ইতোমধ্যে আপনি জেনে গেছেন—এবছর কে পেয়েছেন সাহিত্যের সবচেয়ে আকাঙ্ক্ষিত পুরস্কার ‘নোবেল’। সুইডিশ নোবেল কমিটি হাসিহাসি মুখে হাজারটা মিডিয়ার সামনে গর্বভরে যে নামটি উচ্চারণ করেছে নিঃসন্দেহে তিনিই সব প্রসংশার দাবিদার। তবে সেটির পূর্বে কত ঝক্কি-ঝামেলা হয়ে গেল সে খবর কয়জন রেখেছেন। স্বাভাবিকভাবেই ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যেই নোবেলের মনোনয়ন, আবেদন নিবেদন বিষয়ক সব ঝক্কি-ঝামেলা সেরে রাখেন নোবেল কমিটি। এরপর শুরু হয় সাংবাদিক আর জুয়াড়িদের ব্যস্ততা। শীর্ষ শতকের মধ্যে কজনের নাম এলো। কোন লেখক বা কবি এবার আলোচনায় নেই, সেগুলো নিয়ে কত আর্টিক্যাল আর ফিচার। নোবেল কে পেতে যাচ্ছেন—এমন সঠিক তথ্য বলতে পারা আর বটতলায় আগরবাতি জ্বালিয়ে বিশাল আলখাল্লা চাপিয়ে বসাটা প্রায় সমানই। কারণ সবসময় কেন জানি বাজিকর, পাঠক, সমালোচক সবার চিন্তাভাবনাকে এক পাশে সরিয়ে রেখেই নোবেল ঘোষিত হয়। যেন নোবেল ঘোষণায় মিলে গেলে সমস্যা আছে। অনেকেই পদার্থ, রসায়ন, অর্থনীতি বা চিকিত্সা বিজ্ঞানের নোবেল নিয়ে মাথা ঘামান না। বিজ্ঞানী আর গবেষকরা পাবেন—এটাই স্বাভাবিক। শান্তি নিয়ে একটা বিশাল উন্মাদনা থাকলেও রাজনৈতিক কচকচানি কিংবা আরও নানা কারণে সেটা নিয়ে আলোচনা সমালোচনা পত্রিকার কলামেই সীমাবদ্ধ থাকে। ‘বারাক ওবামা শান্তিতে নোবেল পেতে যাচ্ছেন’—এমন বাজি ল্যাডসব্রুকের ব্রোকাররা অন্তত ধরেননি। কিন্তু সাহিত্য যেন জুয়ার বিষয়। সেটা প্যাডি পাওয়ার, ল্যাডসব্রুক, ইপসসের হালের তালিকা দেখলেই বোঝা যায়। ব্রিটিশ রাজপরিবারের ভবিষ্যত্ রাজা লিটিল জর্জ আসার আগে শেষ এত ব্যস্ত ছিলেন বাজিকররা।
পত্রিকার জ্ঞানগর্ভ কলামগুলো কিংবা সাহিত্য বা ফিচার পাতার লেখকরাও বেশ ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। যে দেশের লেখকরা বাজিকরদের মঞ্চ কাঁপাচ্ছেন সেসব দেশের সংবাদমাধ্যমে শুধুই নোবেলের গল্প জায়গা করে নিয়েছে।
ল্যাডসব্রুক নামক বিশ্বখ্যাত বাজি কোম্পানির, সাহিত্যে নোবেলের শীর্ষে রয়েছেন জাপানের বিখ্যাত গল্পকার হারুকি মুরাকামি। তিনি গত ১০ বছর ধরে এই তালিকার শীর্ষস্থান ধরেই রেখেছেন। নোবেলটা না দিয়ে কোথায় যাবে—এমন ভাব ধরে জুয়াড়িরা প্রতি বছরই তাঁর ওপর বাজি ধরছেন। পাঠকরাও বেশ উদ্বেলিত তাঁকে নিয়ে বাজি ধরতে।
হারুকি মুরাকামিকে বলা হয় সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখক। ‘আই কিউ ৮৪’ বা ‘নরওয়েজিয়ান উড’-এর মতো জনপ্রিয় উপন্যাসের লেখক যদি নোবেল না পান তবে সাহিত্যের নোবেলের নিজেরই আফসোস হওয়ার কথা। যদিও নোবেল কমিটি বেশ ভাব গাম্ভীর্যের সঙ্গেই দাবি করে আসছেন, জনপ্রিয়তা নয়; আদর্শগতভাবে যিনি সাহিত্য রচনা করে বিশ্ব কাঁপিয়েছেন, সমাজ বদলেছেন—এমন কাউকেই নোবেল দেওয়া হয়। তবে বাজির সম্মুখ সমরে তো আর আদর্শ বিবেচনা করা হয় না। প্রত্যেক বছরই একই কাণ্ড ঘটে চলেছে। বাজিকরদের তালিকায় ঘুরে ফিরে একই নাম।
জাপানি লেখক মুরাকামির পরপরই ল্যাডসব্রুক আর প্যাডি পাওয়ারের তালিকায় রয়েছেন আমেরিকান লেখিকা জয়েস ক্যারোল ওটস। ৭৪ বছর বয়সী এই নারী নোবেল পেয়ে মার্কিনিদের সাহিত্যে নোবেলের যে দীর্ঘ বন্ধ্যাত্ব ঘোচাবেন—এমন আশার পাশাপাশি নারীবাদী সাহিত্যিকদের মনেও এ নিয়ে একটা স্বপ্ন।
সবচেয়ে মজার বিষয় হচ্ছে, ২০১২ সালের বাজির তালিকা আর এবারের লিস্টে খুব একটা পার্থক্য নেই। ঘুরে ফিরে বাজি একই লোকদের নিয়ে। আফ্রিকান সাহিত্যিক চিনুয়া আচেবে এ বছর মারা যাওয়ায় তিনি আর এই তালিকায় নেই। মো ইয়ান ঝুলিতে নোবেল পুরে ফেলায় তিনিও তালিকার বাইরে। নতুন করে কেউ উল্লেখযোগ্য এই তালিকায় ঢোকেননি। আবার কেউ বেরও হয়ে যাননি। ঘুরে ফিরে আগে পিছে সিরিয়ার কবি আদোনিস, আলজেরিয়ার আসিয়া জেজবার, কানাডার এলিস মুনরো, কেনিয়ার নাগুয়ি ওয়া থিয়োঙ্গো, চেক লেখক মিলান কুন্ডেরা তালিকার শীর্ষে এখনো রয়েছেন। আশা করা যায়, আরও কয়েক বছর এই লেখকরা যদি একান্ত মারা না যান তবে তাঁরাই তালিকা সমৃদ্ধ করে রাখবেন।
নোবেল ফ্যাক্টস : ল্যাডসব্রুক, প্যাডি পাওয়ার বা রয়টার্স ইপসস বা সিএনএনের জরিপ নিয়ে নড়ে চড়ে বসার কিছুই নেই। এগুলো শুধু পাঠকদের মত। সেটিকেই ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে বাজির তালিকা আর সংবাদমাধ্যমের শীর্ষ কলাম লেখার দায়িত্ব সাংবাদিকদের। বাকিটুকু নিয়ে আর না ভাবলেও চলে।
তবে এসব কথা শুনলে বিশেষজ্ঞরা তেড়ে আসবেন। নোবেল প্রাপ্তি অপ্রাপ্তি নিয়ে কতশত ফ্যাক্টস অ্যান্ড ফাইন্ডিংস বের করলেন, সেগুলোর কী হবে? সাহিত্য লিখে নোবেল অর্জন করলেও তার কত ভৌগলিক সীমা পরিসীমা আর বিচার বিবেচনা আছে সেটা শুধু গবেষকরাই জানেন।
এশিয়া ফ্যাক্টস : ২০১৩ সাল অন্যদেশের অন্যভাষার সাহিত্যপ্রেমীদের জন্য সাধারণ একটি বছর হলেও বাংলা ভাষাভাষীদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ বছর। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নোবেল প্রাপ্তির শতবর্ষ হলো এবার। কবিগুরুর নোবেল প্রাপ্তির শতবর্ষে আরেকটা নোবেল যদি সাহিত্যে বাগিয়ে নেয়া যেত তবে সেটা পোয়া বারো হতো। আফসোস, সে সুযোগটিই নেই। নোবেল মনোনয়ন প্রাপ্তদের তালিকায় মহাশ্বেতা দেবী ঠেলেঠুলে জায়গা করে নিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু সেই অবস্থান আশা জাগানিয়া কিছু নয়। বাঙালি সাহিত্য প্রেমিকরা বাজি আর ল্যাডসব্রুক বোঝে না, নইলে হারুকি মুরাকামির জায়গায় মহাশ্বেতা দেবী নির্ঘাত ঠাঁই করে নিতেন। শতবর্ষে নোবেল না আসুক আলোচনা তো হতে পারত।
তবে এবার এশিয়ায় নোবেল আসতেই পারে। জনপ্রিয় তালিকার সামনে, মাঝে কিংবা শেষের দিকে এশিয়ানদের অবস্থান একেবারে খারাপ না। তবে দুঃখজনক হচ্ছে, গত বছরই এশিয়ায় নোবেল এসেছে। রবীন্দ্রনাথের নোবেল প্রাপ্তির শতবর্ষ সুইডিশ অ্যাকাডেমি ঘটা করে পালন করলেও সে স্মরণে নোবেল দিয়ে দেবে—এতটা উদার তারা নয়। তাই হারুকি মুরাকামিকে এবারও পাঠকপ্রিয়তা দিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হবে বলেই মনে হচ্ছে। তবে যদি গতকালকের ঘোষণায় হারুকি মুরাকামিই পেয়ে থাকেন তবে পাঠক ধরে নিন, এ যাত্রায় বাঙালির কারণেই নোবেল প্রাপ্তি ঘটল এই জাপানির। রবীন্দ্রনাথের নোবেল প্রাপ্তির শতবর্ষ তো আর যেই সেই কথা নয়। বেশ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
আমেরিকা ওহ আমেরিকা : প্রতিবছর কোনো না কোনো মার্কিন নাগরিক ঠেলে ঠুলে নোবেলের তালিকায় নিজের নাম তুলে দেন। সেটা চিকিত্সা, শান্তি, অর্থনীতি, রসায়ন, পদার্থ—কোনো না কোনো খাতে হয়েই থাকে। তবে ১৯৯৩ সালে টনি মরিসনের সাহিত্যে নোবেল প্রাপ্তির পর আর গত ২০ বছরে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের সেই সৌভাগ্য হয়নি। এবার জনপ্রিয় আর গবেষকদের দুই তালিকাতেই আমেরিকানদের বেশ দাপট। হয়তো ইতোমধ্যে কোনো এক মার্কিনির ঘরেই চলে গেছে নোবেল। ।
বব ডিলান, ফিলিপ রথ, করম্যাক ম্যাকার্থি, টমাস পিনচন, জয়েস ক্যারোল, ই এল ডক্টোরো বাজিকরদের তালিকায় অনড় অবস্থানে আছেন। গত চার-পাঁচ বছর ধরে ঘুরে ফিরে আসছেন বাজিকরদের তালিকায়। তাই উনাদের কেউ পেতেই পারেন। গত বছর তো মার্কিন সাহিত্য সমালোচক মাইকেল বর্নি রীতিমতো গালমন্দ করে নোবেল কমিটিকে বিশাল চিঠি পাঠিয়েছিলেন। সেই চিঠির ভাবার্থ করলে দাঁড়ায়—নখরামি বন্ধ করে কি ফিলিপ রথকে নোবেল পুরস্কারটা দেওয়া যায়? নোবেল কমিটি অবশ্য নখরামি বন্ধ করেনি। মো ইয়ানের হাতে তুলে দিয়েছিল পুরস্কার। এবারের হাওয়া একেবারেই ভিন্ন। সিরিয়া যুদ্ধ, মার্কিন শাটডাউনসহ আরও নানা সংকট নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র সবসময় আলোচনার শীর্ষে। নোবেল সাহিত্য পুরস্কারে বাদ যাবে কেন? মার্কিন সাহিত্য সমালোচকরা দাবি করেন, মো ইয়ান নোবেল পেয়েছে শুধু মার্কিনিদের জন্য। তাদের কাছে হারুকি মুরাকামির চেয়ে মো ইয়ান অনেক জনপ্রিয়। আর বিশ্বের শীর্ষ শক্তির দেশের জনগণের কাছে জনপ্রিয় না হলে কীসের নোবেল। তবে সারাবছর জুড়েই এবার ঘুরে ফিরে যুক্তরাষ্ট্র আলোচনায়। এবার আমেরিকান বছর। ফিলিপ রথ বা ডন ডেলিল্লোর যে কেউ পেতে পারেন এই পুরস্কার। যদিও সুইডিশ অ্যাকাডেমি এই ধরনের বিষয় নিয়ে মুখ খুলতে একদম নারাজ। কেউ না কেউ তো পাবেই।
নারীদের নোবেল : বাজিকরদের তালিকা ছাড়াও সবস্থানে নারী সাহিত্যিকদের আনাগোনা বেশ চোখে পড়বার মতো। বলা যায় না চার বছরের ব্যবধানে আবার না নোবেল কোনো নারীর বিশাল হাতব্যাগে উঠে যায়। ২০০৯ সালে হার্টা মূলার নোবেল সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছিলেন। এবারের তালিকায় হারুকি মুরাকামির পরপরই রয়েছেন জয়েস ক্যারোল ওটস। বারবার এই নারীর কথা উঠে আসছে। ৭৪ বছর বয়সী ওটস ন্যাশনাল বুক অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন এবং তিনি অতিপ্রজ লেখিকা। ৫৬টি উপন্যাস, ৩২টি ছোটগল্পের সংকলন, আটটি কাব্যগ্রন্থসহ আরও অনেক প্রকাশনা রয়েছে তাঁর। আমেরিকানদের প্রত্যাশা, দীর্ঘ দুই দশকের খরা কাটিয়ে সাহিত্যে নোবেল আবার তাঁর হাত ধরেই আমেরিকায় ফিরে আসবে।
তারপরেই আছেন কানাডার নারী এলিস মুনরো ও মার্গারেট অ্যাটউড। আলজেরিয়ার আসিয়া জেজবার, ইতালির দেসিয়া মারিয়ানিও তালিকায় বেশ জাঁকিয়ে রয়েছেন।
গত ১১২ বছরে সাহিত্যে নোবেল পাওয়া নারীর সংখ্যা মাত্র ১২ জন। এবার এই তালিকায় আরেকজন নারী হলে মন্দ হয় না। অনেক সমালোচকরা বলছেন, যদি নারী লেখক নোবেল পান তবে মার্কিন লেখিকা জয়েস ক্যারোল ওটসের সঙ্গে মার্গারেট অ্যাটউডও পেতে পারেন। মাত্র চার বছরের মাথায় আরেক নারী নোবেল পাবেন—এমনটা দুরাশা হলেও ভাবতে ক্ষতি কী?
আশা নিরাশা ফ্যাক্টস : গতবার চিনুয়া আচেবে তালিকায় ছিলেন বেশ জাঁকিয়ে এবার মৃত্যু তাঁকে বাদ দিয়েছে। কিন্তু আফ্রিকান লেখকরা পিছিয়ে নেই। কেনিয়ার নাগুয়ি ওয়া থিয়োঙ্গোর কথা বারবার আলোচিত হচ্ছে। বলা তো যায়না, কেনিয়াতে নোবেল যেতেও পারে। তার সঙ্গে এই তালিকায় আছেন সোমালিয়ার নুরুদ্দিন ফারাহ। তাঁকে অবশ্য ল্যাডসব্রুকের একেবারে শেষের দিকে দেখা গেলেও সমালোচকরা নুরুদ্দিন ফারাহকে এগিয়ে রেখেছেন।
২০১১ সালের প্রায়-নোবেল বিজয়ী সিরিয়ার কবি আদোনিসের কথা ভুলে যাওয়া যাবে না। তিনি পেয়েও যেতে পারেন নোবেল। আরব বসন্তখ্যাত কবি বলে কথা। এখনো বসন্তের ফুলের রেণু ভেসে বেড়াচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে বাতাসে। অনেক বিশ্লেষক বলেন, নোবেল পেতে একটা মিনিমাম যুক্তি থাকা লাগে। আদোনিসের ক্ষেত্রে একটা যুক্তি—সিরিয়া যুদ্ধ নিয়ে এই রমরমা অবস্থায় আদোনিসের চেয়ে শক্তিশালী কবি আর কে আছেন। এগুলোকে অবশ্য বাজিকররা নিজেরাই আশা-নিরাশা ফ্যাক্টস বলে চিহ্নিত করেছেন। ফ্যাক্টস অব হোপস। কার না ইচ্ছা করে নোবেলটা বাড়িতে নিয়ে যেতে। সুইডিশ নোবেল অ্যাকাডেমি অবশ্য এসব কথা একেবারেই মাথায় নিচ্ছেন না। কারণ গত ফেব্রুয়ারি মাসে আবেদনের কাজ শেষে এপ্রিল-মে মাসের মধ্যে চূড়ান্ত মনোনীতদের তালিকা তৈরি শেষ। আগস্টের শেষ দিন পর্যন্ত ঝেড়ে তাঁদের বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন নোবেল কমিটি। সেপ্টেম্বরে চূড়ান্ত বৈঠক। সবমিলিয়ে তাঁদের এখন কাজ শুধু সবার আলোচনা সমালোচনা দেখা।
কাদের মনোনয়ন দিয়েছিলেন সেই তালিকাও আগামী ৫০ বছরে প্রকাশ না করার কথা রয়েছে। তাই ভাবনা-চিন্তা করে কোনো লাভ নেই। যিনি পেয়েছেন তিনি রীতিমতো চুলচেরা বিশ্লেষণের পরেই নোবেল ঘরে নিয়েছেন।
