সরকার পতনের প্রচেষ্টা থেকে শেষ মুহুর্তে সরে আসাকে বিভিন্ন গণমাধ্যমে বলা হচ্ছে বার্লুসকোনির ইউ-টার্ন। বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারকে যে কোন সময় নিষ্ক্রিয় করে ফেলতে নিজেকে অত্যন্ত ক্ষমতাশালী মনে করতেন বার্লুসকোনি। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে রাজনৈতিক হিসেব নিকেষ ভুল প্রমাণিত হয়েছে

বার্লুসকোনির ইউটার্ন

আপডেট : ০৬ অক্টোবর ২০১৩, ১৯:৫৫
ভাগ্য আর সুপ্রসন্ন নয় ইতালির সাবেক প্রধানমন্ত্রী সিলভিও বার্লুসকোনির। গত দু’তিন বছর সময় খুবই খারাপ যাচ্ছিল ৭৭ বছর বয়সী এই নেতার। নিজের অবশিষ্ট রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তাই চেয়েছিলেন আবারো ক্ষমতার শিরোমনি হতে। কিন্তু ভাগ্য এবারও তার দিকে মুখ ফেরায়নি। তিনবার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সৌভাগ্য অর্জনকারী প্রাজ্ঞ নেতা বার্লুসকোনি নানান রাজনৈতিক হিসেব নিকেষ কষে হঠাত্ই জোট সরকারের প্রতি তার সমর্থন প্রত্যাহারের ঘোষণা দিলেন। নিজ দল পিপল অব প্রিডম পার্টি- পিডিএলের পাঁচ মন্ত্রীকে নির্দেশ দেন পদত্যাগ করতে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী এনরিকো লেত্তা পদত্যাগপত্র গ্রহণ না করে সিনেটে আস্থা ভোট চান। ভোটে ঐ মন্ত্রীরাই লেত্তা সরকারের প্রতি আস্থা জ্ঞাপন করেন। এমনকি বার্লুসকোনিও সরকারের প্রতি সমর্থন জানাতে বাধ্য হন। টিকে যায় প্রধানমন্ত্রী লেত্তার সরকার। বড় ধরনের দুর্যোগ ঝুঁকি থেকে বেঁচে যায় ইতালি। সরকার পতনের প্রচেষ্টা থেকে শেষ মুহুর্তে সরে আসাকে বিভিন্ন গণমাধ্যমে বলা হচ্ছে বার্লুসকোনির ইউ-টার্ন। বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারকে যে কোন সময় নিষ্ক্রিয় করে ফেলতে নিজেকে অত্যন্ত ক্ষমতাশালী মনে করতেন বার্লুসকোনি। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে রাজনৈতিক হিসেব নিকেষ ভুল প্রমাণিত হয়েছে। এর মাধ্যমে বার্লুসকোনি নিজেকে আরো দুর্বল প্রমাণ করলেন এবং নিজের বিশ্বাসযোগ্যতাকে খাটো করে ফেললেন। বিশ্লেষকরা এও বলছেন, ইতালির রাজনীতিকে গভীরভাবে নাড়া দেয়ার মতো যেটুকু ক্ষমতা বার্লুসকোনি ছিলো, তাও তিনি ধ্বংস করে ফেললেন। এর আগে জোট সরকারের উপর থেকে নিজ দলীয় সমর্থন প্রত্যাহারের মাধ্যমে সরকার পতনের অঙ্গীকার ঘোষণা দেন বার্লুসকোনি। যা সিনেটে ভোটাভুটিতে গড়ায়। সিনেটরদের পদত্যাগ করারও নির্দেশ দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু অনেক সিনেটর সরকারকে সমর্থন জানানোর ঘোষণা দেন। এ অবস্থায় এক রকম পরাজয় বরণ করে ইউ-টার্ন নিতে বাধ্য হন বার্লুসকোনি। সিনেটে আস্থা ভোট অনুষ্ঠানের আগে আবেগপূর্ণ ভাষণ দেন প্রধানমন্ত্রী এনরিকো লেত্তা। তিনি বলেন, আস্থা ভোটে পরাজিত হলে শুধু সরকারেরই পতন হবে না, বরং গোটা ইতালি এক ভয়ানক ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। সিনেটরদের উদ্দেশ্যে উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আপনারা সরকারের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য এবং সে অনুযায়ী এর কর্মসূচি উপলব্ধি করে আপনাদের সুচিন্তিত আস্থা জানান। অর্থনীতির উত্তরণে অসমাপ্ত কাজ শেষ করতে আপনাদের মূল্যবান ভোট আজ দেশ ও জাতির বড় প্রয়োজন’। বার্লুসকোনিসহ তাঁর দলীয় অনেক সদস্য আস্থা জ্ঞাপন করায় ভোটে লেত্তা হজ জয় পান। সরকারের প্রতি সমর্থন জানান সিনেটের ২৩৫ জন সদস্য। আর অনাস্থা জানান মাত্র ৭০ জন সিনেটর। সিনেটে বার্লুসকোনির কিছু পুরোনো একগুঁয়ে সমর্থকও ছিলেন, যারা বার্লুসকোনির স্বার্থে যে কোন ধরনের ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত। কিন্ত এবার তাদের অনেককেই দেখা গেলো ভোটাভুটি বর্জন করে ওয়াক আউট করতে। প্রধানমন্ত্রী লেত্তার বিরুদ্ধে বার্লুসকোনির অভিযোগ, বিচার ব্যবস্থার মাধ্যমে রাজনীতিতে গুপ্তঘাতকের কাজ করছে তার সরকার। কিন্তু পারতপক্ষে তিনি ইঙ্গিতে বোঝাতে চান যে, তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা পরিচালনায় সরকারের হাত রয়েছে। তবে নিজ দলীয় সিনেটর ও মন্ত্রীদের তিনি নির্দেশ দেন মূল্য সংযোজন কর বৃদ্ধির সরকারি সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়ে পদত্যাগ করতে। তা সত্বেও কারোরই বুঝতে বাকি ছিলো না যে, রাজনীতি বা দেশের চেয়ে বার্লুসকোনি এখন নিজের কথাই বেশি ভাবছেন। সিনেটে দেয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী লেত্তা এ বিষয়টিই সাবলিলভাবে ব্যাখ্যা করেন। সিলভিও বার্লুসকোনি ইতালির সবচাইতে ধনী ব্যবসায়ীদের একজন। মধ্যম ডানপন্থি দল গঠন করে ক্ষমতায় আসতে আসতে তাঁর বেশি সময় লাগেনি। গত বিশ বছরের মধ্যে দশ বছরই তিনি ছিলেন ইতালির প্রধানমন্ত্রী। ইউরোজোনে অর্থনৈতিক মন্দা শুরু হলে ২০১১ সালের নভেম্বরে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন তিনি। এর আগে ২০০৯ সালে বিয়ে বহির্ভূত সম্পর্কের কারণে তাঁকে ডিভোর্স দেন তাঁর স্ত্রী। মাত্র ১৭ বছর বয়সী এক যৌনকর্মীর সাথে দৈহিক সম্পর্ক স্থাপন ও প্রধানমন্ত্রীর অফিস বা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগও ওঠে বার্লুসকোনির বিরুদ্ধে। ফলে ব্যাপক ইমেজ সংকটে পড়েন তিনি। ক্ষমতা ছাড়ার পর কর ফাঁকির মামলায় অভিযুক্ত হন তিনি। একই সাথে ঐ যৌনকর্মীকে অর্থ দেয়ার বিষয়টিও নিশ্চিত হয় আদালত। শেষ মুহূর্তে ঘুরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে বার্লুসকোনি সিনেটে বলতে বাধ্য হন, ‘আমাদের এখন এমন এক সরকারের প্রতি সমর্থন জানানো প্রয়োজন, যে প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগতভাবে সংস্কার কর্মসূচি চালিয়ে যাবে’। কিন্তু তাঁর এই বক্তব্য বা ইউ-টার্ন আসলে পরাজয়ের শামিল। বিশ্লেষকদের মতে, নিজেকে দুর্বল প্রমাণ করেছেন বার্লুসকোনি। এর মাধ্যমে অভিযুক্ত এই আসামির সিনেট সদস্যপদ হারানোর বিষয়টিও অনেকটা নিশ্চিত হলো। ইউ-টার্ন নিলেও পিছু ছাড়েনি অপমান আর কলঙ্ক। বার্লুসকোনি দ্রুত সিনেট ভবন ত্যাগ করলে সাধারণ মানুষ তাঁকে লক্ষ্য করে চিত্কার করে বলতে থাকে ‘গো এওয়ে, গো এওয়ে’। সিনেট ভবনের বাইরে তাঁকে শুনতে হয় টিটকারি আর শিস ধ্বনি। ভাগ্যের এমনই পরিহাস। অনেকের মতে, বার্লুসকোনি শেষ মুহুূর্তে নিজের ভুল বুঝতে পারলেও ততোক্ষণে বিদ্রুপের পাত্র হয়ে গেছেন। এর মাধ্যমে ইতালির রাজনীতিকে প্রভাবিত করার সক্ষমতাও হয়তো হারিয়ে ফেললেন তিনি। যদিও বার্লুসকোনির ঘনিষ্ট সহযোগী রিনেতো শিফানি তা মানতে নারাজ। তাঁর মতে, এই ভোট বার্লুসকোনিকে মোটেই দুর্বল করবে না। বরং তার নেতৃত্ব আরো জোরদার হবে। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, জোটের বিরুদ্ধাচারণ করাটাই ছিলো বার্লুসকোনি ভুল সিদ্ধান্ত। কারণ ভোটে তিনি জয়ী হলে ইতালির সংকট আরো বাড়তো। অর্থনৈতিক মন্দা, ঋণ সংকট ও যুবকদের বেকারত্বের উচ্চহার সামলাতে সরকার বাধ্য হয়ে যে সব শক্ত সংস্কার কর্মসূচি নিয়েছে, তা বিরাট ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যেতো। তাই সিনেটের রায় শুধু লেত্তা সরকারের পক্ষেই যায়নি, বরং ইতালি ও এর জনগণের পক্ষে গেছে। সরকারের প্রতি বার্লুসকোনির হুমকি ধমকির কারণে দেশে আবারো অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির আশঙ্কা দেখা দিয়েছিলো। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে মিলান স্টক এক্সচেঞ্জেও। কিন্তু সরকারের উপর সিনেট আস্থা দেখানোর পর মুহূর্তে ঐ পুঁজি বাজারের পতনোন্মুখ সূচকেও ইউ-টার্ন ভাব দেখা যায়। সাধারণ সূচক বেড়ে যায় শতকরা দুই শতাংশ।