রক্তাক্ত প্রান্তর

একটি বিয়োগান্তক উপাখ্যান

আপডেট : ১০ অক্টোবর ২০১৩, ১৮:২৪
বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী রেপার্টরি প্রযোজনা হিসেবে মঞ্চে এনেছে প্রখ্যাত নাট্যকার মুনীর চৌধুরীর জনপ্রিয় নাটক ‘রক্তাক্ত প্রান্তর’। পশ্চিমা উপস্থাপন রীতিতে রচিত এ নাটকটি শিল্পকলা একাডেমী যাত্রা হিসেবে উপস্থাপন করেছে। ইতিপূর্বে শিল্পকলা একাডেমীর বেশ কয়েকটি জনপ্রিয় রেপার্টরি প্রযোজনা থাকলেও ‘দেশজ সংস্কৃতির বিকাশ ও আন্তর্জাতিক সংস্কৃতির মেলবন্ধন’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় রক্তাক্ত প্রান্তর ইতিমধ্যে দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। গত ২৭ জুন উদ্বোধনী প্রদর্শনী থেকে শুরু করে ৪ অক্টোবর পর্যন্ত যাত্রাপালাটির ৪টি প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। বাংলা সংস্কৃতির জনপ্রিয় একটি ধারা যাত্রাশিল্প। কালের দূষণে মৃতপ্রায় এই শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করতে শিল্পকলা একাডেমী এই প্রকল্প হাতে নিয়েছে। আর বিদেশি পালাগুলোর ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে দেশি নাট্যকারদের যাত্রাপালা রচনায় উত্সাহী করতেই বেছে নেওয়া হয়েছে মুনীর চৌধুরীর কালজয়ী নাটক রক্তাক্ত প্রান্তর। প্রায় দেড়যুগ ধরে রক্তাক্ত প্রান্তর নাটকটি উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণীর আবশ্যিক সহপাঠ হিসেবে পঠিত। এর রচনাকাল ১৯৫৯ সালে এবং নাট্যকারের নির্দেশনায় নাটকটি ১৯৬২ সালে প্রথম মঞ্চায়িত হয় এবং তিনি নাটকটির জন্য বাংলা একাডেমী পুরস্কার লাভ করেন। কায়কোবাদের মহাকাব্য মহাশ্মশান থেকে নাটকটির বিষয়বস্তু সংগৃহীত হলেও রচনাশৈলী নাট্যকারের নিজস্ব। নাটকের পটভূমি পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধ আর স্থান পানিপথের প্রান্তর (বর্তমান ভারতের হরিয়ানা প্রদেশে অবস্থিত)। প্রান্তরের একপাশে মুসলিম শিবির, অন্যপাশে হিন্দু মারাঠাদের কুঞ্জুরপুর দুর্গ। যুদ্ধের প্রস্তুতি শেষ, যেকোনো সময় বেজে উঠবে দামামা। মুসলমানদের পক্ষে নেতৃত্ব দিচ্ছেন আহমেদ শাহ আবদালি, রোহিলা পরাজিত নবাব নজীবুদ্দৌলা, অযোধ্যার নবাব সুজাউদ্দৌলা এবং মেহেদী বেগের কন্যা ও ইব্রাহিম কার্দির স্ত্রী মুন্নু বেগ ওরফে জোহরা বেগম। অন্যদিকে আছেন বালাজি রাও, রঘুনাথ রাও, সদাশিব রাও এবং সেনাপতি ইব্রাহিম কার্দি। জোহরা বেগম ছদ্মবেশে বারবার মারাঠা শিবিরে আসে স্বামী কার্দিকে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য। কিন্তু ইব্রাহিম কার্দি দুর্দিনে আশ্রয়দাতা ও যোগ্য মর্যাদাদাতা মারাঠাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে ফিরে আসে না। জোহরা বেগমও তার পিতৃহত্যার (মারাঠারা হত্যা করেছে) প্রতিশোধ না নিয়ে স্বামীর কাছে আসবে না। যদিও দুজন দুজনকে গভীরভাবে ভালোবাসে। হঠাত্ যুদ্ধ শুরু হয়, মারাঠাবাহিনী পরাজিত হয়। আহত অবস্থায় আটক হয় কার্দি। জোহরা বেগম যুদ্ধের সর্বাধিনায়ক আহমেদ শাহ আবদালির কাছে স্বামীর মুক্তি দাবি করে। মুক্তির ফরমান নিয়ে কারাগারে পৌঁছার আগেই ভ্রাতৃহত্যার প্রতিশোধ হিসেবে কারারক্ষী রহিম শেখ আহত কার্দিকে খুন করে। ধর্মের ভেদে ১৯৪৭ সালে দুটি ভিন্ন দেশের জন্ম হলেও এ বিষবাষ্প থেকে শীঘ্র মুক্তি মেলেনি; বরং তৈরি হয়েছে নানা জটিলতা। ঠিক সেই সময়ে নাটকের বিষয়বস্তু হিসেবে পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধ নাট্যকারের সার্থক নির্বাচন। বঙ্গীয় ইতিহাসে এ যুদ্ধ তাত্পর্যপূর্ণ। কারণ ধর্মীয় বিভেদের আড়ালে ঔপনিবেশিক শক্তির উসকানি ছিল মূল। ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধের পর ইংরেজরা সরাসরি ক্ষমতা গ্রহণ না করে এ যুদ্ধের মাধ্যমে বঙ্গীয় শক্তিকে নিঃশেষ করে ১৭৬৪ তে পুরোপুরি ক্ষমতা গ্রহণ করে। এ যুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস দুর্লভ, কারণ পশ্চিমা বেনিয়া-শক্তির সরাসরি কোনো কৃতিত্ব না থাকায় তাদের মদদপুষ্ট কোনো ইতিহাসবিদের আগ্রহের বিষয় হয়ে ওঠেনি এ যুদ্ধ। ১৭৬১ সালে সংগঠিত এ যুদ্ধ এতই ভয়াবহ ছিল যে পরবর্তী ২০০ বছর বঙ্গীয় হিন্দু-মুসলিমদের এর খেসারত দিতে হয়েছে। রক্তাক্ত প্রান্তর একটি বিয়োগান্তক উপাখ্যান। যুদ্ধে মারাঠারা পরাজিত এবং নিঃস্ব হয়ে যায়। উভয় পক্ষের প্রায় আশি হাজার সৈন্য মারা যায়, হতাহত হয় এত বেশি যে, জয়ী হয়েও শক্তিহীন হয়ে পড়ে মুসলমানরা। আবদালির সংলাপ—‘লাশের ওপর লাশ, তার ওপর লাশ!... কার সাধ্য এই রক্ত-মাংস-অস্তি হাতরে শত্রু-মিত্র বেছে আলাদা করা’। কার্দির ক্ষুদ্র মুক্তিকে অস্বীকার করে বৃহত্ মুক্তি গ্রহণের মধ্যে দিয়ে বিরহী জোহরার অতৃপ্ত হূদয়-বাসনা হাহাকারের জন্ম দেয় সকল মানব হূদয়ে। বিয়োগান্তক পরিণতি হয় নাটকের আরেক চরিত্র মুসলিম গুপ্তচর আতা খাঁ-র, যুদ্ধ হারায় তার ভালোবাসার হিরণবালাকে। সর্বোপরি বিয়োগান্তক পরিণতিতেই নাটকের পরিসমাপ্তি। নাটক থেকে যাত্রা করতে যেয়ে কিছু সংলাপের পরিবর্তন হয়েছে। নির্দেশক সংযোজন করেছেন বিবেকের চরিত্রটি, হয়তো তা যাত্রার বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ন রাখার চেষ্টা। তিনদিকে দর্শক বেষ্টিত মঞ্চের খুঁটিতে হ্যাজাকবাতি দিয়ে বেশ উপভোগ্য করা হয়েছে। দেশাত্ববোধক গান দিয়ে শুরু তবে যাত্রার প্রচলিত ঢংয়ে নয়, শিল্পীদের মুভমেন্ট ছিল নৃত্যের মতো। শুরুতে কিছু সংলাপে আড়ষ্টতা ছাড়া বশির ও রহিম খাঁ-র অভিনয় ছিল উপভোগ্য, হিরণবালার নৃত্যটি চমত্কার। কার্দির অভিনয় ছিল প্রাণবন্ত, পরিস্থিতি অনুযায়ী জোহরার অভিনয় এবং তার পোশাক পরিকল্পনা প্রশংসার দাবি রাখে। আহমদ শাহ আবদালি, নজীবুদ্দৌলা ও সুজাউদ্দৌলা—প্রত্যেকের অভিনয়েই পেশাদার অভিনেতার ছাপ স্পষ্ট ছিল। বিবেকের গান, বাদক দলের আবেগীয় সংগীত ও জোহরার ভগ্নহূদয়ের হাহাকার—সব মিলিয়ে শেষদৃশ্যটি ছিল মর্মস্পর্শী। একইসাথে মঞ্চ ও গ্রিনরুম বিপরীতক্রমে কারাগার হয়ে ওঠা নির্দেশকের পটুতার প্রমাণ। প্রত্যেক অভিনয়শিল্পীই প্রাণবন্ত অভিনয় করেছে। নান্দনিক এ যাত্রাপালার জন্য এর সকল কলাকুশলীসহ বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী প্রশংসার দাবিদার। যাদের অক্লান্ত পরিশ্রমর ফসল রক্তাক্ত প্রান্তর, তারা হলেন—নির্দেশনা : সুলতান সেলিম। অভিনয়ে : আহমেদ শাহ আবদালি—মিলন কান্তি দে, জোহরা বেগম—শর্মীমালা, ইব্রাহিম কার্দি—জাফরুল স্বপন, নবাব নজীবুদ্দৌলা—শিশির রহমান, নবাব সুজাউদ্দৌলা-গাজী বেলায়েত, হিরণবালা—বনশ্রী অধিকারী, আতা খাঁ—সুনীল কুমার দে, বশির—মো. আবুল কালাম আজাদ এবং রহিম শেখ—এবিএম কুদরত কমল। নেপথ্যে : যন্ত্রশিল্পী—মাস্টার গুরুদাস সরকার, আবদুল খালেক মিয়া, রঞ্জন চন্দ্র দাস, মো. তজু মিয়া, গৌতম কর্মকার, গৌরব কুমার সরকার। সংগীতশিল্পী : গোপাল চন্দ্র মল্লিক, কেয়া, মুক্তি, বর্ষা, সীমা, বিশ্বাস, হাসি। নৃত্যশিল্পী : মুক্তি রানী। মঞ্চ পরিকল্পনা : আলি আহমেদ মুকুল। আলোক পরিকল্পনা : মো. জসিম উদ্দিন। পোশাক পরিকল্পনা : ড. আইরিন পারভীন লোপা। সংগীত পরিকল্পনা : পরিমল মজুমদার, শিশির রহমান। প্রপস : ফজলে রাবিব সুকর্নো। প্রযোজনা অধিকর্তা : সারা আরা মাহমুদ।