দুর্গতিনাশিনী দুর্গা

আপডেট : ১১ অক্টোবর ২০১৩, ১৮:৪৮
বিশ্বের সকল ধর্মই ঈশ্বর প্রেরিত এবং শাশ্বত সত্ত্বের উপর প্রতিষ্ঠিত, কালজয়ী। ঈশ্বরের ইচ্ছাতেই পৃথিবীতে এত সব বৈচিত্র্যের সমাহার। সাদা-কালো, দীর্ঘকায়-খর্বাকায়, তীক্ষ্ন-নাশা ও চেপ্টা নাক আরো কত বৈচিত্র্যে ভরা বিশ্বসংসার। কিন্তু এসবেরই নিয়ন্তা এক ও অদ্বিতীয় পরমেশ্বর মর্তলোকে-গিরিরাজ হিমালয়-কন্যা উমা অসুরদলনী মহিষাসুরমর্দিনী এবং ভক্তজনের দুর্গতিনাশিনী দুর্গা, প্রতি বছর শরত্কালে পুত্রকন্যা সমবিভ্যাহারে, আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষে চারটি দিনের জন্য তাকে পিতৃগৃহে মর্তলোকে আসতে হয় ভক্তদের পূজা গ্রহণ করতে, ধন্যধান্য পত্রপুষ্প শোভিত শরতের রৌদ্রকরোজ্জ্বল দিনগুলোতে। পূজা শেষে মা দুর্গা ফিরে যান কৈলাসে। বাঙালি হিন্দুর সর্বপ্রধান এবং সবচেয়ে বর্ণাঢ্য ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উত্সব শারদীয় দুর্গাপূজা। আনন্দময়ী দুর্গতিনাশিনী মা দুর্গার আগমন বার্তায় গোটা বিশ্ব আজ আনন্দমুখর। মা দুর্গা ব্রহ্মশক্তি স্বরূপিনী, তিনি বিভাসিতা মাতৃশক্তি, তিনি জগজ্জননীরূপে সর্বভূতে বিরাজমান। তিনি সকল প্রাণীতে চেতনারূপে, বুদ্ধিরূপে, শক্তিরূপে, শান্তিরূপে, শ্রদ্ধারূপে, দয়ারূপে ইত্যাদি নানারূপে বিরাজিতা, সকল প্রকার অকল্যাণের হাত থেকে তিনি তার সন্তানদের রক্ষা করে থাকেন। দেবতা ও অসুরদের সংগ্রামে শরণাগত শুভবুদ্ধি ও কল্যাণকামী দেবতাদের তিনি সবসময় বরাভয় দান করেছেন। বিভিন্ন পুরাণে মায়ের অপার মহিমা বিশেষভাবে বর্ণিত আছে। আদ্যাশক্তি এই মহামায়াই ব্রহ্মজ্ঞানদাত্রীরূপে সন্তানদের পরমানন্দ দান করে চলেছেন। এই সর্বভূতময়ী চৈতন্য সত্তাই মহিষাসুরমর্দিনী জ্যোতিময়ী শ্রীদুর্গা। প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে সারা অবিভক্ত ভারতে শক্তি পূজার প্রচলন আছে। ইতিহাস থেকে জানা যায়, রাজা সুরথ রাজ্যহারা হয়ে এবং বৈশ্য সমাধি বিষয় বৈভব থেকে বঞ্চিত হয়ে মনের দুঃখে বনে-জঙ্গলে শান্তির অন্বেষায় ঘুরে বেড়িয়ে হারানো সৌভাগ্য ফেরত পাওয়ার আশায় বিভোর। এভাবে ঘুরতে ঘুরতে একদিন তারা দৈবক্রমে ঋষি মেধসের আশ্রমে এসে হাজির হলেন। তারা ঋষি মেধসের কাছে তাদের দুর্গতির অবসানে হূত বৈভব ফেরত প্রাপ্তির প্রার্থনা জানালে ঋষিবর তাদের সর্বদুঃখবিনাশিনী কল্যাণমীয় মা দুর্গার পূজা করে বর প্রার্থনার পরামর্শ দেন। দয়াপরবশ হয়ে মুনিবর তাদের শ্রীমায়ের রূপকল্পনা ও পূজাবিধির কথাও বলেন। ঋষি মেধসের পরামর্শমত রাজা সুরথ এবং বৈশ্য সমাধি দুর্গা পূজার আয়োজন করেন এবং ভক্তি-শ্রদ্ধা দ্বারা তারা মা দুর্গাকে সন্তুষ্ট করে শ্রীমার আশীর্বাদে তাদের স্ব স্ব হূতগৌরব ও বিষয়-বৈভব পুনঃপ্রাপ্ত হন। এভাবেই এদেশে দুর্গাপূজার প্রচলন হয়। দুর্গাপূজায় বহুবিধ দুর্লভ ও মূল্যবান উপাচার প্রয়োজন। ফলে সাধারণ মানুষের পক্ষে এই পূজার অনুষ্ঠান করা খুবই দুঃসাধ্যের ব্যাপার। তাই প্রাচীনকালে রাজা-জমিদার আর ধনাঢ্য বণিক সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যেই এ পূজার প্রচলন লক্ষণীয়। এ যুগের সাধারণত আর্থিকভাবে সচ্ছল ও ধনী ব্যক্তিরাই পারিবারিকভাবে বংশপরম্পরায় দুর্গা পূজা করে আসছেন। তবে হালে সার্বজনীন দুর্গাপূজার আধিক্য, দৃষ্টিনন্দন জৌলস বিশেষভাবে লক্ষণীয়। এসব সার্বজনীন পূজাগুলোতে সমাজের ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের অংশগ্রহণে এক আনন্দমুখর আলোকিত পরিবেশের সৃষ্টি হয় এবং দুর্গাপূজাকে উজ্জ্বল মহিমায় অভিসিঞ্চিত করে। অনেকদিন আগের কথা। সে সময় দেবতাদের রাজা যেমন ছিলেন ইন্দ্র, তেমনই অসুরদের রাজা ছিলেন মহিষাসুর। দেববরে বলীয়ান বলদর্পী মহিষাসুর এক সময় স্বর্গরাজ্য আক্রমণ করে। ফলে এক ভয়ানক যুদ্ধ বেধে যায়, যা চলে একশ’ বছর ধরে। দেবতারা প্রাণপণে যুদ্ধ করলেও মহিষাসুরের প্রবল আসুরিক শক্তির কাছে পরাজিত হন। স্বর্গরাজ্য থেকে দেবতারা বিতাড়িত হলেন, অসুররাজ মহিষাসুর হলেন স্বর্গের অধিপতি। দেবতারা তাদের দুঃখের অবসানে স্বর্গরাজ্য উদ্ধারের জন্য প্রজাপতি ব্রহ্মার শরণাপন্ন হলে ব্রহ্মা তাদের ভগবান বিষ্ণু ও শিবের আশ্রয় নিতে পরামর্শ দেন। দেবতাদের দুঃখের কথা শুনে ভগবান শিব ও বিষ্ণু অতিশয় ক্রুব্ধ হলেন। ক্রুব্ধ বিষ্ণু, ব্রহ্মা ও শিবের বদন থেকে মহাতেজ নির্গত হলো। ইন্দ্র প্রভৃতি দেবতাদের শরীর থেকেও সুবিপুল তেজরাশি নির্গত হলো। দেবতাদের এই সম্মিলিত তেজরাশি থেকে সৃষ্টি হলো অপরূপা এক নারীমূর্তি। দেবতাদের দেহ নিঃসৃত তেজে সেই নারীমূর্তির অঙ্গসমূহ সৃষ্টি হলো। ভগবান বিষ্ণুর তেজে উত্পন্ন হলো তার বাহুসমূহ-দশভূজ। ইনিই হলেন দশভূজা মহিষমর্দিনী দুর্গতিনাশিনী দেবী দুর্গা। দেবগণ নিজ নিজ দেহ নিঃসৃত তেজ দ্বারা যেমন দেবীর অঙ্গসকল সৃষ্টি করে তাকে পূর্ণরূপ দিয়েছিলেন, তেমনই তারা নিজ নিজ শ্রেষ্ঠ অস্ত্রও তার হাতে তুলে দিয়ে তাকে করেছিলেন রণসাজে সজ্জিতা। দেবতারা দেবী দুর্গার হাতে যে সকল অস্ত্রশস্ত্র তুলে দিয়েছিলেন সেগুলো হলো দেবাদিদেব মহাদেবের ত্রিশূল, কালদেবতার খড়গ, ভগবান বিষ্ণুর চক্র, পবন দেবতার তীক্ষ্ন বাণ, জলদেবতা বরুণের পাশ, পবনদেবের বার্ণপূর্ণ দুটি তূণীর, অগ্নি দেবতার শক্তি, দেবরাজ ইন্দ্রের বজ্র্য, মৃত্যুদেবতা যমের কালদণ্ড, বিশ্বকর্মার উজ্জ্বল কুঠার। অসুরদের সাথে যুদ্ধে দেবী দুর্গা এসব অস্ত্রই ব্যবহার করেছিলেন। এই যুদ্ধের ক্রান্তিলগ্নে মহিষাসুরের পতন ঘটে। এভাবেই মা দুর্গার প্রসাদে দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন নিশ্চিত হয়। হিংসায় উন্মত্ত আজকের এই পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন শান্তি ও মৈত্রীর, ঐক্য ও সংহতির। আমরা বিশ্বাস করি, সকল ধর্মের মর্মবাণী এক ও অভিন্ন-ঈশ্বর এক ও অদ্বিতীয়, তিনি সর্বশক্তিমান, সর্বত্র বিরাজমান এবং পরম করুণাময়। ধর্ম-দর্শনের এই মৌলিক প্রশ্নে এক ধর্মের সাথে অন্য ধর্মের কোনই প্রভেদ নেই, তফাত্ যেটুকু তা নেহায়তই ভাষাগত, প্রথাগত ও প্রাতিষ্ঠানিক আচার-আচরণের। হিন্দুর প্রত্যয়ে আছে, সর্বভূতে সমদর্শন, বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্য ও সংহতি এবং সকল ধর্মসম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে মর্যাদাপূর্ণ ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান। মানুষ মানুষের জন্য জীবন জীবনের জন্য, মনুষ্যত্বই মানুষের শ্রেষ্ঠ অলংকার- এ হোক আমাদের বিশ্বাসের ভিত্তিভূমি। আমরা বিশ্বাস করি, বিশ্বের সকল ধর্মই ঈশ্বর প্রেরিত এবং শাশ্বত সত্ত্বের উপর প্রতিষ্ঠিত, কালজয়ী। ঈশ্বরের ইচ্ছাতেই পৃথিবীতে এত সব বৈচিত্র্যের সমাহার। সাদা-কালো, দীর্ঘকায়-খর্বাকায়, তীক্ষ্ন-নাশা ও চেপ্টা নাক আরো কত বৈচিত্র্যে ভরা বিশ্বসংসার। কিন্তু এসবেরই নিয়ন্তা এক ও অদ্বিতীয় পরমেশ্বর। আমরা তাকে যে নামে যেভাবেই ডাকি না কেন, তিনি ভক্তের ডাকে সেভাবেই সাড়া দেন। তিনিই সকল পথের শেষ ঠিকানা। তাই আমাদের উচিত নিজ নিজ ধর্মবিশ্বাসে নিষ্ঠাবান ও অবিচল থেকে ধর্মাচরণ করা, কোনভাবেই যেন আমরা অন্যের মত ও পথকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য না করি। এভাবেই আমরা আন্তঃধর্মীয় সংঘাত-সংঘর্ষ পরিহার করে সকল মানুষের জন্য একটি শান্তিপূর্ণ পৃথিবী গড়ে তুলতে পারি। আর এভাবেই এই পৃথিবীতেই স্বর্গরাজ্য প্রতিষ্ঠা সম্ভব। ধর্মবোধে উদারনৈতিক চেতনার উন্মেষ ও যথার্থ মানবিক মূল্যবোধের বিকাশই এক অখণ্ড শান্তিময় বিশ্ব বিনির্মাণের মৌলিক উপাদান। ‘বসুধৈব টুকুম্বকম’-গোটা বিশ্বই আমার আত্মীয়-এ হোক আমাদের আলোকিত প্রত্যয়। সত্য সুন্দরের আলোকে, শান্তি ও কল্যাণের সুবাতাসে অভিসিষ্ণিত হোক এই আর্ত বসুন্ধরা। দুর্গতিনাশিনী মা দুর্গার আশীর্বাদের করুণাধারা সকলের উপর বর্ষিত হোক- দেশ ও জাতি সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধির আলোকছটায় উদ্ভাসিত হোক-দেবী দুর্গার কাছে এ আমাদের বিনম্র প্রার্থনা। লেখক: সাবেক বিচারপতি