই ধনী হয়ে যেতাম।’
সেনা সদস্যসহ অন্য সরকারি কর্মকর্তারাও নিশ্চিন্তে নেই। এলিট রেভুলুশনারি গার্ডের এক সদস্য সম্প্রতি জানিয়েছেন, যথাযথ সময়ে মাসিক ভাতা পাচ্ছেন না তারা। সরকারি কর্মকর্তা এবং আইনপ্রণেতারা চলমান অর্থনৈতিক দুরবস্থার জন্য পশ্চিমা অবরোধকে দূষলেও ইদানিং সুর পাল্টাতে শুরু করেছেন। দেশের অধিকাংশ অর্থনীতিবিদের অভিমত, বর্তমান অবস্থার জন্য শুধুমাত্র পশ্চিমা অবরোধকে দোষ দেয়া মস্ত বড় ভুল। খাদ্য, গ্যাসোলিন এবং অন্যান্য মৌলিক জিনিসপত্রে সরকারের দেয়া উচ্চ ভর্তুকি পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলতে সাহায্য করেছে। অধিক মূল্য দিয়ে বিদেশি পণ্য আমদানি করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে দেশটি। অর্থনীতিতে আগেও সমস্যা ছিল, কিন্তু তীব্রভাবে অনূভূত হচ্ছে অবরোধ আরোপের পর থেকে। জিনিসপত্রের দাম আদৌ কমবে কি-না, এ প্রশ্নের উত্তর ইরানের কেউ দিতে পারছে না।
পরমাণু কর্মসূচির অপরাধে আন্তর্জাতিক অবরোধ এবং সরকারের অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনায় ইরানে মুদ্রাস্ফীতি চরম আকার ধারণ করেছে। দেশের আয়ের প্রধান উত্স গ্যাস ও তেল রপ্তানিকে কমিয়ে ফেলার লক্ষ্যে গৃহীত আন্তর্জাতিক উদ্যোগ দেশটিকে আরো বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছে বলেই বিশ্লেষকদের বিশ্বাস। গত বছর অন্যান্য মুদ্রার বিপরীতে রিয়েল তার মান হারিয়েছিল ৫০ শতাংশ। সেই ধারা এখনো অব্যাহত রয়েছে। তার সঙ্গে ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়ছে লাফিয়ে লাফিয়ে। সরকারি হিসেবেই প্রতিবছর জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে ২৫ শতাংশ। অর্থনীতিবিদদের মতে তা আরো অনেক বেশি।
অবরোধের কারণে তেল বিক্রির সক্ষমতা ক্রমেই কমে আসছে ইরানের। যার প্রভাব পড়ছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দেশের খেয়ালি অর্থনৈতিক নীতি। সব মিলিয়ে ইরানের অর্থনীতিতে এখন বিশৃঙ্খল অবস্থা চলছে। নিরূপায় হয়ে সাধারণ লোকজন থেকে শুরু করে ব্যাংক ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সমূহও নিজেদের সুরক্ষিত রাখতে বিকল্প উপায় খুঁজে নিচ্ছে। আলজাহরা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক এ প্রসঙ্গে বলছিলেন, ‘ইরানের রাজধানী তেহরানে পোর্শে গাড়ির আধিপত্য দেখেই বোঝা যায় খারাপ অর্থনীতির মাঝেও কিছু লোক ফায়দা লুটছে। সত্যি বলতে গেলে ভালভাবে বেঁচে থাকার উদ্দেশ্যে প্রত্যেকেই নেমে পড়েছে অতিরিক্ত আয়ের ধান্দায়। ইরানে প্রচুর লোক এখন ফটকা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। এছাড়া কোনো উপায় নেই।’
— ইন্টারন্যাশনাল হেরাল্ড ট্রিবিউন অনুসরণে
