আন্ডারওয়ার্ল্ডে আগ্নেয়াস্ত্র সংগ্রহের প্রতিযোগিতা

আপডেট : ১৯ অক্টোবর ২০১৩, ২১:৪৭
ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডে সন্ত্রাসীরা নতুন করে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র প্রবেশ করাচ্ছে। সম্প্রতি রাজনৈতিক উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে সন্ত্রাসীরা আগেভাগেই তাদের অস্ত্রের ভান্ডার সমৃদ্ধ করছে। দেশের বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে এসব অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র প্রবেশ করলেও গন্তব্য ঢাকা। বিশেষ করে টার্গেট আসন্ন জাতীয় নির্বাচন। সম্প্রতি পুলিশ ও র্যাব কয়েকটি অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের চালান ধরা পড়ার পর বাহকদের কাছ থেকে এমনই তথ্য পেয়েছে। এ ব্যাপারে র্যাবের মিডিয়া এ্যান্ড লিগ্যাল শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার হাবিবুর রহমান বলেন, সাম্প্রতিক পরিস্থিতির কারণে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের চালান আটকের ব্যাপারে র্যাব সবচেয়ে বেশি নজর দিচ্ছে সীমান্ত এলাকায়। চাঁপাইনবাবগঞ্জ, মেহেরপুর, যশোর ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া সীমান্ত পয়েন্ট থেকে বেশ কয়েকটি আগ্নেয়াস্ত্রের চালান আটক হয়েছে। এসব আগ্নেয়াস্ত্রের চালান ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডের সন্ত্রাসীদের কাছে পৌঁছাতো। চাঁপাইনবাবগঞ্জ কানসাট বাজার : গত ২ অক্টোবর কানসাট বাজারের পাশে একটি আমবাগানের ঘর থেকে আগ্নেয়াস্ত্র বিক্রির সময় অস্ত্র ব্যবসায়ী শামীমকে র্যাব গ্রেফতার করে। তার কাছ থেকে ৪টি সেভেন পয়েন্ট ফাইভ ক্ষমতার অত্যাধুনিক পিস্তল, ৮টি ম্যাগজিন ও ২৪ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করে। গ্রেফতারকৃত শামীম জানান, তিনি দ্বিতীয় সারির আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবসায়ী। তার প্রধান কাজ হচ্ছে সীমান্তের ওপার থেকে অবৈধভাবে আনা আগ্নেয়াস্ত্র গোপন স্থানে লুকিয়ে রাখা এবং মূল ব্যবসায়ীর নির্দেশক্রমে নির্ধারিত গ্রাহকের নিকট হস্তান্তর করা। ঐ আগ্নেয়াস্ত্রের চালানের মূল মালিক শরিফুল ইসলাম ওরফে ত্বোক। এই ত্বোক বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বৈত পাসপোর্টধারী। শিবগঞ্জ ও কানসাটের মনাকষা ও তৈলকূপি সীমান্ত এলাকা দিয়ে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের চালান আসে। অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র মূল ব্যবসায়ী সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে নিয়ে আসে এবং দ্বিতীয় সারির ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে দেশের অভ্যন্তরে আরেকটি সিন্ডিকেটের সঙ্গে যোগাযোগ হয়। দ্বিতীয় সারির ব্যবসায়ীদের মধ্যে তিনি ছাড়াও কানসাটের পলাশ, বদিরুল, নাসিম, ফারুক, শিবগঞ্জের বাবু, রুবেল, রানীহাটির ফয়সাল ও তৈলকূপির সায়েদুর কাজ করে। ঐ সিন্ডিকেটের কাছে আগ্নেয়াস্ত্র পৌঁছানোর জন্য আরেকটি বাহক গ্রুপ কাজ করে। বাসে অথবা ট্রেনে যাত্রী বেশে এই আগ্নেয়াস্ত্র ঢাকার আশেপাশে টঙ্গি, আমিনবাজার, জয়দেবপুর ও কাঁচপুর এলাকায় হাত বদল হয়। এরপর ঐ আগ্নেয়াস্ত্র পৌঁছে যায় ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডে। মেহেরপুরের গাংনী : গত ১৮ জানুযারি মেহেরপুরের গাংনী থানার সীমান্তবর্তী সর্দারপাড়া গ্রাম থেকে র্যাব ১০টি আগ্নেয়াস্ত্রসহ অস্ত্র ব্যবসায়ী ফুলসাদ মিয়াকে গ্রেফতার করে। ফুলসাদ মিয়া এসব আগ্নেয়াস্ত্র ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডের একজন শীর্ষ সন্ত্রাসীর কাছে পাঠানোর কথা ছিল। গ্রেফতারকৃত ফুলসাদের বাড়ি কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার হোসেনাবাদ গ্রামে। ফুলসাদ এর আগেও দৌলতপুরের বিলগাথুয়া, জামালপুর, পাকুড়িয়া ভাঙ্গাপাড়া, মুন্সীগঞ্জ, চর মোহাম্মদপুর, চল্লিশপাড়া, ছলিমেরচর, গোড়েরচর, মরারচর, বাংলাবাজার এলাকা দিয়ে প্রায় অর্ধশত আগ্নেয়াস্ত্র প্রবেশ করিয়েছে। কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের প্রাগপুর : কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলা প্রাগপুর ইউনিয়নের বিলগাথুয়া, জামালপুর এবং রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের মুন্সীগঞ্জ ভাঙ্গাপাড়া দিয়েই সবচেয়ে বেশি আগ্নেয়াস্ত্র বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। অবৈধভাবে ভারতের নদীয়া জেলার কাছারিপাড়া, বাউশমারী ও শিকারপুর এলাকা দিয়ে বাংলাদেশ পয়েন্টে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র প্রবেশ করছে। ভারতের সঙ্গে দৌলতপুর উপজেলার ৪৬ কিলোমিটার বিস্তৃৃত সীমান্তের তিনটি পয়েন্ট দিয়ে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র বাংলাদেশে ঢুকছে। ভারতের কতিপয় এজেন্ট বাংলাদেশের অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র ক্রেতাদের চাহিদা মাফিক বিভিন্ন ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র আগে থেকে সীমান্ত এলাকার ঐ সকল পয়েন্টের দায়িত্বে নিয়োজিত ভারতীয় এজেন্টদের কাছে পৌঁছে দেয়। এরপর তা সুবিধামত সময়ে বাংলাদেশি এজেন্টের কাছে পৌঁছে দেয়া হচ্ছে। এরপর বাংলাদেশি এজেন্ট কখনো সরাসরি ক্রেতার হাতে তুলে দেয় আবার কখনও অতিরিক্ত অর্থের বিনিময়ে ক্রেতার নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে দিচ্ছে। এসব অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের বেশিরভাগ চালান ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডে পৌঁছে যাচ্ছে। রিভলবার ভারতীয় এজেন্টের কাছে ভারতীয় মুদ্রায় ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা , সেভেন পয়েন্ট সিক্স ফাইভ (ভারতীয় ভাষায় ‘সামান’) ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা , ফোর ফাইভ (ফাইভ স্টার) ৩২ থেকে ৩৫ হাজার টাকা, নাইন এম এম পিস্তল ৪০ থেকে ৪২ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। র্যাবের হাতে গ্রেফতার হওয়া আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, ভারতে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবসায়ীরা মুঙ্গের, বিহার ও ঝাড়খন্ড এলাকা থেকে এ সকল আগ্নেয়াস্ত্র সংগ্রহ করে বাংলাদেশি অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবসায়ীদের কাছে সরবরাহ করে। এ সকল আগ্নেয়াস্ত্রের গায়ে মেড ইন ইউএসএ, জার্মানি, চেকোশ্লোভাকিয়া, আর্মেনী, ইটালি লেখা থাকলেও তা ভারতের বিভিন্ন স্থানে তৈরি হয় বলে তারা জানায়। র্যাবের মহাপরিচালক মোখলেসুর রহমান বলেন, মেহেরপুর, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, কুষ্টিয়ার দৌলতপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া ও যশোর সীমান্ত এলাকার বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট দিয়ে আগ্নেয়াস্ত্র প্রবেশের ঘটনা ধরা পড়েছে। এছাড়া দেশের আরো কয়েকটি সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে আগ্নেয়াস্ত্র প্রবেশের খবর রয়েছে। এসব ঘটনায় র্যাব আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবসায়ীদের ধরার অভিযান চালানো হচ্ছে।