মু খো মু খি
লীনা তাপসি খান। এ দেশের বিশিষ্ট নজরুল সংগীতশিল্পী। নিজের গানের ক্যারিয়ারের এই দীর্ঘ সময়ে অ্যালবামের সংখ্যা কম হলেও নিয়মিতই কাজ করে যাচ্ছেন নজরুলের গান নিয়ে। লালন করছেন নজরুল সত্তাকে। নিজের বর্তমান ব্যস্ততাসহ নজরুলবিষয়ক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন বিনোদন প্রতিদিন-এর সাথে। সাক্ষাত্কার নিয়েছেন রবি হাসান
আপনার বর্তমান ব্যস্ততা প্রসঙ্গে বলুন।
কিছুদিন আগে নর্থ আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটিতে নজরুল চেয়ার প্রতিষ্ঠা করার জন্য একটা প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করেছি। এটা তাদের সপ্তমবারের আয়োজন ছিল। কালচারাল প্রোগ্রামের পাশাপাশি একটি লেকচার প্রোগ্রামও ছিল এই আয়োজনে। দুটোতেই অংশ নিয়েছি। এটা এ বছরের উল্লেখযোগ্য একটি কাজ। তরঙ্গ নামের একটা সংগঠন আছে ক্যালিফোর্নিয়ায়, কাজগুলো মূলত তারাই করছে, আমরাই তাদেরকে সহযোগিতা করছি। সব ওই ইউনিভার্সিটির অডিটোরিয়ামেই হয়। যখন ফান্ড রাইজ হয়ে যাবে, চেয়ার করে ওখানে একটা নজরুল সংগীতের উপর কোর্স করানোর চেষ্টা করব। এর পাশাপাশি কানাডাতেও কিছু অনুষ্ঠান নিয়মিত করছি। এতে গানের বিষয় নিয়ে ওয়ার্কশপও থাকছে।
আপনার মেয়েও এখন গাইছে। তার গান ও গানের ভবিষ্যত্ নিয়ে বলুন।
আমার মেয়ে আল্লাহর রহমতে ভালোই গাইছে, ওর একটা অ্যালবাম বেরিয়েছে। নজরুল প্রেমিক সেও। তার পছন্দমতো কিছু গান করেছে, ব্যতিক্রম কিছু গান।
আমার সৌভাগ্য যে, সে এই প্রজন্মের হওয়ার পরও সংগীতের মূল ধারাটায় কাজ করতে পেরেছে। এমনটা অনেক সময়ই হয় না, কিন্তু আমার মেয়ে নজরুলের গান ভালোবাসে। ব্যতিক্রমী গানগুলো নিয়ে ভালোলাগাটা বেশি। আমার এখন বড় চাওয়া সে যেন এটা নিয়মিত ধরে রাখে।
আপনার কি মনে হয় না যে, এ দেশে রবীন্দ্রসংগীত শিল্পীরা সাংগঠনিকভাবে অনেক বেশি শক্তিশালী। সেই হিসেবে আপনারা পিছিয়ে, এর কারণটা বলুন।
এটা তো অস্বীকার করার বিষয় নয়। কারণ হলো, রবীন্দ্রনাথ তো নজরুলেরও অনেক পুরোনো মানুষ। তার উত্তরসূরি অনেক আগে এসেছে। তারা আগে থেকেই সাংগঠনিক ব্যাপারটার প্রতি জোড় দিয়েছে এবং এর ধারাবাহিকতা রেখেছেন। কিন্তু আমাদের নজরুলের উত্তরসূরি যারা তারা কোনো ধারাবাহিকতার মনোযোগ দেননি, এবং এই ধারাবাহিকতাটা সৃষ্টিই হয়নি। আমাদের যারা উত্তরসূরি ছিলেন, তারা কোনোদিনও সাংগঠনিকভাবে কোনো কিছু করেননি। কিন্তু এই সাংগঠনিকতা যেন আমরা তৈরি করতে পারি এবং এর ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারি এর চেষ্টা চলছে।
আপনার সংগীতের এই দীর্ঘ জীবনে অ্যালবামের সংখ্যা খুবই কম। আমাদের দেশের অডিও শিল্প প্রসঙ্গে বলুন, তারা আপনাদের গান কেমন প্রমোট করে?
সংখ্যাটা কখনোই গুরুত্ব দেয়নি। ’৮১-এ যখন আমি প্রথম শান্তিনিকেতনে যাই, তখন আমার পেছনে অনেক কোম্পানি ঘুরেছে, এখন তো সেই সময় নেই। এখন তো কোনো কোম্পানি নজরুলের গান করতে আসে না। এই বাংলা ওই বাংলা দুই বাংলায়ই একই রকম। যার যার দল-মত অনুযায়ীই কাজ হচ্ছে, কিন্তু এর মধ্যে কোনো ধারাবাহিকতা নেই। কেউ নিজের পয়সায় করছে, কেউ অন্যের পয়সায় করছে। কিন্তু সত্যিকার অর্থে যে সিডি বের করা, সেটা এখন আর নেই। ৭-৮টা অ্যালবাম বের হয়েছে আমার, আমি মনে করি যে, যথেষ্ট হয়েছে। নজরুলের গান এখন করছি শুধু ভালোলাগা, ভালোবাসার জায়গা থেকে। নজরুল-রবীন্দ্রনাথের গানের প্রতি এখন কোম্পানিওয়ালাদের গুরুত্ব নেই।
টিভি চ্যানেলগুলো কতটা সাপোর্ট দেয়?
আমি রিকোয়েস্ট করব যে, যারা মিডিয়া বা চ্যানেলের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তারা যেন এই প্রশ্নটা নিয়ে ভাবেন। কোনো বিষয়ে আধুনিকতা নেই নজরুলের গানে? সারাদিনে ১০ মিনিট নজরুলের জায়গা হয় না? এই প্রশ্নগুলো চ্যানেল কর্তৃপক্ষকে করতে চাই।
স্বীকৃতির ক্ষেত্রে আপনি কতটা সন্তুষ্ট, আপনার প্রাপ্তির কথা বলুন।
গত ৮-১০ বছর ধরে স্বীকৃতির বিষয়টাকে ভেতর থেকে মুছে ফেলেছি। একুশে পদক, স্বাধীনতা পদক দেখার পর থেকে স্বীকৃতির বিষয়টা নিয়ে আর ভাবছি না। কারণ, এ দেশের মানুষের প্রেক্ষাপটে প্রপার মূল্যায়ন হচ্ছে বলে মনে হয় না। বহু সংবর্ধনা পেয়েছি, পাচ্ছি। কিন্তু এই স্বীকৃতিগুলো নিয়ে আর কোনো আগ্রহ নেই। যারা চোখের সামনে দিয়ে এত বড় বড় কাজ করে গেল, তাদের কোনো স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। আতিকুল হক চৌধুরীর মতো একজন নাট্যযোদ্ধাও স্বীকৃতি পায়নি। রফিকুল ইসলামের মতো মানুষ ৭০ বছরে এসে একটা স্বীকৃতি পেয়েছে। প্রতিটা মানুষের স্বীকৃতি তার আশপাশের ভালোবাসার মানুষগুলো, তার শ্রোতা ও ভক্তের কাছেই।
