দেশে যে হারে দারিদ্র্য বিমোচন হচ্ছে তার চেয়ে মন্থর গতিতে কমছে ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা। এতে সামনে দারিদ্র্য বিমোচনের গতি কমে যেতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘উন্নয়ন অন্বেষণ’র সমীক্ষা অনুযায়ী বাংলাদেশে ১৯৯১-৯২ সালে ক্ষুধার্ত (হাঙ্গার) মানুষের সংখ্যা ছিল মোট জনসংখ্যার ৩৭ দশমিক ৯ শতাংশ। যা ২০১২ সালে এসে কমে ২৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অর্থাত্ বার্ষিক কমার হার ১ দশমিক ৭৯ শতাংশ। অপরদিকে ১৯৯১-৯২ সালে দারিদ্র্যসীমার নিচে দেশের ৫৬ দশমিক ৭ শতাংশ লোক বাস করত। সর্বশেষ খানা জরিপের তথ্য ভিত্তিতে ২০১২ সালে দারিদ্র্য কমে ২৯ দশমিক ৯৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অর্থাত্ বার্ষিক কমার হার ২ দশমিক ৭১ শতাংশ।
দারিদ্র্য বিমোচনের চেয়ে ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা কমার গতি মন্থর হওয়ার ফলাফল জানতে চাইলে উন্নয়ন অন্বেষণের চেয়ারপার্সন রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, যেহেতু আমাদের দেশে ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা কমছে কম হারে। তাই সামনে দারিদ্র্য কমার গতি কমে যাবে। যা ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। এর কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, দরিদ্র ব্যক্তি ক্ষুধার্ত নাও হতে পারে। কিন্তু ক্ষুধার্ত হলে সে অবশ্যই দারিদ্র্যের মধ্যে পড়ে যাবে। আমাদের দেশে ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা কমার হার কমে যাওয়ায় সামনে দারিদ্র্য হার কমার গতিও হ্রাস পেতে পারে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, স্বাধীনতার পর থেকে দারিদ্র্য হার হ্রাসে বাংলাদেশের সাফল্য বেশ প্রশংসনীয়। ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ থেকে ধীরে ধীরে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে ‘নেক্সট-১১ দেশ’ হিসেবে উন্নতির পথে। দারিদ্র্য দূরীকরণ, শিক্ষার হার বাড়ানো, চিকিত্সা ব্যবস্থার উন্নয়ন ও মাথাপিছু আয় বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন খাতের বাংলাদেশের অগ্রগতি প্রশংসা কুড়িয়েছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। তবে এ পথে এসেছে বিভিন্ন ধরনের বাধাও। এর মধ্যে রয়েছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং বৈশ্বিক ঝুঁকি।
এরপরও বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় মুগ্ধ হয়েই নেক্সট-১১ ও ইমার্জি টাইগারসহ বিভিন্নভাবে সম্ভাবনার তকমা লাগানো হচ্ছে। সহস াব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) পূরণেও বাংলাদেশের অগ্রগতি লক্ষণীয়। বিশ্বব্যাংক তাদের এক পর্যালোচনা প্রতিবেদনে গত জুন মাসে জানিয়েছে, এ পর্যন্ত এক কোটি ৬০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমা থেকে বেরিয়ে এসেছে। শ্রমমূল্য বৃদ্ধির পাশাপাশি জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমে আসার কারণেই এ সাফল্য এসেছে। তবে এখনো চার কোটিরও বেশি মানুষ দরিদ্র। দারিদ্র্য বিমোচনে বাংলাদেশ চলতি বছরের মধ্যেই জাতিসংঘের এমডিজিতে পৌঁছে যাবে বলেও আভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
এ অবস্থায় কিছুতেই যেন দারিদ্র্য হার কমার গতি কমে না যায় সে ব্যাপারে সরকারের পদক্ষেপ নিতে হবে। এজন্য খাদ্য দ্রব্যের মূল্যস্ফীতি রোধ করতে হবে। কারণ খাদ্য দ্রব্যের মূল্যস্ফীতি থেকেই ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা কমছে কম হারে। মূল্যস্ফীতি রোধে খাদ্য সংরক্ষণ ব্যবস্থা উন্নয়ন, সময়মতো আমদানি, রফতানি করা এবং যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নয়ন করা প্রয়োজন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া খাদ্য দ্রব্যের যোগান ঠিক রাখার জন্য সরকারি হস্তক্ষেপ বাড়ানো উচিত। এজন্য টিসিবিকে (ট্রের্ডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ) কার্যকরী করারও পরামর্শ দেন তারা।
