সিরিয়া ইস্যুতে

নীরব কেন ইসরায়েল

আপডেট : ০৬ অক্টোবর ২০১৩, ১৯:৫৫
সরব না হয়ে নীরব থেকেই যদি উদ্দেশ্য হাসিল হয়, তাহলে উচ্চবাচ্য করার কী দরকার! মুখে কুলুপ এঁটে থাকাটাই তো শ্রেয়। অবশ্য এর একটা সমস্যাও আছে— অন্যরা মনোভাব বুঝতে পারলে বিপত্তি ঘটার সম্ভাবনা থেকে যায়। তবে ইসরায়েলের ক্ষেত্রে এমন যে হবে না, তা এক প্রকার নিশ্চিত করেই বলা যায়। কারণ বিশ্ব রাজনীতিতে তারা কোন কাঁচা খেলোয়াড় নয়; তারা প্রতিটি পদক্ষেপই ফেলে অগ্রপশ্চাত্ চিন্তা করে। সিরিয়া ইস্যুতে তারা বুঝে উঠতে পারছে না, তাদের ভূমিকা কী হওয়া উচিত আর কী হওয়া উচিত নয়। এ অবস্থায় দেশটি গ্রহণ করেছে চুপচাপ থাকার কৌশল। এর পেছনে একটা যুক্তি হতে পারে এরকম— তথাকথিত আরব বসন্ত তাদের জন্য ভাল বার্তা বয়ে আনেনি; উপরন্তু মাথাচাড়া দিয়েছে মৌলবাদ। যার জাজ্বল্যমান প্রমাণ মিসর। এমন যুক্তি হয়তো আরো অনেক রয়েছে। মুখে কিছু না বললেও ইসরায়েল ভাবেসাবে বুঝিয়ে দিয়েছে, যতো দ্রুত সম্ভব যুক্তরাষ্ট্রের সিরিয়া আক্রমণ করা উচিত। আর তা না হলে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রহণযোগ্যতা নষ্ট হবে। একই সময়ে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদকে প্রেসিডেন্ট হিসেবেই দেখার কিঞ্চিত অভিপ্রায়ও তাদের রয়েছে। কেননা তার বদলে যিনি আসতে পারেন, তিনি হয়তো তাদের জন্য সুবিধাজনক নাও হতে পারেন। এমন ভয়ের কারণ, বিদ্রোহীদের মাঝে ইসলামী চরমপন্থীদের প্রভাব ক্রমশই বাড়ছে। এমন দ্বিধাদ্বন্দ্বের জন্যই সিরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র তথা পশ্চিমা বিশ্বের সামরিক হস্তক্ষেপ প্রশ্নে ইসরায়েল মুখ খুলতে নারাজ। বিশেষত জনসমক্ষে কিছু বলতে চাইছে না। তবে কংগ্রেসের অনুমোদন প্রত্যাশা করে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা হামলার সিদ্ধান্ত স্থগিত করায় ইসরায়েলের হতাশার বিষয়টি প্রকাশ পেয়ে যায় প্রকারান্তরে। ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট শিমন পেরেজ হামলার সিদ্ধান্ত স্থগিত হওয়ার পর এক রেডিও সাক্ষাত্কারে বলেছিলেন, ‘প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার নৈতিকতা ও নেতৃত্বের ওপর আমার পূর্ণ আস্থা রয়েছে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, একটু দেরিতে হলেও সিরিয়ার ব্যাপারে হলেও সঠিক সিদ্ধান্তই গ্রহণ করবেন।’ যুক্তরাষ্ট্রের কী করা উচিত আর অনুচিত, এসব প্রসঙ্গে নিশ্চুপ থাকতে চাইছে ইসরায়েল, যাতে এমন ধারণা তৈরি না হয় যে, ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতি ও প্রতিবেশী সিরিয়ার গৃহযুদ্ধকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে। সেজন্য নেতারা কথা বলার চেষ্টা করছেন সতর্কভাবে। প্রধানমন্ত্রী বেনইয়ামিন নেতানিয়াহু গত সপ্তাহে প্রকাশ্যে বারাক ওবামার সমালোচনা করায় এক মন্ত্রীকে অপদস্থ করেন। গৃহায়ণ মন্ত্রী ইউরি অ্যারিয়েল সিরিয়া প্রসঙ্গে বারাক ওবামার সমালোচনা করে পরিস্থিতিকে হলোকাস্টের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। তার মতে, অপ্রচলিত অস্ত্র ব্যবহারের পরও নিস্ক্রিয়তার জন্য পশ্চিমা বিশ্বকে অনেক মূল্য দিতে হবে। কিন্তু নেতানিয়াহু তার মন্ত্রী পরিষদকে এক প্রকার হুঁশিয়ার করে দিয়েই বলেছেন, অভিমতকে প্রকাশ না করে নিজেদের মধ্যেই ধরে রাখতে। অবশ্য তার এ কৌশলও নতুন। কয়েক দিন আগে ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসরায়েল সফরে গেলে নেতানিয়াহু তাকে জানিয়েছিলেন, তার দেশ সিরিয়ার প্রতি পশ্চিমা বিশ্বের কঠোর জবাব প্রত্যাশা করছে। কারণ রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের পরও তা সহ্য করা হলে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিও প্রশ্রয় পাবে। অনেক পশ্চিমা দেশের মত ইসরায়েলও বিশ্বাস করে, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির দিকেই এগুচ্ছে এবং এ ব্যাপারে তারা শুধুমাত্র উদ্বেগ প্রকাশ করেই ক্ষান্ত নয়, ইরানে হামলার হুমকি পর্যন্ত দিচ্ছে। আর এ তথ্যটি সবারই জানা— ইরান ও সিরিয়ার সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এবং সিরিয়া ইরানের টেস্টিং গ্রাউন্ডে রূপ নিয়েছে। সিরিয়ায় হামলা যে ইরানের প্রতি দারুণ এক সতর্কবার্তা হবে, তা ইসরায়েল খুব ভাল করেই জানে। সিরিয়ায় সামরিক হস্তক্ষেপ প্রশ্নে কংগ্রেসে ভোট হবে— ওবামার এমন ঘোষণা শুনে ইসরাইলের অধিকাংশ লোকই হতাশ হয়েছিলেন। তারা চান, নৈতিকতা ও কৌশলগত কারণে যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়ায় আক্রমণ চালাক। ওবামার ঘোষণা শোনার পরের দিন ইসরায়েলের অধিকাংশ সমালোচনামূলক নিবন্ধ ছাপা হয়। ইসরাইলিরা মনে করে, আসাদ সরকার যেহেতু নিজের দেশেই রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করতে পেরেছে, কাজেই এমন অস্ত্র ইসরায়েলের জনগণের বিরুদ্ধেও যে কোন সময় ব্যবহার করা হতে পারে। এমন আশঙ্কায় দেশটিতে বিশেষ গ্যাস-মাস্ক বিক্রি বেড়ে গেছে কয়েকগুণ। কারণ, তাদের বিশ্বাস, হামলার শিকার হলে সিরিয়া বিশ্ব রাজনীতির মোড় অন্য দিকে ঘুরিয়ে দিতে ইসরায়েল আক্রমণ করে বসবে। তবে এটি ঠিক যে, গোলান মালভূমি নিয়ে বিরোধ থাকা সত্ত্বেও আসাদের পরিবার গত ৪০ বছরে সিরিয়া-ইসরাইল সীমান্তকে অস্থির হতে দিয়েছে খুব কম সময়ই। ইসরায়েলের আইনপ্রণেতা ও বিরোধী লেবার পার্টির সদস্য নাসম্যান শাই সিরিয়ার বর্তমান পরিস্থিতিতে নেতানিয়াহু সরকারের ভূমিকার প্রশংসা করেছেন। তিনি মনে করেন, সিরিয়ায় বাসার সরকারকে হটালেই যে সেখানে একটি স্থিতিশীল সরকার আসবে তার কোন নিশ্চয়তা নেই। আর স্থিতিশীল সরকার না থাকলে সিরিয়ানদের ইসরায়েল বিরোধী মনোভাব আরো প্রকট হবে। সে সুযোগে আল-কায়দা তথা ইসলামি চরমপন্থীরা সেখানে মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে। ইসরায়েলের কামনা হচ্ছে, কেউ তাদের আক্রমণ করার সাহস না করুক। ইরানকে নিয়েই তাদের সবচে’ বেশি ভয়। তাদের অন্যতম মিত্র সিরিয়া আক্রমণের শিকার হওয়ার মানে এক অর্থে ইরানেরই ডানা ভেঙে যাওয়া। ইরানকে কিছুতেই পারমাণবিক অস্ত্রসমৃদ্ধ হতে দেবে না যুক্তরাষ্ট্র— এমন প্রতিশ্রুতি যুক্তরাষ্ট্র দিয়ে রাখলেও পুরোপুরি আশ্বস্ত হতে পারছে না ইসরায়েল। তাদের দৃঢ়বিশ্বাস, পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে অনেক দূর এগিয়ে গেছে দেশটি, যা তাদের অস্তিত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ। মোদ্দাকথা, নানাবিধ কারণে সিরিয়া ইস্যুতে নীরব থাকার কৌশল গ্রহণ করেছে, যাতে কেউ বুঝতে না পারে যে, এ ব্যাপারে তাদের বিশেষ উত্সাহ কাজ করছে। আশ-পাশে সবই শত্রুরাষ্ট্র, বন্ধু বলতে বস্তুত কেউই নেই। এমন অবস্থায় পৃথিবীর একমাত্র ইহুদী রাষ্ট্রটির কৌশলী হওয়াটাই তো স্বাভাবিক।