মোসারের ‘স্বর্গীয়’ আলো

আপডেট : ০৬ অক্টোবর ২০১৩, ১৯:৫৬
সেই ১৮৭৯ সালের কথা। যখন থমাস আলভা এডিসন সফলভাবে বৈদ্যুতিক বাতি আবিষ্কার করেছিলেন। তখন থেকেই রাতের আঁধার আলোয় মিলিয়ে গেছে। সারা বিশ্ব এডিসনের আবিষ্কারে ধন্য। এর প্রায় ১৩৪ বছর পরের কথা। আলফ্রেডো মোসারের আবিষ্কার এখন বিশ্বকে আলোকিত করতে শুরু করেছে। ব্রাজিলের নাগরিক মোসার ২০০২ সাল থেকে দিনের বেলা বিদ্যুতের সংযোগ ছাড়াই তার ঘরকে আলোকিত করে রাখছেন। এজন্য শুধু পানি ভর্তি প্লাস্টিকের বোতল ও ব্লিচ (সাদা করা রাসায়নিক পদার্থ)-এর ছোট টুকরা ব্যবহার করেন তিনি। গত দুই বছরে তার আবিষ্কার বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। আশা করা হচ্ছে, আগামী বছরের মধ্যে বিশ্বের দশ লাখ বাড়িতে জ্বলবে তার আবিষ্কৃত লাইট। এখন বিস্ময় হলো- বিনা বিদ্যুত্ আর যন্ত্রপাতি ছাড়া কীভাবে কাজ করে এই লাইট। মোসারের সহজ উত্তর, আসলে এটা হলো সূর্যের আলোর প্রতিসরণ। সাধারণত পানি কয়েকদিন থাকলে তার রং সবুজ হয়ে যায়। তাই দুই লিটার সাইজের বোতলের পানি সাদা রাখার জন্য ছোট দুই টুকরা ব্লিচ ব্যবহার করা হয়। রং ঠিক থাকায় পানি অনেকদিন বদলানোর প্রয়োজন হয় না। সাধারণত বাসার ছাদে ছিদ্র করে এ বোতলগুলো বসানো হয়। ছিদ্র দিয়ে বোতলের নিচের অংশটা দেয়া হয় ছাদের নিচে। আর মুখের অংশটি থাকে উপরে। এর পর বোতলটি আঠালো পদার্থ দিয়ে ভালোভাবে আটকে দেয়া হয়। যাতে বৃষ্টির সময় এই ছিদ্র দিয়ে এক ফোঁটা পানিও না পড়ে। বোতলটির মুখ কালো ক্যাপ দিয়ে আটকালে বেশি ভালো। এতে বাতির আলো বেশি হয়। তার মতে, সূর্যের কড়া তাপের উপর এটির আলো নির্ভর করে। তবে আলোর পরিমাণ ৪০ থেকে ৬০ ওয়াটের মধ্যে থাকে। মূলত সূর্যের আলো বোতলের পানিতে আটকে যাওয়ার পর তা আলো হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। ব্রাজিলের দক্ষিণের উবেরাবা এলাকায় বাস করেন মোসার। যেখানে শুধু ফ্যাক্টরির জন্য জ্বালানি সরবরাহ করা হতো। লোকজনের বাড়ির জন্য বিদ্যুত্ দেয়া হতো না। ২০০২ সালে সেই বিদ্যুত্ ঘাটতির সময়ে মোসারের লাইটের আবিষ্কার। মোসার ও তার বন্ধুরা জরুরি বিপদ সংকেত দেখে মাঝে মাঝে অবাক হতেন। নিজেদের এই কৌতূহল জানার চেষ্টা করতেন। সে রকম এক মুহূর্তে তার মালিক তাকে পানি দিয়ে প্লাস্টিকের বোতল ভর্তি করে ঘাসের উপর রাখতে বলেন। তাকে দেখান সূর্যের রশ্মি প্রতিসরিত হয়ে লেন্স ফোকাসের মতো ঘাসে পড়ছে। এ সংকতকে কেউ আপদকালীন সংকেত হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। এ ধারণাই তার মাথায় নতুন কিছু আবিষ্কারের দ্বার উন্মোচন করে। তিনি তার চারপাশে পানির বোতল দিয়ে এক ধরনের খেলা খেলতে শুরু করেন। যার ফলে এক সময় তিনি আবিষ্কার করেন এই বোতল লাইট। মোসার তার আবিষ্কারের বিষয়ে বলেন, এ লাইট আবিষ্কারের জন্য আমি কোনো নকশা বা পরিকল্পনা করিনি। এটা স্বর্গীয় আলো। ঈশ্বর সূর্যকে সবার জন্য দিয়েছেন। প্রথমদিকে এ বাতি লাগানোর জন্য সামান্য কয়েক ডলার আয় করতেন মোসার। সেটা তার ছোট বাড়ি আর ১৯৭৪ সালের গাড়ির মডেল দেখলে সহজে বোঝা যায়। আবিষ্কারকদের আবিষ্কার, তাদের নাম, খ্যাতির পাশাপাশি আর্থিক দিক দিয়েও সমৃদ্ধ করে; কিন্তু মোসারের বেলায় তার উল্টোটা হয়েছে। তবে এ আবিষ্কারের মাধ্যমে তিনি এক ধরনের গর্ববোধ করেন। মোসার বলেন, এই বাতি ব্যবহারের কারণে একজন প্রতি মাসে সামান্য হলেও অর্থ বাঁচাতে পারছেন। যা দিয়ে তিনি তার সন্তানের জন্য প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে পারেন। এটা কি বড় কোনো বিষয় নয়। ফিলিপাইনের মাই শেল্টার ফাউন্ডেশনের ইলাক এঙ্গেলো ডায়াজ মোসারকে অনুসরণ করে ২০১১ সাল থেকে পুনর্বাসন কেন্দ্রগুলোতে বোতল লাইট ব্যবহার করছেন। গরিব মানুষের বাসায় এই লাইট বসানোর জন্য তারা লোকদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। ফিলিপাইনে এক-চতুর্থাংশ লোক দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে। আর বিদ্যুতের দামও অনেক বেশি। যে কারণে মোসারের ধারণা ভালোই কাজ করছে সেখানে। বর্তমানে দেশটির ১ লাখ ৪০ হাজার বাড়িতে মোসারের বাতি জ্বলছে। শুধু ফিলিপাইন নয় বিশ্বের প্রায় ১৫টি দেশে জ্বলছে মোসারের বাতি। এর মধ্যে আছে ভারত, তাঞ্জানিয়া, আর্জেন্টিনা, ফিজি এবং বাংলাদেশও। ডায়াজের মতে- মোসারের বাতি প্রান্তি দ্বীপগুলোর বাড়িতেও খুঁজে পাওয়া যায়। তারা বলেন, প্রতিবেশীর বাড়িতে দেখেই এই বাতি লাগিয়েছেন। বাংলাদেশে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এ বোতল লাইট (বোতল বাতি) প্রদান করছে। শাড়ি তৈরির কারখানা, রিকশার গ্যারেজে এ লাইটের ব্যবহার হচ্ছে। যাদের আয় খুব সীমিত কিন্তু আলো দরকারী।