অরুনীতা ও একটি সূর্যাস্ত

আপডেট : ১০ অক্টোবর ২০১৩, ১৮:২৩
প্রায় চার বছর পর কলকাতার নেতাজী সুভাষ চন্দ্র আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামতেই লক্ষ করলাম, চারপাশ বেশ বদলে গেছে। ইমিগ্রেশন থেকে কাস্টমস—সবকিছুতেই পেশাদারি ছোঁয়া। আধুনিকতার ছাপ পড়েছে সবখানেই। দেখে শুনে ভালোলাগার মতো অনুভূতি তৈরি হয়। চার বছর আগে যে এয়ারপোর্টটি অসহ্য মনে হতো তা এখন আপাদমস্তক কেতাদুরস্ত। এয়ারপোর্টের সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে ট্যাক্সি নিয়ে সোজা পার্কস্ট্রিট চলে এলাম। এখানে হোটেল পার্ক ইন্টারন্যাশনালে থাকার ব্যবস্থা আগেই করা ছিল। সাত মাস আগেই এখানে আমার আসার কথা—অরুনীতাকে সেরকমই বলেছিলাম, নানা ব্যস্ততায় এখানে আসতে দেরি হয়ে গেল। ওর সাথে প্রথম পরিচয় প্লেনে। সে এখন আর নেই। পরের অংশটুকু নাটকের মতো এক বিয়োগান্তক ঘটনা। অরুনীতা তার বাবা-মা ও বোনসহ থাকত সল্ট লেকের চ্যাটার্জী হোমে। সেখান থেকে হোটেল পার্কে ফিরতে প্রায় বারোটা বেজে গেল। রিসিপশনে মৃদু শব্দে গান বাজছে। রিসিপশনে বসা সুন্দরী মেয়েটি সলজ্জ ভঙ্গিতে আমাকে বলল—আর ইউ ওয়ান্ট টু এনজয় লাইভ মিউজিক? ইশারায় তাকে না বলে লিফটের দিকে পা বাড়ালাম। পার্ক হোটেলের সুদৃশ্য একটি কামরায় আমার থাকার ব্যবস্থা হয়েছে। সিলিংয়ে বিভিন্ন রংয়ের বাতি বসানো। তার একটা জ্বালিয়ে জানালার পর্দা সরিয়ে দিলাম। জানলা দিয়ে রাতের কলকাতা দেখা যাচ্ছে। চারদিকে অঝোর বৃষ্টি। ব্যাংককে সেদিন এমনই বৃষ্টি ছিল। প্লেনে অল্প সময়ের পরিচয়েই অরুনীতা আমাকে দাদা বলে ডাকছিল। খুব আপনজনের সাথে মানুষ যেরকম কথা বলে, সেও এই অল্প পরিচয়েই আমার সাথে এমনভাবেই কথা বলছিল। এয়ারপোর্টে বিদায় নেওয়ার পরে একদিন সে ব্যাংককে আমার সঙ্গে দেখা করবে বলে হোটেল মিয়ামিতে চলে এল। এক বিষণ্ন গোধূলিতে পরাজিত মলিন মুখ নিয়ে মেয়েটি আমার এখানে আসে। প্রথমে ওকে ফিরিয়ে দিলেও, ওর মুখের দিকে তাকিয়ে হোটেল মিয়ামির আমার স্যুটে ওকে আশ্রয় দিয়েছিলাম। মাসের পর মাস হোটেল মিয়ামিতে থাকার কারণে হোটেল মালিক বিনে পয়সায় একটা এক্সট্রা বেডের ব্যবস্থাও করে দিয়েছিল আমার স্যুটে। প্লেনে অরুনীতাকে আমার ভিজিটিং কার্ড দিয়েছিলাম। হোটেল এম্বাসাডারেই আমার অফিস। আমার ফোন বন্ধ থাকায় ম্যানেজার তাকে অনেকক্ষণ বসিয়ে রাখে। অধৈর্য হয়ে মেয়েটি প্রায় জোর করেই আমার স্যুটে এসে আমার ভাতঘুম ভাঙায়। ছলছলে চোখে বলেছিল—তার ব্যাংককে বেড়ানোর কথা, বামরুনগ্রাদে ডাক্তার দেখানোর কথা, রিপোর্ট পাওয়ার পরেই ননবেঙ্গলি হিন্দি সিরিয়ালের নায়কের মতো দেখতে ফ্রেঞ্চ কাটের দাড়িওয়ালা ছেলেবন্ধুটির পালানোর আদ্যোপান্ত। কাতর কণ্ঠে বলছিল, এখনই আমার ব্যাগগুলো ওখান থেকে নিয়ে আসুন প্লিজ, আই অ্যাম লিটল বিট সিক। টেবিলে হাজার তিনেক ডলার রেখে বলল, এগুলো আমার জন্য খরচ করুন। রাতে অরুনীতার জ্বর এল। আকস্মিক এই ঘটনার পুরোটাই আমার থাই আইজীবী রুনকে জানালাম। ব্যাংককে সে বেশ প্রভাবশালী। একটু সময় নিয়ে বলল, নো প্রোব্লেম। আমার ম্যানেজার কমলকে দিয়ে অরুনীতাকে এম্বাসাডার থেকে চেক আউট করালাম। ফোনে বললাম, ভিকিকে দিয়ে ওর ব্যাগগুলো আমার রুমে পাঠাও। ভিকি আমার থাই স্টাফ। সে বেশ হাসিখুশি। দিনে হাজারবার আয়নায় মুখ দেখে। কিছুক্ষণ পর পর চুলে চিরুনি চালায়। কমল ভিকিকে বিয়ের কথা বললে তার এক জবাব—তোমাকে নয় তোমার বসকে বিয়ে করব। আমি সাধারণত ভাতঘুম সেরে গরম জলে স্নান করে টাইয়ের সাথে জ্যাকেট বা কোট জড়িয়ে সন্ধ্যায় আমার অফিস কাম বারে যাই, রাত ১-২টা পর্যন্ত ওখানে কাটাই। সেদিন যাওয়া হয়নি। অরুনীতার ব্যাগগুলো রুমে নিয়ে আসার সময় সদা হাস্যোজ্জ্বল ভিকিও চুপ। পরে নাকি কমলকে সে বলেছিল, তোমার বস মিথ্যা বলেছে। সে তো বিবাহিত। ঘরে তার সুন্দরী বউ বসে আছে। রাতে অরুনীতার জ্বর চলে যায়। এমনিতে আমি কম কথা বলি। ওকে দেখলাম একটু সময় নিয়ে। টানা টানা চোখ, বেশ মায়াবী। এলোমেলো চুলে চিরুনি বোলাতে বোলাতে আমার দিকে না তাকিয়েই বলে—আমাকে সবাই নীতা বলে ডাকে। খুব ডিস্টার্ব করলাম আপনাকে। আমার থাকার জন্য পাশে একটা ঘরের ব্যবস্থা করে দিলেই হবে। তারপর সে তার এতদিনের জমানো কথা বলতে শুরু করে। বলতে বলতে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে। সন্ধ্যার আবছা আলোয় তার কথা শুনতে শুনতে আমার মনটাও আর্দ্র হয়ে ওঠে। বললাম, ‘রাতে কী খাবে নীতা?’ ‘বিফ চিলি আর ডাল সাথে কাঁচা লংকা’ ছোট্ট জবাব তার। নাসির ভাইকে ফোনে খাবারের অর্ডার দিলাম। রাতে খেতে খেতে সে আমাকে জানায়, টেস্টগুলো আবার করাতে চায় এখানে। ঠিক করলাম, আগামীকাল সকালে অরুনীতাকে নিয়ে সেন্ট লুইসে ডাক্তার কেমির কাছে যাব। কেমি আমার বিশেষ পরিচিত। ডাক্তার কেমির সাথে দেখা করতেই সে গুডমর্নিং সম্ভাষণ করে হাসতে হাসতে বলে, ভেরি কিউট লেডি ইউর ওয়াইফ ইজ, মিস্টার হোসাইন! কাগজগুলো হাতে দিতেই কেমির মুখের রং পাল্টে যায়। সে রক্ত পরীক্ষা ছাড়া আর কিছু দেয়নি। প্রায় তিনঘণ্টা পর কেমি আমাদের কেবিনে এসে জানায়, স্যরি হোসাইন, শি হ্যাজ ওলরেডি এফেক্টেড। কেমির ভাষা বুঝল অরুনীতা। সে কিছু মেডিসিন দিল, সাথে অ্যাডভাইসও। সেন্ট লুইস থেকে মায়ামি হোটেল। আমরা একসঙ্গে ওখানকার কিছু মন্দির ঘুরে বেড়িয়েছি। কখনো রবিনসনে গিয়েছি, কখনো ম্যাগডোনালসে। একসাথে মুভি দেখেছি। একদিন সে নিজের হাতে রান্না করে খাওয়ালো আমাকে। ঘুমন্ত নীতার মুখ দেখে মনে হতো, পেন্সিলে আঁকা এক পরি। খুব সাজগোজ করে একদিন আমার অফিসে এসেছিল। ওকে দেখে ভিকি বেশ চুপচাপ হয়ে গিয়েছিল। এক ফাঁকে আমার টাইয়ের নটে হাত বুলিয়ে অনুযোগের সুরে বলেছিল—এই টাইয়ে ভালো লাগছে না তোমাকে। ওটা বদলে নাও। দেখি, রবিনসনের প্যাকেটে মোড়ানো একটা লাল টাই। গতকাল তোমার সাথে যখন ম্যাগডোনলসে যাই তোমাকে ফাঁকি দিয়ে কিনেছি। তাকালাম ওর চোখে, মনে হয় সে চোখে অনেক মায়া লুকানো। আমাদের নিয়ে বাঙালি বন্ধুদের টিপ্পনি, আশপাশের থাই মেয়েদের মধ্যেও কানাকানি ছিল। কিন্তু আমি তো জানি, এই বিদেশে একাকী ভেঙেপড়া মেয়েটিকে আমি কতটা স্নেহ করতাম। ওর স্বপ্ন ছিল অনেক। সে যাপন করতে চেয়েছিল সুন্দর একটি জীবন। দেখতে দেখতে তিনদিন কেটে যায়। নীতা কলকাতা চলে যাবে। বলল—দাদা, আমি তো আর বেশিদিন বাঁচব না। তুমি তো একা থাকো, জীবনের শেষ কটা দিন তোমার কাছে থাকতে চাই। ‘ধুর পাগলি! একি হয়?’ বলে ওকে সান্ত্বনা দিলাম। নীতার চোখে জল। তুমি এয়ারপোর্ট পর্যন্ত আমার সাথে যাবে কিন্তু। আগেই রুনকে বলেছিলাম ওর শারীরিক অবস্থার কথা। আমি ভিআইপি লাউঞ্জ ব্যবহার করতে পারি। থাই এয়ার ওয়েজের বিমানটি রানওয়ে ছাড়ার ঠিক পনেরো মিনিট আগে অরুনীতা আমার কাছ থেকে বিদায় নেয়। চোখভরা জল নিয়ে চিবুকে চুমো খেতে খেতে বলেছিল, তুমি কলকাতা আসবে তো, দাদা? এখন মাঝ রাত। কলকাতার আকাশে ঝিমানো চাঁদ। পার্ক হোটেলের মিউজিক ক্ষীণ হয়ে আসছে। ব্যাংককের কিছু স্মৃতি ভাবতে ভাবতেই সকালে ঘুম ভাঙে অরুনীমার ফোনে। অরুনীমা নীতার ছোট বোন। —দাদা আমি চলে এসেছি। ও রিসিপশনে দাঁড়িয়েই কথাগুলো বলছিল। চোখগুলো অরুনীতার মতোই, গায়ের রংটা শ্যামলা। বেশ চটপটে। এখান থেকে আমরা যাব কালীঘাট মন্দিরে, পুজো দেব অরুনীতার আত্মার প্রশান্তি কামনা করে। তারপর দুপুরের খাবার খাব ওদের সাথে। দুপুরে খেতে খেতে সল্টলেকের অরুন চ্যাটার্জীর ‘চ্যাটার্জী হাউজে’ গল্পে গল্পে বেশ আড্ডা জমে উঠল। রবীন্দ্রনাথ, সত্যজিত্, অমর্ত্য সেন থেকে প্রফেসর ইউনূছ পর্যন্ত। এরা সবাই তো ভারতবর্ষের অহংকার। দার্জিলিং থেকে কক্সবাজার—পুরোটাই তো বাংলার। বাঙালির অর্জন নিয়ে বেশ অহংকার করেন তিনি। বাহারি পদের আহার শেষে অরুন চ্যাটার্জী বিষণ্ন মুখে বলেন—বাবা, আজকের রাতটি এখানে কাটিয়ে যাও। নীতা প্রতিক্ষণে শুধু তোমার কথাই বলত। ওর অবসাদ-বিষণ্নতার দিনগুলোতে তুমি ওকে সময় দিয়েছ। ও বলেছে, তুমি ওকে দুটি মুভি দেখিয়েছ ‘ম্যান অন ফায়ার’ এবং ‘ক্যাসাব্লাংকা’। কলকাতায় সে প্রায়ই বলত, দাদা একদিন এখানে ঠিক আসবে, বাবা। তুমি এসেছ ঠিকই, কিন্তু তোমার সেই বোনটি এখন আর নেই। বিশ্বাস করো, ওই মারাঠি স্কাউন্ড্রেলটার জন্যই আমার মেয়ের জীবনটা ধ্বংস হয়ে গেল। আমি থামালাম তাকে। বললাম, পৃথিবীর সব রহস্যের কারণ আমরা জানি না। তিনি আবেগ ধরে রাখতে না পেরে আবার বললেন, ব্যাংককে তুমি নীতার জন্য যা করেছ, তুমি তো সাক্ষাত্ দেবতা। জবাবে বললাম, আমাকে ছোট করবেন না। আমার ব্যাংকক-স্মৃতির অংশবিশেষ হলো কলকাতার অরুনীতা। সে আলেয়ার মতো আমার জীবনে ক্ষণিক সময়ের জন্য উপস্থিত হয়েছিল, কিন্তু তার স্মৃতি এখনো আমার কাছে বেশ উজ্জ্বল। হোটেল পার্কের বারান্দায় বৃষ্টিভেজা বাতাসে আমি আর বন্ধু ডক্টর মলয়। মলয় বলল, জানো মাসুদ, কলকাতার মেয়েরা অবাঙালি ছেলেদের প্রতি খুব দুর্বল। এখানকার ব্যবসা, চাকরি—সব ওদের হাতে। অরুনীতার মতো অনেকেই... আমি ওকে থামিয়ে দিলাম। অরুনীতা এখন অতীত। সিদ্ধান্ত নিলাম, কলকাতা ভ্রমণ সংক্ষিপ্ত করে দ্রুত ব্যাংকক ফিরব।