নোবেল প্রত্যাশীদের রন্ধনশালায়

আপডেট : ১০ অক্টোবর ২০১৩, ১৮:২২
নোবেল পুরস্কার নিয়ে গুঞ্জন নতুন কিছু নয়। প্রতিবারই হয়। এবারও এর ব্যতিক্রম নয়। আলোচনার শীর্ষে থাকা কয়েকজনের মধ্যে আমার এই লেখা সীমাবদ্ধ থাকবে। এদের মধ্যে—ডন ডেলিল্লো, ফিলিপ রথ, মিলান কুন্ডেরা ও হারুকি মুরাকামি আছেন। সেই সাথে মূল তালিকা থেকে বাদ যাচ্ছেন না সিরিয়ার অ্যাডোনিস, কানাডার এলিস মুনরো এবং আফ্রিকার নুগুগি ওয়া থিয়োঙ্গো। ২. শুরুতেই বলি যুক্তরাষ্ট্রের লেখক ডন ডেলিল্লো-র কথা। তিনি একাধারে একজন ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, ছোটগল্পকার ও প্রাবন্ধিক। তাঁর লেখায় তিনি বহুবিধ বিষয়ের অবতারণা করেছেন। তন্মধ্যে ভাষার দুর্বোধ্যতা, স্নায়ুযুদ্ধ, ডিজিটাল যুগের উত্থান ও বৈশ্বিক সন্ত্রাস অন্যতম। ১৯৮৫ সালে ডেলিল্লো ‘হোয়াইট নয়েজ’ উপন্যাসটির জন্য ব্যাপকভাবে পাঠক সমাদৃত হন। এর পরবর্তী বই ‘লিবরা’ বাজার কাটতিতে আমেরিকায় শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে। পুলিত্জার পেয়েছেন দুইবার। যথাক্রমে ১৯৯২ ও ১৯৯৮ সালে। প্রথমবার ‘মাউ-২’ উপন্যাসের জন্য। দ্বিতীয়টি পান আন্ডারওয়ার্ল্ড নামক উপন্যাসের জন্য। ডেলিল্লো আমাদের জানান, ‘বিপদাপন্ন সময়ে আমাদের বাস’। তাই এ বিষয়টি ঘুরেফিরে তাঁর নানা গল্প-উপন্যাসে এসেছে। ২০০৫ সালে এক সাক্ষাত্কারে তিনি বলেন, ‘লেখকদের অবশ্যই সমাজসৃষ্ট প্রচলিত ধারাকে প্রতিবাদ করতে হবে। পুঁজিবাদের করাল গ্রাস থেকে সমাজ রক্ষায় অপ্রথাগত হওয়া খুবই জরুরি। লেখকদের রাষ্ট্র কর্তৃক অন্যায়ভাবে চাপিয়ে দেওয়া কোনো বিষয় মেনে নেয়া উচিত নয়’। সমালোচকেরা ডন ডেলিল্লো-কে একজন উত্তরাধুনিক লেখক হিসেবে অভিহিত করেছেন। বিচ্ছিন্নতাবাদ, ব্যক্তির দ্বন্দ্ব, সংস্কৃতির বহুত্ববাদ, প্রান্তিক মানুষের সংগ্রাম ইত্যাকার বিষয় তাঁকে অনেক বেশি উত্তরাধুনিক করে তুলেছে। গণমাধ্যমের ভূমিকা এবং সংবাদের অর্থ-বিচ্যুতি ও বিভ্রান্তিমূলক প্রচার তাঁর লেখায় মূর্ত হয়েছে। যেমন—আন্ডারওয়ার্ল্ড উপন্যাস, যার মূল বিষয়ই গণমাধ্যম, বিশেষ করে, দৃশ্যমাধ্যম। ব্যক্তির identity crisis ও সংস্কৃতির hibridity-এ বিষয়কে কেন্দ্র বেড়ে উঠেছে তাঁর আরেক অন্যতম উপন্যাস ‘হোয়াইট নয়েজ’। সমসাময়িক বিষয়াবলি তাঁর উপন্যাসে খুব ঘটা করে এসেছে। হ্যারল্ড ব্লুমের মতো জগদ্বিখ্যাত বোদ্ধা সমালোচক ডন ডেলিল্লো-কে তাঁর সময়ের চারজন বিখ্যাত লেখকদের একজন বলে মনে করেন। বাকি তিনজন হলেন যথাক্রমে—থমাস পিনচন, ফিলিপ রথ ও করম্যাক ম্যাকার্থি। পাঠক, এতক্ষণে নিশ্চয় বুঝতে পেরেছেন, ডন ডেলিল্লো কেন নোবেল পুরস্কারের দাবি করতে পারেন। তবে নোবেল কমিটি অনেক বছর ধরে ‘দিচ্ছি-দিব’ ভাব দেখিয়ে এড়িয়ে যাচ্ছে সময়ের এত বড় একজন লেখককে। কে জানে ২০১৩-ই হতে পারে হ্যারল্ড উল্লেখিত চারজনের মধ্যে যেকোনো একজনের বছর! ৩. পৃথিবীব্যাপী জীবিত লেখকদের মধ্যে মিলান কুন্ডেরা অসামান্য। নোবেল কমিটি বিশেষ ভূগোল বিবেচনায় বারবার এড়িয়ে যায় কুন্ডেরার মতো বিশ্বসেরাদের একজনকে। চেক রিপাবলিকের এ লেখক ১৯৭৫ সাল থেকে ফ্রান্সে নির্বাসিত জীবন যাপন করছেন। নাগরিকত্ব পাওয়ার পর এখন তিনি নিজেকে ফরাসি লেখক হিসেবেই দাবি করতে বেশি পছন্দ করেন। গণমাধ্যমে আলাপচারিতা খুব একটা পছন্দ করেন না। তাঁর লেখা অধিকাংশ বই চেকোস্লোভাকিয়ার সমাজতন্ত্রবাদী অঞ্চলসমূহে পুড়িয়ে ফেলা হয়েছিল। তাঁর বহুল আলোচিত দুটি উপন্যাসের নাম ‘জোকস’ ও ‘দ্য আনবেয়ারেবল লাইটনেস অব বিয়িং’। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অভিজ্ঞতা দ্বারা তাঁর আদর্শ প্রভাবিত। চেকোস্লোভাকিয়ার যে প্রজন্মের যুদ্ধপূর্ব গণতান্ত্রিক রিপাবলিক চেকোস্লোভাকিয়া সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই, সে প্রজন্মের একজন প্রতিনিধি কুন্ডেরা। রাজনৈতিক অযাচিত হস্তক্ষেপ তাঁর লেখা ও শিক্ষাজীবনকে বারবার ব্যাহত করেছে। কুন্ডেরার লেখা এত বেশি দর্শননির্ভর যে অনেকে তাঁর দর্শন ও ফিকশন—এ দুইয়ের মাঝে ব্যবধান করতে পারেন না। শুরুর দিকে তাঁর লেখা ছিল অনেকটা pro-communist কিংবা সমাজতন্ত্র পরিপন্থি। ধীরে ধীরে কুন্ডেরা দর্শনভিত্তিক লেখায় খুব বেশি ঝুঁকে পড়েন। তখন রাজনীতি কিংবা সমাজনীতি তাঁর লেখা থেকে বাদ যেতে থাকে। ইউরোপীয় রেনেসাঁ যুগের অনেক দার্শনিক ও লেখক যেমন—বোকাসিও, হাইডেগার, মুসিল, কাফকা, ডিডেরট প্রমুখদের দ্বারা তিনি খুব বেশি প্রভাবিত হয়েছেন। চেক সমাজতন্ত্রবাদের অন্তর্নিহিত শূন্যতা ও কপটতা দেখে তিনি প্রচণ্ড ব্যথিত হন। রাগে-ক্ষোভে প্রিয় শহর প্রাগ ছেড়ে পাড়ি জমান ফ্রান্সে। এক সাক্ষাত্কারে বলেছেন, ‘সমাজ পরিবর্তন করতে চেয়েও পারলাম না। কেবল বাক-স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে ছেড়ে যাচ্ছি প্রিয় জন্মভূমি’। বলতে ইচ্ছে হচ্ছে, মার্কেসকে নোবেল না দিলে যেরকম অন্যায় হতো নোবেল কমিটির, ঠিক তেমনি কুন্ডেরাকে বঞ্চিত করলে কম অন্যায় হবে না। ৪. বর্তমান বিশ্বে উত্তরাধুনিক সাহিত্যের একজন গুরুত্বপূর্ণ লেখক হারুকি মুরাকামি। জাপানে সবচেয়ে বেশি বিক্রিত বইয়ের লেখকদের মধ্যে তিনি একজন। প্রায় প্রতিবারই নোবেল পুরস্কার ঘোষণার প্রাক্কালে তাঁর নাম নানাভাবে আলোচনার টেবিলে ঝড় তোলে। পরাবাস্তববাদ, নিঃসঙ্গতা, ঘুণেধরা সমাজব্যবস্থা প্রভৃতি বিষয় তাঁর লেখায় প্রধান হয়ে দেখা দিয়েছে। ছোটবেলা থেকেই মুরাকামি পাশ্চাত্য সাহিত্য ও সংগীত দ্বারা খুব বেশি প্রভাবিত। এ প্রভাবই তাঁকে জাপানের অপরাপর লেখকদের চেয়ে আলাদা করেছে। বিশেষভাবে শাস্ত্রীয় সংগীতের প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল প্রবল। এ বোধ থেকে সংগীতপ্রধান কিছু উপন্যাসও তিনি লিখেছেন। সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি ম্যারাথন দৌড়বিদ হিসেবেও তাঁর সুখ্যাতি রয়েছে। ২৯ বছর বয়সে মুরাকামি প্রথম ফিকশন লেখা শুরু করেন। তাঁর ভাষ্যমতে, এর পূর্বে তিনি কিছুই লেখেননি। তখন আর দশজন সাধারণ মানুষ যা করতেন, তিনিও তা-ই করতেন। প্রথম উপন্যাস ‘হিয়ার দ্য উইন্ড সিং’ লিখতে তিনি উদ্বুদ্ধ হন একটি বেসবল খেলা দেখতে গিয়ে। এটি একটি ট্রিলজির অংশ। এর দ্বিতীয় অংশটির নাম ‘পিনবল’। সর্বশেষটির নাম ‘দ্য ওয়াইল্ড স্লিপ চেজ’। তিনটি উপন্যাস একত্রে ‘ট্রিলজি অব দ্য রেট’ নামে পরিচিত। তৃতীয় উপন্যাসটি লেখার ক্ষেত্রে মুরাকামি বলেন, ‘আপনি যখন একটি ভালো গল্প পড়তে থাকেন, একনাগাড়েই পড়েন। কোনো বিরতি নিতে চান না। ঠিক তেমনি আমিও একটি ভালো গল্প লেখা শুরু করলে লিখতেই থাকি। গল্পবলার এ এক অপার আনন্দ’। ২০০২ সালে লেখা ‘কাফকা অন দ্য সোর’ তাঁর বহুল আলোচিত ও সমাদৃত উপন্যাসসমূহের একটি। কিছু ছোটগল্পও লিখেছেন। চব্বিশটি ছোটগল্প নিয়ে তাঁর অন্যতম ছোটগল্প সংকলন ‘ব্লাইন্ড উইলো, স্লিপিং উইমেন’ ২০০৬ সালে প্রকাশিত হয়। এমন একজন সংবেদী লেখককে বারবার কেন নোবেল কমিটি এড়িয়ে যায় এর জবাব পাঠকদের কাছে নেই। এ পুরস্কারে তাঁকে সম্মানিত করতে পাঠকদের কোনো ‘না’ থাকার কথা না। ৫. ১৯৫৯ সালে ‘গুডবাই কলম্বাস’ শিরোনামে একটি উপন্যাস লিখে বিশ্বব্যাপী পাঠকসমাজের নজর কাড়েন যুক্তরাষ্ট্রের উপন্যাসিক ফিলিপ মিলটন রথ। ১৯৩৩ সালে তিনি নিউজার্সিতে জন্মগ্রহণ করেন। বোধ করি, জন্মস্থানের প্রতি প্রবল টানের কারণেই হয়তো তাঁর প্রায় উপন্যাসের সেটিং নিউজার্সি। আত্মজীবনীমূলক অনেক উপাদানের কারণে তাঁর লেখায় বাস্তব ও ফিকশানের মধ্যে বিদ্যমান পার্থক্য ঘুচে যায়। আমেরিকাতে রথ তাঁর সমসাময়িক সব সাহিত্যিকের তুলনায় অনেক বেশি সমাদৃত ও পুরস্কারে ভূষিত। রথ তাঁর উপন্যাসগুলোতে অপরাপর চরিত্রগুলোর সাথে লেখক রথের একটি সংযোগ স্থাপন করতে সদা সচেষ্ট থাকেন। এমনকি ‘ফিলিপ রথ’ নামে সক্রিয় চরিত্রও আমরা দেখতে পাই রথের ‘দি প্লট অ্যাগেইনস্ট আমেরিকা’ নামক উপন্যাসে। উত্তরাধুনিক আখ্যানের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য—লেখক নিজেই তাঁর আখ্যানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ যা রথের অধিকাংশ উপন্যাসে বিদ্যমান। প্রথম উপন্যাস গুডবাই কলম্বাস-এর কথা একটু না বললেই নয়। মধ্যবিত্ত ইহুদি আমেরিকানদের জীবনে কৌতুকবোধ বলতে কোনো বিষয়ের অস্তিত্ব নেই—এমন একটি থিম বা ভাব নিয়ে বেড়ে উঠেছে উপন্যাসটি। সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদের যুগে একদিকে ইহুদি সাম্যের ডাক, অপরদিকে অস্তিত্বসংকটে নিমজ্জিত মধ্যবিত্ত ইহুদিদের নৈতিকতা ও মূল্যবোধ—এ দুইয়ের মাঝে যে দ্বন্দ্ব তা নিয়ে প্রশ্ন করার তীব্র আকাঙ্ক্ষা থেকেই উপর্যুক্ত ডিসকোর্সের জন্ম দিয়েছিলেন ফিলিপ রথ। তাছাড়া রথের ফিকশানে, ইহুদি আমেরিকানদের জীবনাচরণে একজন পুরুষের বহু কামসঙ্গী থাকার জাত প্রবণতাটি বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। রাজনীতিকে ব্যঙ্গ করে লেখা উপন্যাসও আছে রথের। এক্ষেত্রে ‘আওয়ার গ্যাং’ বা ‘অপারেশন শাইলক’ উপন্যাসের নাম নেয়া যায়। সবকিছু মিলিয়ে ফিলিপ রথ যে ২০১৩ সালের সাহিত্য শাখায় নোবেলের যোগ্য দাবিদার এতে কোনো সন্দেহ নেই। ৬. যাহোক, ভবিষ্যদ্বাণী তো সর্বক্ষেত্রে ঠিক হয় না। তবুও অনেক যোগ্য সাহিত্যিকের মধ্য থেকে যাচাই-বাছাই শেষে কিছু নাম উল্লেখ করা আর কি! কানাডার অ্যালিস মুনরো, হাঙ্গেরির লাজলো ক্রাজনাহোকাই, সিরিয়ার অ্যাডোনিস এবং আফ্রিকার নুগুগি-উল্লেখিত সাহিত্যরথীদের লেখা বিশ্লেষণ করলে এটি অনেকটা প্রশ্নাতীতভাবেই বলা যায় যে, তাঁরা প্রত্যেকেই তাঁদের অভিনবত্বের কারণে সাহিত্যে নোবেলের প্রত্যাশিত জন। আবার কে জানে রবি ঠাকুরের নোবেল প্রাপ্তির শততম এই বছরে সব গণককে বোকা বানিয়ে পুরস্কার কিনা চলে যায় উমবের্তো একো কিংবা অমিতাভ ঘোষ-এর কাছে।