বাংলা লোকসাহিত্যের সমৃদ্ধ শাখা হচ্ছে লোক প্রবাদ-প্রবচন। নানা বিষয়ে নানা প্রকৃতির অজস্র প্রবাদ-প্রবচন লোকসমাজে প্রচলিত। নেহায়েত কথার কথা নয়— এসব প্রবাদ প্রবচনের তাত্পর্যপূর্ণ সাহিত্য মানও রয়েছে। তার চেয়ে বেশি আছে জন মানুষের জীবন চেতনার অকৃত্রিম রূপ।
প্রবাদ-প্রবচনগুলোর আবেদন কখনো চিরন্তন সত্য রূপে আবার কখনো সাধারণ অর্থেই প্রচলিত। জনসমাজে প্রাত্যহিক অভিব্যক্তির প্রকাশে এগুলোর গুরুত্ব অত্যধিক। হাজার বছর ধরে বহমান মানব সমাজে জীবনের সারসত্য রূপে লোক ভাষার স্থানিক মহিমায় প্রবাদ-প্রবচনগুলো টিকে আছে। এমন অনেক প্রবাদ আছে যা স্থানকালের সীমাকে অতিক্রম করে বিশ্বসমাজের সম্পদ রূপে পরিগণিত হয়েছে। তথাপি স্থানীয় প্রবাদ-প্রবচনগুলোর গুরুত্বও কম নয়। ভাব ও ভাষায় স্থানীয় হলেও এগুলোর আবেদনও বিশ্বজনীন। বলা হয় প্রবাদ-প্রবচন যে কোন ভাষার লোক অভিজ্ঞতার মণিমঞ্জুষা, জাতির প্রতিবিম্ব, প্রতিচ্ছবি। জার্মানদের ধারণা— যে দেশ যেমন সে দেশের প্রবাদ-প্রবচনও তেমন। আবার বলা হয় যে দেশের মানুষ যেমন প্রবাদ-প্রবচনও তেমন।
প্রবাদ-প্রবচনে একটি জাতির আত্মার সন্ধান পাওয়া যায়। প্রবাদ ভাষার এমন একটি অংশ যা ভাষাকে সতত জীবন্ত রাখে। কখনও কখনও ভাষার গতিপথও নির্দেশ করে। প্রবাদ-প্রবচনে খুঁজে পাওয়া যায় জাতির অকৃত্রিম লোকসত্তাকে। জাতি গঠনে যে মানস সর্বদা ক্রিয়াশীল। প্রবাদ-প্রবচনের উত্পত্তি ঘটে এক প্রকার সৌন্দর্য চেতনা থেকে। তাই এগুলোতে উপমার প্রাধান্য থাকে। সৌন্দর্য চেতনা থেকে উদগত বলেই হয়তো এগুলোর টিকে থাকার ক্ষমতাও অফুরন্ত। কালের করাল গ্রাস থেকে এগুলো বেঁচে থাকে হাজার বছর ধরে। রূপান্তরিত হয় বটে, তবে সহস্র বছরেও এগুলোর আবেদন ও ভাব বিলীন হয় না। সমাজে বহু বিচিত্র বিষয়ে প্রবাদ-প্রবচন চালু রয়েছে। ধর্মনীতি, সামাজিক ও পারিবারিক বিষয়, পরিবেশ, কৃষি, ব্যক্তি সম্পর্ক এমনই বহু বিষয়ে প্রবাদ-প্রবচন প্রচলিত আছে। এগুলো কোন দেশকালের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়। সার্বজনীনভাবে মানব সমাজে এগুলো ছড়িয়ে পড়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার প্রান্তিক জনপদগুলোতেও বিপুল পরিমাণ লোক প্রবাদ-প্রবচন প্রচলিত আছে। বিশেষ করে এখানকার প্রবাদ-প্রবচনগুলোর ভাষ্য থেকে অনুভব করেছি এগুলো সুদীর্ঘ কালের সম্পদ। যা এ অঞ্চলের মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত হয়ে আসছে। যে অতীত হারিয়ে গেছে কালের গর্ভে, যে অতীতের জন্যে আমাদের সতত আক্ষেপ - সেই বিস্মৃত অতীতের সাক্ষ্য বহন করছে লোক সাহিত্যের এ উপাদানগুলো। প্রবাদ-প্রবচনগুলোর ভাষা বৈশিষ্ট্য থেকে স্থানীয় ভাষা বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করা সম্ভব হয়। বিশেষ করে স্থানীয় ভাষার যে স্বাতন্ত্র তা সহজেই এসব প্রবাদ-প্রবচনে ধরা পড়ে। কেন না এসব প্রবাদ-প্রবচনে প্রচুরসংখ্যক স্থানীয় বা আঞ্চলিক শব্দ ব্যবহূত হয়। যেমন-* বেইন্না বেলার মুডি সারাদিনের খুডি।* সিয়ানের কাম বিয়ানে নাদানের কাম মাদানে।* হাই মরছে আঘুনে-কুয়ান দিছে ফাগুনে।* খাডাইশ্যা কুত্তার আগুইন্যা পাদ।* গাইয়ে বাছুর লনা গোয়াইল্যার পেরেশানি।* ঈমানে আমান, বেঈমানে দুনিয়া তামান। উল্লেখিত প্রবাদ-প্রবচনগুলোতে একটি চমত্কার স্থানীয় লোক পরিবেশের ধারণা পরস্ফুিট হয়ে উঠে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার লোক ভাষার চমত্কার ব্যবহারও আমরা এখানে লক্ষ্য করি। এখানে ব্যবহূত বেইন্না বেলার মুডি অর্থাত্ সকাল বেলার অবলম্বন নাদানের কাম- অজ্ঞলোকের কাজ, সিয়ানের কাম- জ্ঞানী লোকের কাজ, হাই মরছে আঘুনে- অর্থাত্ স্বামী মারা গেছে অঘ্রানে, কুয়ান দিছে ফাগুনে- কান্না শুরু করেছে ফাল্গুনে, এসব প্রবাদ-প্রবচন স্থানীয় মানুষের আচার-অভ্যাস, রীতি-প্রথা, সম্পর্ক ও বিশ্বাসের বিষয়গুলো তুলে ধরে। সেই সাথে এগুলোতে ব্যবহূত আঞ্চলিক ভাষাও আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
