সেই বাংলাদেশ, এই বাংলাদেশ

আপডেট : ২০ অক্টোবর ২০১৩, ২০:৪৯
মিরপুরের উইকেট হঠাত্ করেই যেন রহস্যের নাম হয়ে গেছে। আজ থেকে শুরু হওয়া টেস্টে উইকেট ঠিক কেমন আচরণ করবে, এ ব্যাপারে স্বাগতিক পক্ষেরও কেউ অনুমান করতেও যেন ভয় পাচ্ছেন। ম্যানেজার ও বোর্ড পরিচালক আকরাম খান, নির্বাচক হাবিবুল বাশার ও অধিনায়ক মুশফিকুর রহিম সেন্ট্রাল উইকেটের পাশে দাঁড়িয়ে অনেক্ষণ মন দিয়ে যেন সেই উইকেট রহস্যেরই কিনারা করার চেষ্টা করছিলেন! এই দৃশ্যটায় ক্রিকেট রোমান্টিকরা অন্য একটা ছবিও খুঁজে পেতে পারেন—একসঙ্গে জাতীয় দল নিয়ে ভাবনায় ব্যস্ত দেশের তিন সময়ের তিন জাতীয় দলের অধিনায়ক। আইসিসি ট্রফি জয়ী আকরাম খান, বাংলাদেশকে প্রথম জিততে শেখানো হাবিবুল বাশার ও এশিয়া কাপের ফাইনালে তোলা মুশফিকুর রহিম! আরেকটা মজা হল, আজ থেকে শুরু হতে যাওয়া টেস্টের প্রতিপক্ষ নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে তিন ভিন্ন ধরনের লড়াইয়ের অভিজ্ঞতার মালিক এই তিন অধিনায়ক। আকরাম খান দেখেছেন তার দল কিভাবে নিউজিল্যান্ডের মতো ‘পরাশক্তি’র বিপক্ষে সাহস করে মাঠে নামে, হাবিবুল দেখেছেন তার দল নিউজিল্যান্ডের কেমন আক্রোশের শিকার হয়। আর মুশফিক দেখেন সেই নিউজিল্যান্ডকে কিভাবে নাকানি-চুবানি খাওয়ানো যায়! বাংলাদেশের এই বদলে যাওয়াটা একেবারে চোখের সামনে দেখেছেন নিউজিল্যান্ড দলের বর্তমান কোচ শেন বন্ডও। এর আগেই একদিন স্বীকার করেছেন, এই বদল দেখে তিনি নিজেও বিস্মিত। শুধু শেন বন্ড নন, ২০০১ সাল থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত নিউজিল্যান্ডের হয়ে খেলা প্রতিটি খেলোয়াড়ই বাংলাদেশের এই উত্থান বা নিউজিল্যান্ডের পতন দেখে বিস্মিত এবং শোকাভিভূত হবেন। টেস্ট বিশ্বের বাকী দলগুলো যেমন-তেমন, নিউজিল্যান্ডের কাছে এই সময়টা বাংলাদেশ যেন ছিল ছেলেখেলা করার জন্য একটি প্রিয় শিকার। বাংলাদেশ ও নিউজিল্যান্ড ২০০৮ সাল পর্যন্ত দুদল ৬টি টেস্ট খেলেছিল। তার ৫টিতেই বাংলাদেশকে ইনিংস ব্যবধানে হারিয়েছিল নিউজিল্যান্ড। বাকী টেস্টটায় খুব মান বাঁচাতে পেরেছিল ভাবার কোনো কারণ নেই; সেখানেও ছিল ৯ উইকেটের হার। সেই বাংলাদেশই নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সর্বশেষ তিন টেস্টের দুটিতে ড্র করেছে এবং বাকী টেস্টটিতে নিউজিল্যান্ড হারতে হারতে ৩ উইকেটের জয় পেয়েছে এক ড্যানিয়েল ভেট্টোরির কল্যাণে। ২০০৮ সালে নিউজিল্যান্ড যখন ফিরতি সফরে বাংলাদেশে এসেছিল, সেই সময়ই আসলে বাংলাদেশের প্রতিরোধ পর্ব শুরু হল। এর আগের ৬ টেস্টের প্রতিটিতে লজ্জাজনক হারের পর সেই প্রথম বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়ালো। প্রথমে ওয়ানডে সিরিজে লিড নিয়েও স্রেফ ভাগ্য আর ভেট্টোরির কাছে সিরিজ হারল বাংলাদেশ। এরপর চট্টগ্রাম টেস্টে সাকিব আল হাসানের অভাবনীয় সাফল্যে জয় দেখতে পাচ্ছিল স্বাগতিকরা। কিন্তু ওই ভেট্টোরিই ছিনতাই করে নিয়ে গেলেন সে জয়। ২০০৮ সালের এই হতাশা কাটাতে নিজেদের ইতিহাসের তখন পর্যন্ত সেরা পারফরম্যান্স করে বাংলাদেশ ২০১০ সালে ঘরের মাটিতে ওয়ানডে সিরিজে। ৫ ম্যাচ সিরিজের একটি ম্যাচ বৃষ্টিতে ভেসে যায়। বাকী চারটিতেই ভেট্টোরি সমৃদ্ধ নিউজিল্যান্ড দলকে নাকানি-চুবানি খাইয়ে বাংলাদেশ ঘোষণা করে দেয়, দিনটা তারা বদলে দিচ্ছে। সেই বদলে যাওয়া দিনেরই ছোঁয়া দেখা গেল গত চট্টগ্রাম টেস্টে। এই সিরিজ শুরুর আগে থেকেই বাংলাদেশকে অনেকেই একটু হলেও এগিয়ে রাখছিলেন হোম কন্ডিশনে। মাঠে এই অনুমানের যথার্থতা প্রমাণ করেই টেস্টে রীতিমতো নিয়ন্ত্রণ তৈরি করে ফেলেছিল বাংলাদেশ। সোহাগ গাজীর ইতিহাস গড়া অলরাউন্ডিং পারফরম্যান্স ও মোমিনুল হকের মহাকাব্যি ইনিংস মিলিয়ে জয়ের কাছাকাছিই চলে গিয়েছিল তারা। শেষ পর্যন্ত সময়ের লড়াইয়ে পেরে ওঠেনি মুশফিকুর রহিমের দল। এবার আজ থেকে শুরু হতে যাওয়া টেস্টে সেই আফসোসটুকু মিটিয়ে ইতিহাস গড়ে ফেলার সুযোগ মুশফিকদের সামনে। সুযোগ নিউজিল্যান্ডকে আরো একটু বিস্মিত করে নিজেদের বদলটা পরিষ্কার করে দেয়া।