আমি ২০০০ সালে স্বপরিবারের (আম্মাসহ) হজ্বে গিয়েছি। আমি ছোটবেলা থেকেই ইসলামী চিন্তা-চেতনা ও পরিচ্ছন্ন জীবন-যাপনের আবহে গড়ে উঠেছি। কেননা আমার পিতা মরহুম ডা. মোসলেম আলী, দক্ষিণাঞ্চলের বিশিষ্ট দন্ত চিকিত্সক। যিনি আমৃত্যুকাল পর্যন্ত প্রায় বিনামূল্যে দন্ত চিকিত্সা সেবা দিয়ে গেছেন। আমি তাঁর কাছ থেকে ধর্মীয় বিষয়ে যে স্বচ্ছ ধারণা পেয়েছিলাম তা হুবহু অনুসরণ করার চেষ্টা করে থাকি। আমি যখন বুঝলাম আমার ও পরিবারের হজ্ব ফরজ হয়েছে। তখন কালবিলম্ব না করে হজ্বের জন্য সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণ করলাম। আমার মরহুম মা- রিজিয়া খাতুন, ছেলে তানজিম কালাম তমাল, দু’মেয়ে—শামিমা সুলতানা ও সাদিয়া সুলতানাকে নিয়ে আমি পরম প্রভু আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ফরজ নির্দেশ পালনের জন্য প্রস্তুত হলাম। নির্ধারিত দিনে আমরা পবিত্র মক্কা মুকাররমা ও মদীনা মনোয়ারা পৌঁছলাম। যখন স্বচক্ষে কারা শরীফ দেখলাম তখন মন-মানসিকতার এমন একটি পরিবর্তন সূচিত হলো এক অন্যরকম ভালোলাগা তৈরি হলো। আমি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়লাম। আমার মাঝে এক অন্যরকম শিহরণ ও অনুভূতির স্ফূরন অনুরনিত হলো। যে অনুভূতি দর্শনার্থী ছাড়া আর কারো বুঝানো যাবে না। তারপর কাবায় প্রবেশ করলাম। নামাজ পড়লাম। ঘুরে ঘুরে দেখতে থাকলাম। মাকামে ইব্রাহিমে নামাজ পড়লাম। হিজরে আসওয়াদ চুম্বন করলাম। যম্যম্ কূপ দেখলাম। আবু কুবাইস পাহাড় দেখলাম। মনে পড়লো এই পাহাড়ের ওপর দাঁড়ানো অবস্থায়ইতো রসূলের আঙ্গুলের ইশারায় চন্দ্র দ্বিখণ্ডিত হয়েছিল। এখানে একটি মসজিদ আছে। নাম হেলাল মসজিদ। তারপর সাফা-মারওয়া পাহাড় দেখলাম। বাসায় ফিরে এলাম। এরপর প্রতিদিন কাবায় নামাজ পড়তে থাকলাম। আর আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের কাছে নিজকে আরো বেশি করে সমর্পণ করে দিতে থাকলাম। অবশেষে হজ্বের দিনগুলো এগিয়ে এলো। আমাদের কাফেলা মিনা অভিমুখে রওয়ানা দিলো। ৮ জিলহজ্ব মিনার সেই ঐতিহাসিক প্রান্তরে চলে এলাম— যে স্থানে হযরত ইব্রাহিম (আ.) তাঁর প্রিয় পুত্র ইসমাইল (আ.) কে কুরবানি করতে সচেষ্ট হয়েছিলেন। সারারাত মিনায় থেকে ৯ই জিলহজ্ব ভোরে আরাফার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। আরাফা ময়দানে উপস্থিত হয়ে খুত্বা শুনলাম। জোহর-আসর নামাজ পড়লাম। জাবালে রহমতে উঠলাম। রাতে মুজদালেফায় অবস্থান করলাম। পৃথিবীর প্রথম মানব-আদম ও হাওয়া (আ.) এ স্থানেই প্রথম রাত্রি যাপন করেন। এখানে যত মানুষ হজ্বে এসেছেন সবাই বালুর ওপর বেডশিট জাতীয় কাপড় বিছিয়ে তাতেই ঘুমিয়েছেন। কারো জন্য কোন শয্যা নেই। কোনো স্পেশাল ব্যবস্থা নেই। সূর্য ওঠার আগেই এখান থেকে রওয়ানা দিতে হবে। এখান থেকে আবার মিনায় গেলাম। সেখানে শয়তানকে কংকর নিক্ষেপ, মাথা মুণ্ডন ও কুরবানি করলাম। আমি পশু ক্রয় করে নিজ হাতে কুরবানি দিয়েছি। কাফেলার সদস্যদের মধ্য হতে আমি-১১টি কুরবানি দিয়েছি। তবে টাকা দিয়ে সরকারি নিয়মে কুরবানি করাটাই ভালো হবে। তারপর কাবায় এলাম তাওয়াফ করলাম। সাফা-মারওয়া সাঈ করলাম। জাবালে নূর যেখানে রসূল (স.) নবুওয়াত পেয়েছিলেন ও প্রথম কুরআন নাজিল হয়েছিল ঐ পাহাড়ে উঠলাম। জাবালে সওর-যেখানে রসূল (স.) হিজরতের সময় ৩ দিন আত্মগোপন করে ছিলেন ঐ গুহা দেখলাম। রসূল (স.) এর জন্মস্থান দেখলাম। আরো অনেক দর্শনীয় স্থান দেখলাম। সব শেষে মদীনায় গেলাম। রসূল (স.) এর রওজা মোবারকে গেলাম। যা এখন মসজিদে নব্বীর মাঝে চলে এসেছে। রসূল (স.) কে সালাম জানালাম। রিয়াজুল জান্নায় নামাজ পড়লাম। মসজিদে নব্বীর মধ্যে ৮ দিনে মোট ৪০ ওয়াক্ত নামাজ পড়লাম। এটা অনেক মর্যাদার। কেননা এখানে এক রাকায়াত নামাজ পড়া ৫০ হাজার রাকায়াত নামাজ পড়ার সমতুল্য। এরপর মসজিদে জুমআ, মসজিদে কুব্বা ও দুই কেবলার মসজিদ বা মসজিদে কেবলাতাইনে নামাজ পড়লাম। রসূলের ঈদগাহ শি’বে আখবার দেখলাম। বদরের প্রান্তরে গেলাম। ওহুদের প্রান্তরে গেলাম। আরো অনেক দর্শনীয় স্থান ঘুরে ঘুরে দেখলাম। মক্কায় ও মদীনায় মানুষের নিয়ম শৃঙ্খলা দেখে মুগ্ধ হলাম। লক্ষ লক্ষ মানুষের এই সমাবেশে সামান্যতম বিশৃঙ্খলা নেই। হুড়োহুড়ি নেই। সবাই একই আকর্ষণে কৌতূহলী দৃষ্টিতে ঘুরে ঘুরে দেখছেন, কান্নাকাটি করছেন, পারস্পরিক সহযোগিতায় এগিয়ে আসছেন, এই দৃষ্টান্ত পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল ও অবিস্মরণীয়। সব শেষে বিদায়ী তাওয়াফের সময় মনে হয়েছে আল্লাহর করুণা অসীম ও যাঁর শুকরিয়া অনিশেষ। হজ্বের সকল কাজ সুষ্ঠু সুন্দরভাবে সবকিছু আমি ও আমার পরিবার করতে পারায় বড়ই সৌভাগ্যবান মনে হচ্ছিল। শেষে মনে হচ্ছিল পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মত বাংলাদেশের মুসলমানদেরও শক্তি সামর্থ্য থাকা অবস্থায় হজ্বের ফরজ কাজটি আদায় করা উচিত। আর যারা হজ্বে যাচ্ছেন তাদেরকে বলবো— এই সফরে নিজের মধ্যে সব ‘আমিত্ব পরিহার করতে হবে। সর্বোচ্চ ধৈর্য ধারণ করার ও প্রতিকূল অবস্থায় কষ্ট মেনে নেয়ার এবং অন্যদের সহযোগিতার মানসিকতা তৈরি করতে হবে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদের যেন সারাজীবন হজ্বের শিক্ষা অনুসরণ করে দৈনন্দিন জীবনযাপন করার তাওফীক দান করেন, আমীন।
