কানাঘুষা চলত তাঁর বেঁচে থাকা অবস্থাতেই। অনুমান কিংবা অনির্ভরযোগ্য উেসর বরাত দিয়ে কিছু কিছু খবর বিদেশী পত্র-পত্রিকায় ছাপাও হত। স্বাভাবিক কারণেই সেসবের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে থেকে যেত প্রশ্ন। ক্ষমতার জোরে হোক আর যাই হোক লিবিয়ার প্রয়াত স্বৈরশাসক মুয়াম্মার গাদ্দাফি তাঁর কুকর্মগুলোর প্রচার পেতে দিতেন খুবই কম। কিন্তু এখন তিনি ধরায় না থাকায় যেসব কথা বেরিয়ে আসছে সেগুলো সত্য হলে এককথায় ভয়াবহ। আর এসব ‘তথ্যবোমা’ ফাটাচ্ছেন মূলত ফরাসী সাংবাদিক আনিক কোজিয়ান। তাঁর লেখা গাদ্দাফি’স হারেম নামক বইটির ইংরেজি সংস্করন অক্টোবরে প্রকাশিত হওয়ার কথা। তবে আগেভাগেই ছেপে দিয়ে রীতিমত হৈচৈ ফেলে দিয়েছে ব্রিটেনের বিখ্যাত ট্যাবলয়েড দ্য মেইল।
গাদ্দাফির নিরাপত্তা প্রধান মনসুর দাও’র উদ্ধৃতি দিয়ে স্বৈরশাসকের একান্ত গোপনীয় নানা তথ্য প্রকাশ করেছেন আনিক কোজিয়ান। লিবিয়ার ইতিহাসের সবচে’ ক্ষমতাধর ব্যক্তিটির মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তাঁর প্রতি অনুগত থাকা দাও জানিয়েছেন, গাদ্দাফির জৈবিক তাড়না এতোটাই তীব্র ছিল যে, সরকারের কয়েকটি বিভাগকে তিনি কাজে লাগাতেন পতিতাদের উত্স সন্ধান ও সরবরাহের কাজে। এদের মধ্যে যাদেরকে মনে ধরতো তাদের বন্দী করে রাখতেন প্রাসাদে, যাতে দিনে বা রাতের যেকেনো সময় তাদের ‘সেবা’ পাওয়া যায়। কারো কারো সুযোগ মিলত বিদেশ সফরে তাঁর সঙ্গী হওয়ার। এ কাজটি করা হত সুকৌশলে। বিদেশ সফরে ওইসব যৌনদাসীদের পরিচয় থাকত সাংবাদিক, দেহরক্ষী কিংবা প্রতিনিধিদলের অন্য যে কোনও সদস্য। সে অনুযায়ী দেয়া হত তাদের পোশাক। দাও দাবি করেছেন, গাদ্দাফির মহিলা দেহরক্ষীদের অধিকাংশেরই অস্ত্রজ্ঞান বলতে কিছু ছিল না।
গাদ্দাফির নারী সম্পর্কিত বিষয়াবলীর দেখভাল করতেন প্রটোকল বিভাগের প্রধান নুরি মেশারি। তাঁর আরো একটা পরিচয় ছিল ‘জেনারেল অফ দ্য স্পেশাল এ্যাফেয়ার্স’। কেউ কেউ তাঁকে ডাকতেন হুরদের জেনারেল বলে। তাঁর উদ্দেশ্য থাকত একটি— গাদ্দাফীর যৌনসঙ্গী যোগাড় করা। রাস্তা থেকেও কলগার্ল ধরে আনতেন তিনি। তবে দাও বলেছেন, গাদ্দাফি তাঁর ত্রিপলির প্রাসাদের বেজমেন্টে একান্ত প্রিয়পাত্রীদের নিয়ে প্রকৃতপক্ষে কী করতেন সে সম্পর্কে তিনি কিছু জানেন না। একটি প্রশ্নের মাধ্যমে সবচে’ ভয়ানক যে তথ্যটি বেরিয়ে এসেছে তা হল— তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, এমনও গুজব আছে যে, গাদ্দাফি একাধিক মন্ত্রীকে তাঁর যৌনসঙ্গী বানানোর গুজব রয়েছে, সে সম্পর্কে আপনি কী জানেন? এর উত্তরে তিনি বলেন, ‘ওসব আমাকে বিস্মিত করেনি।’
একথা ঠিক যে তরুনীদের দ্বারা ঘিরে থাকতে ভালবাসতেন গাদ্দাফি। লিবিয়ায় আনুকুল্য কিংবা অন্য কিছুর আশায় স্ত্রী কিংবা কন্যাকে তাঁর হাতে তুলে দেয়ার লোকের অভাব ছিলনা। তবে মনসুর দাও’র স্ত্রী-কন্যাদের দিকে কখনোই ভিন্ন নজরে তাকাননি। এমনকি পার্টিতে তাঁর যেসব অতিথি আসতেন তাদেরকেও কখনও কুপ্রস্তাব দিতেন না। এর কারণে হিসেবে তিনি বলেছেন, ‘কাকে দিয়ে কোন কাজটি হবে তা তিনি খুব ভাল করেই জানতেন। আমি এ বিষয়টি পছন্দ করি না তা তিনি অনুভব করতে পারতেন।’
ফরাসী পত্রিকা লা মন্ডে’র সাংবাদিক আনিক কোজিয়ানের বইটির পুরো নাম গাদ্দাফি’স হারেম: দ্য স্টেরি অফ এ ইয়াং উম্যান এন্ড এবিউজেস অফ পাওয়ার ইন লিবিয়া। এতে বস্তুত যার কাহিনী তুলে ধরা হয়েছে তার নাম সোরায়া। এক অনুষ্ঠানে ফুল দেয়ার সময় ১৫ বছর বয়সী এ কিশোরীকে টার্গেট করেছিলেন গাদ্দাফি। ডেকে এনে রাজধানী ত্রিপলির ঠিক বাইরে অবস্থিত ৬ কিলোমিটার লম্বা প্রাসাদ বাব আল-আজিজিয়াতে টানা পাঁচ বছর বন্দী করে রাখা হয়েছিল তাকে। এরপরও তাকে চোখে চোখে রাখতো প্রেসিডেন্টের নিযুক্ত বিশেষ লোকেরা। প্রকৃত মুক্তি মিলেছিল গাদ্দাফির মৃত্যুর পর। বইতে গাদ্দাফি তার সঙ্গে কী কী করেছিলেন এবং কীভাবে করেছিলেন, সেসবের অনেকটা খোলামেলা বর্ণনা রয়েছে। হারেমে সোরায়াদের প্রধান ছিলেন মাবরৌকা নামক এক মহিলা। তিনিই সবাইকে গাদ্দাফির জন্য প্রস্তুত করে তুলতেন। সোরায়ার মতো এমন আরো অনেক স্কুলগার্লকে প্রেসিডেন্ট অপহরণ করিয়ে এনেছিলেন। তারপর তাদের বানানো হয়েছিল যৌনদাসী। ২০০৯ সালে মুক্তি পেলেও সোরায়া তার পরিবারের অন্যান্য সদস্যের খুশিমুখ দেখতে পাননি। সবাই তাকে নিয়ে অস্বস্তিবোধ করে, মন থেকে মেনে নিতে পারে না। কোজিয়ান আরো লিখেছেন, গাদ্দাফির লিপ্সার স্বীকার হয়েছিলেন অনেক সাংবাদিক এবং বিদেশি কুটনীতিকের স্ত্রী। কারো সাথে সম্পর্ক গড়ার আগে তার রোগবালাই সম্পর্কে নিশ্চিত হতে নিজস্ব নার্স দিয়ে রক্ত পরীক্ষা করিয়ে নিতেন। গাদ্দাফির স্ত্রী-সন্তানেরা এসব বিষয় সম্পর্কে বেশ ভালভাবে অবগত থাকলেও ভয়ে কেউ মুখ খোলার সাহস করতেন না।
গাদ্দাফি’স হারেম বইয়ে যার কথাবার্তা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে, সেই মনসুর দাও এখন বন্দী রয়েছেন লিবিয়ার বিশেষ নিরাপত্তাযুক্ত জেলে এবং অপেক্ষা করছেন নিজের যুদ্ধাপরাধের বিচারের জন্য। তাঁর সঙ্গে লেখক কখন কীভাবে কথা বলেছেন এ বিষয়টি বইয়ে পরিস্কার করা হয়নি। বইটি ফরাসী ভাষায় প্রকাশিত হয় গত বছর। এখন পর্যন্ত বিক্রী হয়েছে লক্ষাধিকেরও বেশি কপি। ধারনা করা হচ্ছে ইংরেজি সংস্করনেরও ব্যাপক কাটতি ঘটবে।
