‘জীবে প্রেম করে যেই জন, সে জন সেবিছে ঈশ্বর’— স্বামী বিবেকানন্দের এই বিখ্যাত বাণীর কথা আমরা প্রায় সকলেই কমবেশি জানি। শুধু বিবেকানন্দ কেন, পৃথিবীর তাবত্ মহাপুরুষেরাই জীবের প্রতি দয়া প্রদর্শনের ব্যাপারে বরাবরই মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে এসেছেন। তাদের এসব ভাল ভাল কথা আমরা জানলেও মানি কতটুকু? যদি মেনে চলতাম, তাহলে খাদ্য-বস্ত্রের প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে পৃথিবী থেকে যাবতীয় প্রাণীসম্পদ উজাড় করতে উঠে পড়ে লাগতাম না। অন্য প্রাণীর অস্তিত্ব বিপন্ন হলে যে এক পর্যায়ে মনুষ্য প্রজাতির অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়বে, অনেক দেরীতে হলেও তা এখন আমরা একটু একটু করে বুঝতে শিখেছি। আর বুঝেছি বলেই বিপন্নপ্রায় বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণী রক্ষায় নেয়া হচ্ছে নানামুখি পদক্ষেপ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গড়ে তোলা হয়েছে প্রাণীদের অভয়াশ্রম। কিন্তু তারপরও লোভী শিকারীদের হাত থেকে রক্ষা করা যাচ্ছে না বাঘ, হাতি, হরিণ, সাপ, পাখিসহ নানারকম প্রাণীকে। এমনই এক দু:সময়ে পাওয়া গেল আশা জাগানিয়া একটি খবর- বিপন্ন প্রজাতির প্রাণী ‘স্নো লেপার্ড’ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন তিব্বতের বৌদ্ধ ভিক্ষুরা।
খবরটি দিয়েছে ওয়াইল্ডক্যাট প্রোটেকশন গ্রুপ প্যানথেরা। গ্রুপটির আর্থিক সহায়তায় চীনের পিকিং ইউনিভার্সিটির প্রফেসর জুয়ান লি’র নেতৃত্বে একটি দল দীর্ঘ গবেষণা চালায় স্নো লেপার্ডের আবাসস্থল বলে খ্যাত চীনের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় সানজিয়ানগুয়ান প্রাকৃতিক অভয়াশ্রম এলাকায়। চীনে বর্তমানে হাজার চারেক স্নো লেপার্ড অবশিষ্ট আছে যার অধিকাংশেরই বাস এই সানজিয়ানগুয়ান অভয়াশ্রমে। প্রায় ৩ লাখ ৬০ হাজার বর্গ কিলোমিটার আয়তনের এই বিশাল অভয়াশ্রমে বেশ ভালোভাবেই টিকে আছে স্নো লেপার্ডরা। বিশ্বের বিভিন্ন অভয়াশ্রম যেখানে প্রাণীদের অভয় বা নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে সেখানে সানজিয়ানগুয়ানের এই সাফল্যের রহস্য কী? মূলত এটি জানতেই প্যানথেরার গবেষক দলের সেখানে যাওয়া। সমপ্রতি প্যানথেরা তাদের ওয়েবসাইটে সেই গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করেছে, যাতে উঠে এসেছে এক চমকপ্রদ তথ্য— মানুষ ও বন্যপ্রাণীর শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের এক দুর্লভ চিত্র। গবেষণায় দেখা গেছে, ঐ অভয়াশ্রম সংলগ্ন তিব্বতের ৩শর বেশি বৌদ্ধ বিহারে বসবাসরত বৌদ্ধ ভিক্ষুদের অহিংস নীতির কারণেই স্নো লেপার্ডরা সেখানে নির্ভয়ে থাকতে পারছে। ভিক্ষুরা তিব্বতের মালভূমিতে যেন বন্যপ্রাণীদের ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভুত হয়েছেন। প্যানথেরার খবরে বলা হয়, তিব্বতের ভিক্ষুরা স্নো লেপার্ডসহ সেখানকার বিভিন্ন প্রাণীকে অত্যন্ত পবিত্র বলে মনে করে থাকে। এসব প্রাণী রক্ষায় তারা তাদের বিহারের আশেপাশে নিয়মিত টহল পর্যন্ত দিয়ে থাকে। আর চীনের ঐ অংশে তিব্বতের ভিক্ষুদের শক্তিশালী প্রভাবের কারণে সেখানকার লোকজনও বন্যপ্রাণীদের খুব একটা ঘাটায় না।
কয়েক বছর আগেও তিব্বত ছিল বন্যপ্রাণীদের চামড়া বেচাকেনার জন্য আদর্শ স্থান। বাঘ ও লেপার্ডের চামড়া পোশাক হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা ছিল যথেষ্ট। এমনকি বৌদ্ধ ভিক্ষুরাও পড়তেন সেসব চামড়ার পোশাক যদিও তারা নিজ হাতে কোন প্রাণী হত্যা করতেন না। ২০০৬ সালে তিব্বতের ধর্মীয় নেতা দালাইলামা এসবের অবসান ঘটান। তিনি তিব্বতীদের প্রতি বন্যপ্রাণীর চামড়া বেচাকেনা এবং চামড়ার পোশাক পরিধান বন্ধ করার আহবান জানান। তাঁর মতে, এসব চামড়ার পোশাক পরা বৌদ্ধধর্মের মূল আদর্শের পরিপন্থী। ধর্মগুরুর সেই আহবানে ভালোই সাড়া দিল তিব্বতিরা। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে চামড়া বেচাকেনা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেল, রাস্তায় রাস্তায় আগুনে পোড়ানো হলো প্রচুর ব্যঘ্রচর্ম।
প্যানথেরার গবেষণার সাথে একমত পোষন করেছেন চীনের অনেক গবেষক। তারাও বলেছেন, ধর্ম ও প্রাণী রক্ষার মধ্যে একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে। তাদের মতে অহিংস নীতির কারণে বৌদ্ধ ভিক্ষুরা স্বাভাবিকভাবেই প্রাণী হত্যা থেকে বিরত থাকেন। ফলে তারা তিব্বত মালভূমিতে প্রাণীদের জন্য একটি নিরাপত্তার বাতাবরণ সৃষ্টি করেছেন। তবে চীনের সাইবেরিয়ান টাইগার রক্ষা সংগঠনের প্রধান লি ঝিজিং বলেছেন, সব প্রাণীর ক্ষেত্রেই যে অহিংস নীতি মেনে চলা হয়, তা ঠিক নয়। চীনের উত্তরপশ্চিমাঞ্চলীয় এলাকার গ্রামগুলোতে বিপন্ন প্রজাতির বাঘকে অনেকে দেবতার মতো মনে করে। এ কারণে সেখানে অনেক আগেই বাঘ নিধন বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু অন্যদিকে নেকড়ের ভাগ্য কিন্তু বাঘের মতো সুপ্রসন্ন হয়নি। নেকড়েকে সেখানে মনে করা হয় শয়তান। ফলে এখন সেখানে আর প্রাণীটির দেখা মেলে না। সবই মেরে ফেলা হয়েছে।
প্যানথেরার সুপারিশ হলো তিব্বতের বৌদ্ধ বিহারগুলোতে অর্থসহ অন্যান্য সাহায্য দেয়া হোক যাতে তারা প্রাণী রক্ষায় আরও বেশি করে ভূমিকা পালন করতে পারে। তবে প্যানথেরার গবেষণার ফলাফলের সাথে একমত পোষন করেননি অনেকে। ঝিনজিয়াং-এ অবস্থিত চাইনিজ একাডেমি অব সাইন্সেস-এর গবেষক মা মিং বলেছেন, বৌদ্ধ বিহার ও লেপার্ডের নিরাপদ থাকার মধ্যে নিশ্চয়ই কোন একটা যোগসূত্র রয়েছে, কিন্তু তার মানে এই নয় যে বৌদ্ধ ভিক্ষুরাই বাঘ রক্ষার ক্ষেত্রে একমাত্র কৃতিত্বের দাবিদার। তিনি বৌদ্ধ বিহারে অর্থসাহায্য প্রদানের প্রস্তাবের বিরোধিতা করে বলেন, সরকারি কোন কর্মসূচিতে অর্থ বরাদ্দের আগে তার সর্বোত্তম ব্যবহারের বিষয়ে নিশ্চিত হতে হয়। যেমনটি করা হয়েছে জায়ান্ট পান্ডা রক্ষার ক্ষেত্রে। এবং সেই কর্মসূচি সফলও হয়েছে। অর্থাত্ চীন সরকার চাইলে যে কোন প্রাণী রক্ষা করতে পারে।
