সিপিডির মূল্যায়ন
++২০১৩ সাল ব্যাংকিং খাতের বিপর্যয়ের বছর
++রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় বিনিয়োগ কমবে
++সম্ভাবনার জায়গাগুলো সীমিত হয়ে যাচ্ছে
++মূল্যস্ফীতি ফের ঊর্ধ্বমুখী
দেশের বর্তমান পরিস্থিতিকে রাজনৈতিক ব্যবসায়িক চক্রের সাথে তুলনা করেছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। আগামী নির্বাচনকে ঘিরে দেশে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে তাতে অর্থনীতির সম্ভাবনাগুলো আরো সীমিত হয়ে গেছে বলে মনে করে সংস্থাটি। দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে এ তথ্য তুলে ধরেন সিপিডি’র সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।
ধানমন্ডি অফিসে ‘২০১৩-১৪ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনীতি: বাজেটের তিন মাস পর, নির্বাচনের তিন মাস আগে’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদন তুলে ধরেন তিনি। এতে তিনি আরো উল্লেখ করেন, বিগত নির্বাচনকালীন অর্থবছরগুলোতে প্রবৃদ্ধি হ্রাস পেয়েছে গড়ে শূন্য দশমিক ৬৭ শতাংশ হারে। রাজস্ব আদায়ের পরিমাণও কমেছিলো উল্লেখযোগ্য হারে। দেশের ব্যাংকগুলোতে ৮০ হাজার কোটি টাকার তারল্য পড়ে আছে অথচ ব্যক্তিখাতে ঋণপ্রবাহ গত এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে চলে গেছে। চলতি অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রাগুলো বাস্তবসম্মত নয় বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশ রাজনৈতিক-ব্যবসায়িক চক্রে প্রবেশ করেছে। এ চক্রের প্রভাব শুধু নির্বাচনী বছরে থাকে না, আরো কয়েক বছর অব্যাহত থাকে। তবে প্রবৃদ্ধির ধারা একবার লক্ষ্যচ্যুত হলে তা আবার ফিরিয়ে আনতে অনেক সময় লাগবে। নির্বাচনী বছর হওয়ায় চলতি ২০১৩-১৪ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের কম হবে। কর আদায়ও হবে কম। তবে নির্বাচনের পরের অর্থবছরের তা আবার বেড়ে যাবে। নির্বাচনের বছর রাজস্ব ব্যয় বাড়বে, বাড়বে নির্বাচনের পরের বছরও। অন্যান্য দেশে নির্বাচনের বছরে বাজেট ঘাটতি বৃদ্ধি পেলেও বাংলাদেশের বাজেট ঘাটতির পরিমাণ জিডিপি’র ৫ শতাংশের নিচে থাকবে বলে মনে করেন তিনি।
তিনি উল্লেখ করেন, আর্থিক ব্যবস্থাপনার জন্য নেয়া পদক্ষেপগুলো সীমিত হচ্ছে। এটা খুবই পরিহাসের বিষয় যে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বিভিন্ন শর্তের ভেতরে থাকার পরেও ব্যাংকিং খাতে এ পরিস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দেশের আর্থিক খাতের কিছু সংস্কার হলেও শৃৃঙ্খলা ফিরে আসেনি, কমেনি সুদের হার। নতুন ব্যাংক আসার পর প্রতিযোগিতার কারণে সুদের হার কমবে বলে যে আশা করা হয়েছিল বাস্তবে তা হয়নি। আর্থিক খাতে কাঠামোগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার আশানুরূপ হয়নি। ফলে দেশের ব্যাংকগুলোতে ৮২ হাজার ৩৪৪ কোটি টাকার উদ্বৃত্ত তারল্য থাকার পরও গত বছরে মাত্র আট মাসে প্রায় ১শ’ কোটি ডলার বিদেশি উত্স থেকে বেসরকারি ঋণ গ্রহণ করা হয়েছে। ১ বছরের ব্যবধানে ব্যাংকগুলোর কুঋণের পরিমাণ ৭ দশমিক ২ থেকে ১১ দশমিক ৯ শতাংশে চলে গেছে। বর্তমান সরকারের প্রথম দুই বছরে অর্থনীতি শক্তিশালী হলেও শেষ দুই বছরে অনেক দুর্বল হয়ে পড়েছে। সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের লক্ষ্যমাত্রাকে ‘অবিশ্বাস্য’ বলে উল্লেখ করেন তিনি। সিপিডি মনে করে এডিপি’র গোলকধাঁধা হলো পদ্মা সেতুর জন্য বরাদ্দ। মোট এডিপি’র দশ শতাংশ হওয়ায় পদ্মা সেতু প্রকল্পে এই টাকা খরচ করা সম্ভব হবে না বলে মনে করে সিপিডি।
তিনি আরো উল্লেখ করেন, শস্য উত্পাদন খাতে নিম্ন প্রবৃদ্ধির ফলে সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি কমে গেছে। সামগ্রিকভাবে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ বেড়েছে কিন্তু ব্যক্তিখাতে বিনিয়োগ কমে গেছে। ফলে মোট বিনিয়োগ পরিস্থিতি একই জায়গায় থমকে রয়েছে। গত বছর মূল্যস্ফীতির হার লক্ষ্যমাত্রার কাছাকাছি থাকলেও এ অর্থবছরে তা ফের ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে চালের দাম হ্রাস পাওয়ার পরও দেশের বাজারে তা বৃদ্ধি পাচ্ছে। সব মিলিয়ে চলতি অর্থবছরে মূল্যস্ফীতির হার ফের ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে।
অন্যদিকে বিদেশে জনশক্তি রপ্তানি প্রবাহ কমেছে। মানুষ আগের মতো বিদেশে যাবার সুযোগ পাচ্ছেন না। সব মিলিয়ে সরকারের একটি শান্তির দিক হলো থ্রিজির লাইসেন্স বিক্রির টাকা আয়। তাছাড়া রপ্তানি খাত ভালো করেছে। এটা অর্থনীতির জন্য ভালো। তবে দেশের অর্থনীতির কাঠামো এখনো দুর্বল। তারপরও সরকার নতুন কর্মচারি নিয়োগ দিচ্ছে। অন্যদিকে চাকরির বয়সসীমা বাড়ানো হচ্ছে। ফলে সরকারে অনুন্নয়ন ব্যয় বেড়েছে।
এক প্রশ্নের জবাবে সিপিডি’র নির্বাহী পরিচালক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, নির্বাচনী বছরে মূলধনী পণ্য আমদানি হঠাত্ করে বেড়ে গেছে। কিন্তু সেই অনুপাতে ব্যাংক ঋণ এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধি পায়নি।
দেবপ্রিয় আরো উল্লেখ করেন, অর্থনীতির স্বার্থে রাজনৈতিক রক্ষাকবচ তৈরি করতে হবে। পোশাক শিল্পের মতো সকল খাতকে রাজনীতির বাইরে রাখতে হবে। আসছে নির্বাচনকে ঘিরে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে তার জন্য বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিগুলো এমন হওয়া উচিত যাতে জীবন-জীবিকা ও সম্পদের ক্ষতি না হয়। তাছাড়া আন্তর্জাতিক ভাবে দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হয় এমন কিছু না করার আহ্বান জানান তিনি। সাংবাদিক সম্মেলনে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন এই গবেষণার সমন্বয়ক তৌফিকুল ইসলাম খান, সিপিডির গবেষণা পরিচালক ফাহমিদা খাতুন, অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।
