‘যুক্তরাষ্ট্র’ শব্দটি বললে হয়তো সচেতন মানুষের মনে একটি বাক্য আসে। তা হলো- বিশ্বের পরাশক্তি। যে দেশটির গণতন্ত্র অত্যন্ত শক্তিশালী। যে দেশে নাকি রাজনীতিবিদরা জাতীয় স্বার্থে সবসময় একমত থাকেন। এই দেশের তৃতীয় প্রেসিডেন্ট টমাস জেফারসন (১৮০১-১৮০৯) বলেছিলেন, মানুষের উপর প্রভুত্ব কায়েম করা গণতন্ত্র নয়, বরং মানুষের অধিকার নিশ্চিত করাই হচ্ছে গণতন্ত্র। অর্থনৈতিক স্বাধীনতাকে তিনি রাজনৈতিক স্বাধীনতার পূর্বশর্ত বলে মনে করতেন। অথচ সেই আমেরিকার সরকার ব্যবস্থা আজ অচল হয়ে আছে গত প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে। আর এর মূলে রয়েছে রাজনৈতিক মতবিরোধ। দুটি বৃহত্ দলের অনড় অবস্থানের কারণে সহসাই এই সংকট থেকে মুক্তি পাচ্ছেন না বলে মনে করছেন অর্থনীতি নিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ করেন এমন বিশেষজ্ঞরা। দেশটির গণতন্ত্রে আজ মেঘের ছায়া পড়েছে।
কেবল মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বা ডেমোক্র্যাট নেতারা নন, রিপাবলিকানরাও অনড় অবস্থানে। তাই দেশটির বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদরা বর্তমান অচলাবস্থায় অনেকেই চরম আশঙ্কা প্রকাশ করছেন। সেবাখাতে অর্থ বরাদ্দ নিয়ে অচলাবস্থা শুরুর পর সরকারের ঋণসীমা বৃদ্ধির কথা ওঠে। এই ঋণসীমা ১৬ দশমিক ৭০ লাখ ডলার থেকে বৃদ্ধির সময়সীমা ১৭ অক্টোবর শেষ হচ্ছে। কিন্তু এখন অচলাবস্থা ও ঋণসীমা বৃদ্ধির বিষয়টি যেন একীভূত হয়েছে। এর আগে মার্কিন রাজস্ব বিভাগ বলে, ঋণসীমা বাড়ানো না হলে দেশ মহাদুর্যোগে পতিত হবে। তবে রিপাবলিকানরা ঋণ সীমা বৃদ্ধির জন্য ছয় সপ্তাহ সময় বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে। কিন্তু ওবামা তাদের সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। এর মাধ্যমে সমঝোতার যে চেষ্টা চলছিল তা ভেঙ্গে গেল বলে মনে করছে মার্কিন সংবাদ মাধ্যম। তবে ওবামা রিপাবলিকানদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যেতে সম্মত হয়েছেন। গত কয়েকদিন ধরে দুই পক্ষের মধ্যে দফায় দফায় বৈঠক হচ্ছে। কিন্তু কোনো সমাধান হয়নি। আর আশু কোনো সমাধান হবে এমন ইঙ্গিতও পাওয়া যাচ্ছে না বলে দেশটির সংবাদ মাধ্যমগুলো জানিয়েছে।
আমাদের দেশে বাজেটের সময় সরকারি দল বলে, গরীব মানুষের বাজেট। আর বিরোধী দল বলে, গরীব মারার বাজেট। এবারের সংকটটা মূলত দুই দলের এই সমর্থনকে কেন্দ্র করেই। দেশটিতে দুটি দলের মধ্যেই ক্ষমতার পালাবদল ঘটে। ধারণা করা হয়, রিপাবলিকান ধনিক শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষা করে। আর ডেমোক্র্যাটরা নিম্নবিত্ত এবং মধ্যবিত্তদের স্বার্থ রক্ষা করে। যদিও রিপাবলিকানদের (যুক্তরাষ্ট্রে যাকে গ্রান্ড ওল্ড পার্টি-জিওপি নামে ডাকা হয়) পুরোনো ইতিহাস তা বলে না। বিশেষ করে টমাস জেফারসন ছিলেন অনেক বেশি গণতান্ত্রিক। যুক্তরাষ্ট্রে নিম্নবিত্তরা তো দূরে থাক, মধ্যবিত্তরা পর্যন্ত ভালভাবে চিকিত্সা পায় না। কারণ স্বাস্থ্য ইনস্যুরেন্স না থাকলে চিকিত্সা নেয়া সম্ভব হয় না। আর এটা সম্ভব কেবল ধনিক শ্রেণীর জন্য। ওবামা চেয়েছিলেন, স্বাস্থ্য সেবা না পাওয়া এসব মধ্যবিত্তদের জন্য চিকিত্সার বিষয়টি নিশ্চিত করা। ওবামার স্বাস্থ্য সংস্কার বিল নিয়েই যতো মাথাব্যথা রিপাবলিকানদের। তারা চান না এই বিল পাস হোক। আর তাই কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার সুযোগে ওবামাকে এক ঘা মারলেন কট্টরপন্থী রিপাবলিকানরা। বিশেষ করে পরিষদের স্পীকার জন এ বোয়েনার তার অবস্থানেই অনড় রয়েছেন। হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি জে কার্নি জানিয়েছেন, স্পীকারের ভূমিকায় হতাশ প্রেসিডেন্ট। স্পীকারের মনোভাব এতো কট্টর যে, ওবামা সব রিপাবলিকান সদস্যদের গত বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে আসার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। আর বোয়েনার উল্টো চেষ্টা করছেন যাতে সবাই যোগ না দেয়, জানিয়েছেন জে কার্নি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, শাট ডাউন-এর কারণে সৃষ্ট অচলাবস্থা ইতোমধ্যে বিশ্বব্যাপী মার্কিন ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছে। এ অচলাবস্থা মার্কিন রাজনীতিবিদদের মধ্যকার বিভেদকে প্রকটভাবে সামনে তুলে এনেছে। মার্কিন সাবেক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিকোলাস বার্নস বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি আমাদের ওপর বিশ্ববাসীর আস্থায় আঘাত করেছে। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের সামর্থ্যের কারণে বিশ্বের বেশির ভাগ দেশ প্রায় প্রতিদিনই আমাদের ওপর নির্ভর করে। যদিও ওবামা বলেছেন, বাজেট জটিলতার কারণে ওয়াশিংটনের প্রশাসনিক অচলাবস্থা বিশ্ববাসীর প্রতি মার্কিন অঙ্গীকারে কোনো প্রভাব ফেলবে না। ওবামা বলেন, কট্টর ডানপন্থী রিপাবলিকান আইনপ্রণেতারা অচলাবস্থার নিরসন চান না। তাই প্রতিনিধি পরিষদের স্পীকার ও রিপাবলিকান নেতা বোয়েনার ওই বিল হ্যাঁ অথবা না ভোটে দিয়েছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ভোট দিয়ে অচলাবস্থার নিরসন করতে রিপাবলিকানদের প্রতি আহবান জানিয়েছেন। তিনি কট্টর ডানপন্থী রিপাবলিকানদের উদ্দেশে বলেন, অচলাবস্থা নিরসন বা ঋণসীমা বৃদ্ধি করার জন্য আমি কোনো মুক্তিপণ দেব না। মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে কিছু করা হলে তা মেনে নেয়া হবে না।
মজার বিষয় হচ্ছে, বিরোধী দল সাধারণত সরকারের জনপ্রিয়তা কমানোর জন্য নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করে। কিন্তু রিপাবলিকানরা ওবামাকে বেকায়দার ফেলতে গিয়ে নিজেরাই জনগণের তোপের মুখে আছেন। জনগণ এই পরিস্থিতির জন্য তাদেরকেই দায়ী করছে। সমপ্রতি বার্তা সংস্থা এপি এবং জিএফকে নামের বাজার গবেষণা ইনস্টিটিউটের চালানো জরিপে অংশগ্রহণকারীদের ৬২ শতাংশ মনে করছেন, অচলাবস্থার জন্য দায়ী রিপাবলিকানরা। তবে অর্ধেকের বেশি মানুষের মত, ওবামা ও ডেমোক্র্যাটদের উচিত আরো দায়িত্বশীল আচরণ করা। অনেকে হয়তো ভাবতে পারেন, যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশে আর্থিক সংকটের প্রভাব তেমন একটা পড়বে না। অথচ এর নেতিবাচক প্রভাব এত বেশি যে সেটা আমাদের দেশের ক্ষেত্রে অনেক সময় ভাবাও যায় না। যেমন, আফগানিস্তানে সমপ্রতি চারজন মার্কিন সৈন্য নিহত হয়। এই সৈন্যদের প্রত্যেকের এক লাখ মার্কিন ডলার ক্ষতিপূরণ পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আর্থিক সংকটের কারণে সেটি তারা পাচ্ছেন না। এমনকি প্লেনের ভাড়াটা পর্যন্ত পরিবারকেই বহন করতে হবে।
আমেরিকার এই সংকট এবারই নতুন নয়। ১৭ বছর আগে ডেমোক্র্যাট দলের ক্ষমতায় থাকার সময় ১৯৯৫-৯৬ অর্থবছরেও একই ধরনের ঘটনার জন্ম হয়েছিল। সেবার স্থায়িত্ব ছিল ২৮ দিন। সংকটের শুরু গত ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে। নতুন বছরে সেবাখাতে অর্থ বরাদ্দের প্রয়োজন হলে প্রতিনিধি পরিষদের সংখ্যাগরিষ্ঠ রিপাবলিকান সদস্যরা ওবামা প্রশাসনকে শর্ত দিয়ে বসেন, ওবামার স্বাস্থ্যসেবা প্রকল্প ‘দ্য প্যাশেন্ট প্রটেকশন অ্যান্ড অ্যাফোরডেবল কেয়ার অ্যাক্ট’ বা ‘ওবামা কেয়ার’ অন্তত একবছর পিছিয়ে দিতে হবে। তাহলেই কেবল নতুন অর্থ বরাদ্দে সম্মতি দেবেন তারা।
সরকারি ঋণসীমা বাড়ানোসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রধান দুই দলের মতানৈক্যের জের ধরে যুক্তরাষ্ট্রে ১ অক্টোবর থেকে শাট ডাউন নামের এই অচলাবস্থা চলছে। এর ফলে মার্কিন কেন্দ্রীয় সরকারের আট লাখ কর্মী কাজ ও বেতনবঞ্চিত আছেন। অর্থমন্ত্রী জ্যাক লিউ বর্তমান পরিস্থিতিতে আশঙ্কা প্রকাশ করেন, কংগ্রেস আগুন নিয়ে খেলা করছে।
