তৈরি হচ্ছে বিশ্ব ঐতিহ্যের ত্রিমাত্রিক ডিজিটাল আর্কাইভ

আপডেট : ২২ অক্টোবর ২০১৩, ২১:৫০
প্রযুক্তির সহায়তায় কত কিছুই না করছে মানুষ। ডিজিটাল এই যুগে এসে বিশেষ করে মানুষের স্মৃতি ধরে রাখতে প্রযুক্তির রয়েছে বিশাল অবদান। দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের ছবি যেমন রয়েছে এর মধ্যে, তেমনি এখন বিভিন্ন বিশ্বখ্যাত সব স্থানের ডিজিটাল প্রতিচ্ছবিও উঠে আসছে ওয়েবসাইটের পর্দাতেই। তবে এবারে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন ইরাকি বংশোদ্ভুত প্রকৌশলী ও উদ্যোক্তা বেন ক্যাসিরা। পৃথিবীর গুরুত্বপূর্ণ এবং ঐতিহ্যবাহী যেসব স্থাপনা এখন হুমকির মুখে রয়েছে, সেগুলোর একটি ত্রিমাত্রিক ডিজিটাল আর্কাইভ তৈরির কাজ শুরু করে দিয়েছেন তিনি। ইতোমধ্যেই ১০০টি স্থাপনা ও স্থানের ত্রিমাত্রিক প্রতিলিপি তৈরি করার পরে আগামী পাঁচ বছরে আরও ৪০০টি স্থাপনা ও স্থানকে একই প্রযুক্তির আওতায় নিয়ে আসার পরিকল্পনা রয়েছে তার। এতে করে ভবিষ্যতে এসব স্থাপনা কোনো কারণে ধ্বংস হয়ে গেলে কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তার ডিজিটাল আর্কাইভ থেকে আগামী প্রজন্মের মানুষেরা এসব স্থাপনা সম্পর্কে পূর্ণ ধারণা লাভ করতে পারবে। যেভাবে শুরু ইরাকে বেড়ে ওঠা বেন ১৯৯৩ সালে তার নিজের প্রতিষ্ঠান সাইরা টেকনোলজিতে তৈরি করেন একটি ত্রিমাত্রিক লেজার স্ক্যানিং সিস্টেম। তবে তার মধ্যে বিশ্ব ঐতিহ্যের এই সংরক্ষণের চিন্তা আসে ২০০১ সালে। ওই সময়ে আফগানিস্তানের বামিয়ানে তালেবানদের আক্রমণে ধ্বংস হয়ে যায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। তখনই তিনি অন্যান্য সব গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা এবং বিশ্ব ঐতিহ্যের সব উপাদান সংরক্ষণ করার চিন্তা শুরু করেন। নিজেদের উদ্ভাবিত ত্রিমাত্রিক লেজার স্ক্যানিং সিস্টেমটি স্বাভাবিকভাবেই হয়ে ওঠে তার অন্যতম ভরসা। এর আগে এই প্রযুক্তি ভিডিও গেম এবং চলচ্চিত্র শিল্পেও ব্যবহূত হয়েছে। তবে বেন এই প্রযুক্তি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেন তার বিশ্ব ঐতিহ্যের মডেল সংরক্ষণে। স্ত্রী বারবারাকে নিয়ে তিনি ২০০৩ সালে গড়ে তোলেন সাইআর্ক (http://archive.cyark.org)। গত ১০ বছর ধরে তারা কাজ করে যাচ্ছেন এই প্রকল্প নিয়ে। আর ইতোমধ্যেই ১০০টি স্থাপনার ত্রিমাত্রিক ডিজিটাল আর্কাইভ তৈরি করে ফেলেছেন তারা। কলোরাডোর গুহা, মিশরের সব বিখ্যাত সমাধিসৌধ, পম্পেই নগরীর ধ্বংসাবশেষ, গুয়াতেমালার মায়ান সভ্যতার সব মন্দিরের মতো সব স্থাপনা রয়েছে এর মধ্যে। ভবিষ্যতে আরও চারশ প্রথম একশ স্থাপনার ডিজিটাল আর্কাইভ তৈরির পর অনেক বেশি আশাবাদী হয়ে উঠেছেন বেন। আর তাই আগামী ৫ বছর সময়ের মধ্যেই আরও চারশ স্থাপনার ডিজিটাল আর্কাইভ তৈরি করতে চান তিনি। গত দশ বছরে প্রযুক্তির অভাবিত উন্নয়ন তার কাজকে অনেকটাই এগিয়ে দিচ্ছে বলেই আশাবাদটা আরও বেশি তার। একটি সাক্ষাত্কারে তিনি বলেন, ‘আমাদের পক্ষে আসলে হারিয়ে যেতে বসা অনেক ঐতিহ্যের প্রতিরূপ বাস্তবে তৈরি করা সম্ভব নয়। তবে আমরা প্রযুক্তির সহায়তায় এর পূর্ণাঙ্গ এবং নিখুঁত ডিজিটাল ত্রিমাত্রিক প্রতিরূপ তৈরি করতে পারি। প্রযুক্তি এখন অনেক বেশি সহজলভ্য, দ্রুতগতির এবং খরচেও কমে আসছে। ফলে আমাদের কাজগুলো আগের চাইতে অনেক সহজে করতে সক্ষম হব বলেই আশা করি।’ তবে বেন চান আরও অনেক প্রতিষ্ঠান এগিয়ে আসুক এই কাজে, যাতে করে আরও দ্রুত এবং বেশি পরিমাণে ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনাগুলোর ডিজিটাল মডেল তৈরি করা যায়। যেভাবে সংরক্ষিত হচ্ছে স্থাপনাগুলো ত্রিমাত্রিক লেজার স্ক্যানিং প্রযুক্তি, ফটোগ্রামেট্রি এবং অন্যান্য উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রতিটি সাইটের পূর্ণাঙ্গ তথ্য স্ক্যান করে নেওয়া হচ্ছে ত্রিমাত্রিক মডেল তৈরি করতে। সংগৃহীত এই তথ্যগুলো এতটাই নিখুঁত যে প্রতিটি স্থানের আশেপাশের কোনোকিছুই বাদ পড়ছে না এই তথ্য থেকে। সাইআর্কের থ্রিডি ভিউয়ারে এসব সংগৃহীত তথ্যের মাধ্যমে তৈরি ডিজিটাল ত্রিমাত্রিক প্রতিরূপ নিখুঁতভাবে প্রদর্শন করা হয়। মোবাইল একটি অ্যাপ্লিকেশনও তৈরি করা হয়েছে এসব ত্রিমাত্রিক মডেল প্রদর্শনের জন্য। সাইআর্কের এই প্রকল্পের জন্য সংগৃহীত সকল তথ্য এবং তৈরিকৃত মডেলগুলোকে সংরক্ষণও করা হচ্ছে যত্নের সাথে। ফলে ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য ডিজিটাল এই আর্কাইভ অমূল্য সম্পদ হয়ে থাকবে।