এ পৃথিবীতে আমরা সীমিত সময়ের জন্য বেড়াতে এসেছি, হানাহানি করতে নয়। এ কথাটা আমরা প্রায়শ ভুলে যাই। যদি তাই না হতো তবে পরিবারে, সমাজে, রাষ্ট্রে এতো গোলযোগ, হানাহানি, রক্তারক্তি ও খুন-খারাবি কেন? আমরা সমাজে ও রাষ্ট্রে নিয়ম-কানুন ও শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা রক্ষা ও মান্য করে চলতে ব্যর্থ হচ্ছি কেন? অন্যায়, অবিচার ও দুর্নীতির প্রতি আমাদের এতো আকর্ষণ কেন? দিন দিন এর বৃদ্ধি কেন? একসময়ে তো আমাদের দেশ ও সমাজ এতো উত্তপ্ত ও বিশৃঙ্খল ছিলো না। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির শিথিলতা কোন যুগেই ছিল না তা বলবো না। তবে এখন যেমনটা দেখা যাচ্ছে তেমন নৈরাজ্যকর অবস্থা আগে ছিলো না। মাদক সেবন করে পিতা-মাতাকে সন্তান খুন করছে কিংবা রাস্তায় বন্ধুকে বন্ধু প্রকাশ্যে কপালে পিস্তল ঠেকিয়ে গুলি করে মারছে, দিন দিন মানুষ গুম হচ্ছে, মানুষকে আটকে রেখে মুক্তিপণ দাবি করছে, যথেচ্ছ ব্যভিচার হচ্ছে - এমনটা কি এতোটা ব্যাপকহারে কোনকালে আমাদের দেশে ছিলো? আরো আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে আইন-শৃঙ্খলাবাহিনী শত চেষ্টা করেও এসব নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। বরং শোনা যায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কোন কোন বিপথগামী সদস্য এসবের সাথে জড়িয়ে যাচ্ছে। এসবই ব্যথিত ও বিস্মিত হওয়ার মতো কার্যকলাপ। এসবের জন্য আমরা কাকে দোষ দেবো? রাষ্ট্রকে বা সরকারকে? সরকার কি কেবল যারা দেশ পরিচালনা করে শুধু তাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ? পিতা-মাতা, সমাজপতি বা এ জাতীয় যারা সমাজে আছেন তাদের কি কোন দায় নেই? আছে। তবে স্বীকার করতেই হয়, আজকে আমাদের দেশে যে প্রতিহিংসা ও অসহিষ্ণুতার রাজনীতি চলছে তাতে এর দায় যেসব রাজনীতিক সরকার পরিচালনা করেন এবং যারা এদের বিরোধীপক্ষ তাদের উপরই সিংহভাগ বর্তায়। কারণ রাজনৈতিক অঙ্গনেই এসব হানাহানি, বিশৃঙ্খলা ও খুন-খারাবি বেশি। যখন একটি রাষ্ট্র দ্বিধা-বিভক্ত হয়ে যায় তখন অনিয়মের ঢল বাঁধভাঙ্গা জোয়ারের মতো আসে। যেমনটা আমাদের দেশে ঘটেছে। ছোট্ট একটি অনুন্নত দেশ। এর আয়তনের তুলনায় জনসংখ্যা বিশাল। দেশে আয়-রোজগারের সুযোগ-সুবিধা সীমিত। বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সিট নিয়ে ২০ থেকে ৪০ জন কাড়াকাড়ি করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের সিট নিয়েও তাই। একটি চাকরির পদের জন্য প্রতিযোগিতা করে বেশুমার প্রার্থী। সুবিধা-বঞ্চিত বেকার ও উপার্জনহীন লোকে দেশ ছেয়ে গেছে। কাকে রেখে কাকে সুযোগ দেয়া যায়। একজন নিয়মমাফিকও যদি সুবিধা পায় ৩০/৫০ জন বেজার হয়। বিক্ষুব্ধ হয়। ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে যায়। ‘আঁতুড়ে নিয়মো নাস্তি”। এর উপর আছে আগুনে ঘি ঢালার মতো রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব। তাই কেউ কাউকে বিশ্বাস করতে চায় না। নিয়ম মানে না। বঞ্চনা বোধ তাদেরকে তাড়িয়ে বেড়ায়। শুরু হয় আইন না মানার আন্দোলন। ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ। খুন-খারাবি। এগিয়ে আসে আইন-শৃঙ্খলাবাহিনী। শুরু হয় বিক্ষোভকারী ও আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীর মধ্যে যুদ্ধ। উভয়পক্ষেই হতাহত হয়। কিন্তু যেখানের সমস্যা সেখানেই রয়ে যায়। সমস্যার হয়তো সাময়িক উপশম হয় কিংবা হয় না। চাপা আক্রোশে ফুঁসতে থাকে বঞ্চিতরা। কেউবা হতাশায়। তাদের সামনে কোন আদর্শ নেই, ভবিষ্যত্ নেই। হতাশাগ্রস্তরা শরণাপন্ন হয় মাদকের কিংবা এরও চেয়ে মারাত্মক অসামাজিক কাজে। সমাজে বিশৃঙ্খলার আগুন দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকে। দেশের কর্ণধার রাজনীতিকরা সেদিকে নজর কমই দেন বলে মনে হয়। তারা কি তবে কেবল সবাই যেমন বলেন, নিজেদের আখের গোছাতেই ব্যস্ত থাকেন? তা না হলে যেখানে এই দরিদ্র দেশে তাদের জীবনমান দ্রুত বা শনৈঃ শনৈঃ বৃদ্ধি পাচ্ছে সেখানে পোশাক শ্রমিকদের দিনরাত কঠোর পরিশ্রম করেও বেঁচে থাকার মতো ন্যায্য মজুরির দাবিতে রাস্তায় নামতে হয় কেন? কেন পুলিশের গুলি খেতে হয়? পুলিশকেই বা কেন তাদের হাতে নাস্তানাবুদ হতে হয়? এসব প্রশ্নের উত্তর দেবে কে?
আমাদের ভুললে চলবে না যে আমাদের দেশের প্রায় ৮০ ভাগ লোক গ্রামে থাকে। তাদের অধিকাংশই মানবেতর জীবন যাপন করে। তাদের ছেলে-মেয়েরা স্কুল বা কলেজ সার্টিফিকেট হাতে করে অথবা শ্রমিক বেশে যখন শহরে প্রবেশ করে তারা শহরের জেল্লা দেখে হতবাক হয়ে যায়। শহরের এই গাড়ির বহর এই সুরম্য অট্টালিকা তাদের নয়। এটা তারা অনুভব করে বা তাদের অনুভব করতে দেয়া হয়। পেছনে ফেলে আসা তাদের পিতা-মাতা, ভাই-বোন অভাবে দিনাতিপাত করছে। তারা হতাশ হয়। হতাশা থেকে তাদের মনে একধরনের দ্রোহের জন্ম নেয়। এই দ্রোহের মাঝে মাঝে বিস্ফোরণ ঘটে। তারা বেপরোয়া হয়ে পড়ে। মানুষের তৈরি আইন তা রোধ করতে পারে না। আসলে পুঁজিবাদী বিশ্বায়নের দৈত্য বা ভূত যাই বলুন না কেন তা আমাদের এই ছোট্ট দরিদ্র দেশটিতে জেঁকে বসেছে। দেশে বিত্তবান ছোট আকারের অথচ প্রবল ক্ষমতাধর একটি শ্রেণী তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এদের বিচরণ অবাধ ও নিরঙ্কুশ। শ্রম-ঘামে সিক্ত এদেশের খেটে-খাওয়া মানুষের উত্পন্ন দ্রব্যাদি ঔপনিবেশিকদের মতো তারা ভোগ করে। যাদের একমাত্র লক্ষ্য মুনাফা লুট করা। এদেশের কৃষক-শ্রমিককে তারা নিজেদের আত্মীয় মনে করে না। এই শ্রেণীটি প্রতিদিন যে ডলার গুণে তা যে এদেশেরই রক্ত-ঘাম করা শ্রমিকের শ্রমেরই ফসল তা তাদের মনোযোগ আকর্ষণ করে না। তারা কেবলই হিসাব দেখায় দেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ১৪ বিলিয়ন ডলার। একবারও বলে না এ কাদের উপার্জন। কাদের শ্রমের বিনিময়ে এ প্রাপ্তি। তারা ভোগ করে, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না। আজ আর শ্রমিকশ্রেণী অন্ধ বা অচেতন নয়। তাদের চোখ ফুটেছে। স্বাভাবিক কারণেই তারা বঞ্চনার প্রতিবাদ করে, ভাংচুর করে। ঔপনিবেশিক আমলে আমরা জাতিগতভাবে অন্যায়, অবিচার, শোষণ, বঞ্চনা, নির্যাতন, নিপীড়নের প্রতিবাদ করিনি? যেসব রাজনীতিক আজো রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করেন তারা কি ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন করেননি? তা না হলে দেশটা স্বাধীন হলো কিভাবে? প্রতিনিয়তই তো আমরা রেডিও-টেলিভিশনে নতুন প্রজন্মকে সেসব কাহিনী শোনাচ্ছি। এ কথা ভুললে চলবে না তারা আমাদেরই উত্তরসূরী। প্রতিবাদকারী বীরের রক্ত এদের ধমনীতে প্রবাহিত। আমরা এদের দোষ দেবো কিভাবে?
আমাদের দেশের যারা অভিভাবক তাদের একটি বড় দোষ এই যে, তারা সবুর করতে বা সংযত হতে নিজেরা যেমন পারেন না তেমনি আমাদের উত্তরসূরীদেরও শেখান না। ন্যায়-অন্যায়ের মতো ধর্মীয় মূল্যবোধগুলো সমাজ থেকে আমরা ঝেঁটিয়ে বিদায় করে দিয়েছি। আমাদের আত্মা আজ শুষ্ক, অকর্ষিত। মানবপ্রেম ও মানবতাবোধ আজ নির্বাসিত। এ সকল বিষয়ে দেশে বড় বড় সেমিনার-সিম্পোজিয়াম হচ্ছে। আলোচনা হচ্ছে না তা নয়। কিন্তু সকল মানবিকতার উত্স যে ধর্ম তা মধ্যযুগীয় বা মৌলবাদ বলে পাশ্চাত্যের মতো উপেক্ষিত হচ্ছে। অথচ এককালে এই ধর্মই ছিল প্রাচ্যের মানববন্ধনের চাবিকাঠি। বর্তমানকালে আমরা দেখছি আমাদের দেশে ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা আছে কিন্তু এর আমল নেই বা অতি কম বললেও বেশি বলা হয় না। ফলে যা হবার তাই হচ্ছে। পাশ্চাত্য সভ্যতার অস্থিরতা ও মানুষের প্রতি মানুষের অবহেলা ও বঞ্চনার রোগটি আমাদের পেয়ে বসেছে। পাশ্চাত্যের মতো আমাদের সমাজের মানুষগুলোও একে অপরের অনাত্মীয় হয়ে সকলেই নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ছি। পাশ্চাত্যের মতো কেবলই বস্তু আহরণের প্রতিযোগিতার কবলে পড়ে আমরা একে অপরের ঘোষিত বা অঘোষিত শত্রুতে পরিণত হচ্ছি। পাশ্চাত্য সভ্যতার অনেক গুণের মধ্যেও এটিই বড় দোষ। পাশ্চাত্যের অগ্রসর অর্থনীতিতে এই দোষ তারা কিঞ্চিত্ সামাল দিতে পারলেও আমরা পারছি না। এই দোষ আমাদের অকালে পেয়ে বসেছে। ধর্ম আজ আর তার দায়িত্ব পালন করতে পারছে না। পাশ্চাত্য আমাদের ধর্মকে ভয় পেতে শিখিয়েছে। আমাদের এ উচ্ছৃঙ্খল জীবনধারা কে সামাল দেবে? রাষ্ট্রীয় আইন-শৃঙ্খলাবাহিনী? তা তারা পারছে না। এতো আমাদের নিত্যদিনের অভিজ্ঞতা।
লেখক :অর্থনীতির অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, বিসিএস. সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার
