জীবিত অভিবাসীরা স্বাগত নন!

আপডেট : ১৩ অক্টোবর ২০১৩, ২১:১৩
জীবন-জীবিকার তাগিদে প্রতিনিয়ত মানুষ ছুটছে এক দেশ থেকে পরদেশে। কখনো বৈধ, নিয়মতান্ত্রিকভাবে কখনো অবৈধপথে যাচ্ছে তারা। কখনো সীমান্তরক্ষীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে এসব দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে। আবার কখনো ধরা পড়ে বিতাড়িত হয়। কখনো তাদের ফেরত পাঠানো হয় নিজ দেশে। আবার কখনো ছেড়ে দেয়া হয় অনিশ্চয়তার পথে। এখন পর্যন্ত অনুন্নত দেশের মানুষের মধ্যে অভিবাসী হওয়ার প্রচেষ্টা বেশি। এশিয়া আফ্রিকার বেশিরভাগ দেশের অভিবাসীদের ঝোঁক একটু ভালো থাকার জন্য উন্নত দেশে যাওয়া। তারা সহজ গন্তব্য হিসেবে বেছে নেয় ইউরোপের দেশগুলো। মাঝে মাঝে দালালচক্রের মাধ্যমে সহজ উপায়ে যাওয়ার চেষ্টা করে তারা। সমুদ্রপথে তাদের যাওয়ার সবচেয়ে সহজ উপায়। কিন্তু এখন আর ইউরোপের দেশগুলোতে বিশেষ করে ইতালিতে প্রবেশাধিকার নেই তাদের। সমুদ্রপথে ইতালিতে প্রবেশ করতে গিয়ে অকালে প্রাণ দিতে হচ্ছে অসহায় শত শত মানুষকে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে প্রাণ গেছে প্রায় ৫শ’ মানুষের। ইতালি এখন যেন জীবিত অভিবাসীর চেয়ে মৃত অভিবাসীদের বেশি পছন্দ করছে। ২০১০ সালে ইংল্যান্ডের ডেভনের টরিংটনের মেয়র ইন্টারনেটে একটি কৌতুক লিখে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, অবৈধ অভিবাসীরা হলো স্পর্মের মতো। যারা লাখে লাখে আসে কিন্তু কাজের লোক আসে একজন। কিন্তু ইতালির লাম্পেদুসার হূদয়বিদারক ঘটনার পর বলতে হয়, ইউরোপের দেশগুলোতে অবৈধ অভিবাসীরা আসে হাজারে হাজারে কিন্তু বাঁচে সামান্য কয়েকজনই। গত ৩ অক্টোবর ইতালির লাম্পেদুসা দ্বীপের কাছে একটি জাহাজ দুর্ঘটনায় সাড়ে তিনশ’ জন মারা গেছে। পাঁচশ’রও বেশি আফ্রিকান অভিবাসী নিয়ে জাহাজটি লাম্পেদুসা দ্বীপের কাছে আগুন ধরে ডুবে যায়। ১১ অক্টোবর আরেক নৌকাডুবির ঘটনায় আরো ৫৫ জন নিহত হয়েছে। পাওয়া যায়নি অনেকেরই সন্ধান। সিসিলির কাছে অবস্থিত লাম্পেদুসা দ্বীপটি আফ্রিকা থেকে অবৈধ অভিবাসীদের ইউরোপে প্রবেশের একটি প্রধান পথ হিসেবে ব্যবহূত হয়। জাতিসংঘ বলছে, ভূমধ্যসাগর দিয়ে ইউরোপ যাবার সময় লাম্পেদুসা দ্বীপের কাছে ১৯৯০ সাল থেকে এ পর্যন্ত ২০ হাজারেরও বেশি মানুষ মারা গেছে। জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা বলছে, শুধুমাত্র এ বছরই প্রায় ৩০ হাজার আশ্রয়প্রার্থী ইতালির উপকূল দিয়ে ইউরোপে ঢুকেছে। সংস্থাটির মতে, আফ্রিকার দারিদ্র্যপীড়িত দেশগুলোর হাজার হাজার মানুষ প্রতিবছর এ ধরনের বিপজ্জনক যাত্রা করে ইতালিতে পাড়ি জমানোর চেষ্টা করে থাকে। ৩ অক্টোবর নৌকাডুবিতে নিহতের ঘটনায় ইতালি শোকদিবস পালন করেছে। নিহতদের বেশিরভাগই ছিলো ইরিত্রিয়া, সোমালিয়া ও সিরিয়ার নাগরিক। জীবিত অবস্থায় ইতালি তাদের নাগরিকত্ব দেয়নি। কিন্তু মরণোত্তর সম্মাননা দিয়েছে। রাষ্ট্রীয়ভাবে তাদের সমাধিস্থ করার ব্যবস্থা করেছে। এর মাধ্যমে ইতালি তাদের বিবেকের ক্ষতে মলম লাগানোর চেষ্টা করেছে। মনে হতে পারে ইতালি জীবিত অভিবাসীর চেয়ে মৃত অভিবাসী গ্রহণে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছে। প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষ জলপথে ইউরোপে পাড়ি জমানোর চেষ্টা করে থাকে। এদের বেশিরভাগের নৌকা ও জাহাজ ইতালির উপকূলরক্ষীরা কূলে ভিড়তে দেয় না। তাদের পাঠিয়ে দেয়া হয় আন্তর্জাতিক সমুদ্রসীমায়। শুধু ইতালি নয়, অনেক দেশই এটা করে থাকে। বহন ক্ষমতার অতিরিক্ত অভিবাসীদের নিয়ে সর্বশেষ নৌকাডুবির পর মাল্টার প্রধানমন্ত্রী জোসেফ মাসকাট বলেন, আফ্রিকার কাছে ইউরোপীয় জলসীমা সমাধিক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। বেশ কয়েকটি নৌকাডুবির ঘটনায় শত শত অভিবাসীর মৃত্যুর পর ইউরোপীয়দের লজ্জা হওয়া উচিত এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের উচিত এই সমস্যার একটি দীর্ঘমেয়াদী সমাধান খুঁজে বের করা। এখন দেখার বিষয় হলো, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এক্ষেত্রে একটু উদার হবে কিনা। তবে উদার হলেও সমস্যা থাকছে। কারণ এতে করে আশ্রয়প্রার্থীদের আসার সংখ্যা বাড়বে। যাদের সমন্বয় করাটা কঠিন হয়ে পড়বে। কিছু কর্মকর্তার বক্তব্য হলো, এখন যদি সীমান্তগুলো বন্ধ করে দেয়া হয় তাহলে পাচারকারীরা আরো ক্ষমতা পাবে। অন্যদিকে, ইউরোপীয় অঞ্চলে ২ কোটি ৬০ লাখ অভিবাসী কাজ করছে। নতুন করে অভিবাসীদের আর নিতে চায় না ইউরোপ। এ অবস্থায় জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন বলেছেন, নিরাপদ ও বৈধ অভিবাসনের জন্য আরো সুযোগ সৃষ্টি করা উচিত। এর মাধ্যমে সমস্যার কিছু সমাধান হতে পারে। কিন্তু তারপর হাজার হাজার মানুষ ইউরোপে ঢোকার চেষ্টা করবে।